জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর তার ভরাট কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। ২০০১ সালে ইথুন বাবুর সুরে ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ গান গেয়ে প্রথমবার শ্রোতাদের মন জয় করে নেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ওই অ্যালবামের পর এই দুজন আর একসঙ্গে গান করেননি। কি এমন ঘটনা ঘটেছিল যে, ১৮ বছর তারা দূরে থাকলেন। সে যাই হোক, আঠারো বছর পর তারা দুজন দাঁড়ালেন এক মঞ্চে। হাজির হলেন নিজেদের নতুন গান নিয়ে। ‘চুপচাপ কষ্টগুলো’শিরোনামের গানটি প্রযোজনা করেছে ধ্রুব মিউজিক। রোববার প্রতিষ্ঠানটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয় গানটি। গানের মুক্তি উপলক্ষে এই দিন রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়। ইথুন বাবু, আসিফ আকবরসহ গানের ভিডিওটির অন্য কলাকুশলীরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
১৮ বছর পর ইথুন বাবুর সংগীতায়োজনে আসিফের হাজির হওয়া সত্যিই অন্যরকম এক ঘটনার জন্ম দেয়। প্রকাশনা উৎসবেও সেই আবহ লক্ষ্য করা গেল। গানের প্রকাশনা উৎসবে এসে ১৮ বছর আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে কাঁদলেন আসিফ আকবর। শুধু নিজেই কাঁদলেন না কাঁদালেন অন্যদেরও। অশ্রুভেজা চোখে আসিফের পাশে দাঁড়িয়ে আসিফের পিঠ হাতড়ে দিলেন ইথুন বাবু নিজেও।
আসিফ বলেন, ‘১৯৯৭ সালের ১৫ অক্টোবর আমি ঢাকায় আসলাম সাউন্ডের ব্যবসা করব ও গানের সঙ্গে থাকব বলে। কুমিল্লার ইফতেখার আহমেদ পিন্টু ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন শওকত আলী ইমন ভাইয়ের কাছে। আমি ওখানে গানের ডেমো ভয়েস দিতাম। আলী আকরাম শুভ ভাইয়ের সঙ্গেও পরিচয় হলো ওখানে। ক্ষাপা বাসু সিনেমার একটি গান গাইলাম। এই গান শুনে ইথুন বাবু ভাই আমাকে ডাকলেন, আমার গান করতে চাইলেন। তখন আমি মাস্টার্স পড়ছি। আমার দুই সন্তান ঘরে। আমি অ্যালবাম করতে রাজি হলাম। অ্যালবামটা হলো। বাবু ভাই আমাকে ডেকে একদিন বললেন তোকে এমন গান দিলাম আর কোনো দিন পিছে ফিরে তাকাতে হবে না। অসহায় অবস্থায় যখন জাহাজ সমুদ্রে ভাসে, তখন মানুষ বাঁচার জন্য খড় কুটো খোঁজে। আমারও তেমন হয়েছিল। সেই সময় পাশে পেয়েছিলাম ইথুন বাবু ভাইকে। আমি সিদ্ধান্ত ভুল নিইনি। ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ গান গাইলাম। সেই সময় বাবু ভাইয়ের সঙ্গে রাত দিন গান নিয়ে মেতে থেকেছি। ওনাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতাম আবার ওনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে বাসায় ফিরতাম। বাবু ভাইয়ের ও রাতজাগা অভ্যাস আমারও রাত জাগা অভ্যাস। একদিন সারা রাত কাজ করে ভোরবেলা বাসায় ফিরব। আমার ছোট ছেলে রুদ্রর অসুস্থতার খবর আসল বাসা থেকে। আমার স্ত্রীকে বললাম ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। পরে বাবু ভাই আমাকে গাড়িতে করে নিয়ে রাস্তা নামিয়ে দিলেন। আমি চলে যাচ্ছি, এই সময় আবার গাড়ি ব্যাক করে এসে বললেন কিরে তোর মন খারাপ কেন? পকেটে টাকা নাই? বাবু ভাই আমাকে পাঁচশ টাকা দিলেন। আমার পকেটে তখন ছিল মাত্র ১০ টাকা। এই ১০টাকা খরচ করলে আমাকে হেঁটে যাওয়া লাগত বাসায়। বাবু ভাই বললেন তুই রাত্রে আসবি, রাতে তোর টাকা দেওয়া হবে। যখন টাকা পেলাম আমি অ্যাংকর মিনিপ্যাক দুধ কিনেছিলাম ৩০ টাকা করে। ৬ প্যাকেট দুধ কিনলাম। ৬ প্যাকেট দুধের সঙ্গে ৬টা চামচ ফ্রি। আমার বাসার জন্য এক সেট চামচ হলো। এই রকম অসংখ্য গল্প আছে বাবু ভাইয়ের সঙ্গে। উনি মেজাজি মানুষ কিন্তু একদম শিশুর মতো মন। ও প্রিয়া যখন রিলিজ হবে, তখন সাউন্ডটেক হঠাৎ করে অ্যালবাম রিলিজ বন্ধ করে দিল। ঈদে আর রিলিজ হবে না অ্যালবাম। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। আহমেদ রিজভি ভাই বললেন, এখন অনেক বড় শিল্পীদের অ্যালবাম বের হচ্ছে। তোমার অ্যালবামটি পরে বের হলেই ভালো। আমি কুমিল্লা চলে গেলাম। সেবার আমি ঈদ করিনি। এর পরে একদিন বাবু ভাই আমাকে ডাকলেন, গুলিস্তান, থেকে মিরপুর আমরা অ্যালবাম বিতরণ করলাম বিভিন্ন স্থানে। এরপর রংপুর থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশ ঘুরেছি। বাবু ভাইয়ের একটা ক্যারিনা গাড়ি চড়ে। তিন মাস পরে অ্যালবামের ফলাফল পেলাম। বাকিটা সবার জানা।
আসিফের কথা শুনে অশ্রুসিক্ত হন উপস্থিত অতিথিরাও। আসিফের বক্তব্য শেষ হলে কথা বলেন ইথুন বাবু। তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিত গান লিখি, সুর করি। আসিফের সঙ্গে ১৮ বছর ধরে কোনো কাজ করা হয়নি। অনেক দিন পর দুই ভাই একসঙ্গে কাজ করতে পেরে ভালো লাগছে। আসিফের কাছ থেকে এত দিন যারা আমাকে সরিয়ে রেখেছে তাদের ধন্যবাদ।’
উল্লেখ্য ‘চুপচাপ কষ্ট’ গানের মিউজিক ভিডিও করেছেন ইথুন বাবু নিজেই। এতে আসিফ আকবরের সঙ্গে মডেল হয়েছেন মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ খ্যাত জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। কোরিওগ্রাফিতে ছিলেন হাবিব। ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি গানটি শুনতে পাওয়া যাবে ডিএমএস ওয়েবসাইট, জিপি মিউজিক এবং বালালিংক ভাইবে।
