এইচআইভি পরীক্ষার মেশিন নষ্ট চিকিৎসা চলছে ওষুধে

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০৩:২৭ এএম

চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচ বছর ধরে এইচআইভির (হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) মাত্রা নির্ণয়ের মেশিন নষ্ট থাকায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। কেউ কেউ একাধিকবার ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনছেন, কেউবা পরীক্ষা ছাড়াই শুধু ওষুধ সেবন করে চালাচ্ছেন চিকিৎসা। নতুন রোগী বাড়ায় অবশেষে ‘ঘুম ভেঙেছে’ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের। গত মাসে তারা সিডি-ফোর সেল কাউন্টিং মেশিনটি মেরামতের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে।

সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে এইচআইভি আক্রান্ত এইডস রোগীর সংখ্যা ৩৭৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৮৭ জন, নারী ১৪৯, শিশু ৩৭ ও তৃতীয় লিঙ্গের দুজন। রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসার মধ্যে বিভিন্ন সময় এর মাত্রা জানা প্রয়োজন হয়। সেই অনুপাতে চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে থাকেন। সিডি-ফোর সেল কাউন্টিং মেশিনের মাধ্যমে এক ধরনের রাসায়নিক (রিএজেন্ট) ব্যবহার করে রোগের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। ২০১২ সালের ১ জুলাই মেশিনটি চমেকের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে বসানো হয়। তিন মাস পর ২৭ সেপ্টেম্বর মেশিনটি নষ্ট হয়। মেরামতের পর তা চালু হলেও ২০১৪ সালে মেশিনটির সফটওয়্যারে সমস্যা দেখা দিলে আর চালু করা যায়নি।

এ বিষয়ে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ডা. নাসিমা আক্তার দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘আমাদের এখানে একসময় এইডস রোগীর চিকিৎসা চলাকালে রোগের মাত্রা জানার জন্য সিডি-ফোর সেল কাউন্টিং মেশিন ছিল। যতদিন রিএজেন্ট ছিল, ততদিন আমরা এ মেশিনের মাধ্যমে সেবা দিয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে এইডস রোগীদের সরকার কর্র্তৃক ওষুধ দেওয়ার ফলে মেশিনটির ওপর নির্ভরতা কমেছে।’

চমেক হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান রফিকুল মাওলা বলেন, ‘সিডি-ফোরের মাধ্যমে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোন পর্যায়ে আছে তা নির্ণয় করা যায়। কোনো ব্যক্তির যদি ২০০-৩৫০ এর মধ্যে সিডি-ফোর নেমে আসে, তাহলে তাকে এইডসের ওষুধ দিতে হয়। তিন মাস পরপর এইডস রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হয়। মেশিনটি নষ্ট থাকায় ঢাকা থেকে এই পরীক্ষা করে আনতে হয়।’

চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সিডি-ফোর হচ্ছে রক্তে এক ধরনের শ্বেতকণিকা। এই কণিকা রোগ প্রতিরোধ করে। এক কিউবিক মিলিমিটার রক্তে ৭০০-১২০০ সিডি-ফোর থাকে।’ সিডি-ফোরের সংখ্যা জানার পর এইডস রোগের ওষুধ (অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল বা এআরভি) দেওয়া হয়।

চমেকের অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) কর্নারে ২০১৮ সালে এইচআইভি আক্রান্ত ৫৩ রোগী ও চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ১৩ জন নতুন রোগী পাওয়া গেছে। নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সিডি-ফোর মেশিনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণে গত মাসে মেশিনটি ঠিক করতে ঢাকায় পাঠানো হয়।

এদিকে অকেজো মেশিনের কারণে পরীক্ষার জন্য বারবার ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় অনেকেই চিকিৎসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। চমেক হাসপাতালে কয়েক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এই পরীক্ষা করা হয়।

এআরটি কর্নারে চিকিৎসা নিতে আসা এক প্রবাসীর স্ত্রী রাউজানের রোজিনা (ছদ্মনাম) জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিন মাস পরপর ঢাকা থেকে পরীক্ষা করাচ্ছেন তিনি। যাওয়া-আসার ভোগান্তি ছাড়াও সিরিয়াল পেতে অনেক সময় লাগে। এই পরীক্ষা যদি চট্টগ্রামে পাওয়া যেত, তাহলে ভোগান্তি কমে যেত।’

এআরটি কর্নারের আউটডোর মেডিকেল অফিসার ডা. ওয়াফা সরোয়ারা বলেন, ‘মাসে প্রায় ২৮৮ রোগী ওষুধ সেবা নিয়ে যায়। গত দুই বছরে ৩৬০ জন এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছে এই কর্নার থেকে। আমরা তাদের নিয়মিত ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি আরও জানান, প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি। এর মধ্যে নোয়াখালী, ফেনী এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া ও রাউজান উল্লেখযোগ্য।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার বিষয়ে ডা. সিরাজুল বলেন, ‘অ্যান্টি রেক্টরোভাইরাল (এআরভি) ড্রাগস সেবনের ফলে এইডস রোগের সংক্রমণ কমে গেছে। এইচআইভি আক্রান্ত রোগীরা এ ওষুধ সেবনের ফলে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকছেন। ওষুধটি এইচআইভির জীবাণু না মারলেও তা নিষ্ক্রিয় করে রাখে। সংক্রমণ ছড়াতে দেয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত