নিউ জিল্যান্ডে শতাধিক মুসল্লিকে বাঁচালেন যে ৩ বীর

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯, ০৮:৫৩ পিএম

নিউ জিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে খ্রিস্টান চরমপন্থীর বন্দুক হামলায় ৫০ জন মুসল্লি নিহত হন। এ ঘটনায় শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেনটন ট্যারেন্টকে আটকাতে এগিয়ে আসেন বেশ কয়েকজন মুসল্লি। অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে বুকে বন্দুক টেনে নিয়ে মারা যান পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দুই নাগরিক। তারা দুইজনেই বীর হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন।

দুপুর দুইটার সামান্য আগে লিনউড মসজিদে হামলা চালায় ট্যারেন্ট। তার কিছুক্ষণ আগে সাত কিলোমিটার দূরে আল নুর মসজিদে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৪২ জন মুসল্লিকে হত্যা করে সে।

বিবিসি ও দ্য ন্যাশনাল জানায়, কয়েকজন মুসল্লি ট্যারেন্টকে প্রতিহত করলে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় সে। ফলে বেঁচে যায় মসজিদের ভেতরে থাকা প্রায় শতাধিক মুসল্লি। তবে প্রথম ধাক্কায় তার গুলি বর্ষণে মারা যায় অন্তত ৮ জন মুসল্লি।

আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া দাউদ নাদি সোভিয়েত অভিযানের মুখে ১৯৮০ সালে নিউ জিল্যান্ডে পালিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন প্রকৌশলী। অবসর গ্রহণের পর নিউ জিল্যান্ডে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করতেন তিনি। তিনি স্থানীয় আফগান অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  

সন্ত্রাসী ট্যারেন্ট মসজিদে হামলা চালালে বাকিদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন দাউদ। সবার সামনে এসে ট্যারেন্টের গুলি পেতে নেন বুকে।

তার ছেলে ওমর বলেন, “ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া থেকে কেউ আসলে সবার আগে তিনি এগিয়ে যেতেন।”

সেদিন মুসল্লিদের বাঁচাতে প্রাণের পরোয়া না করে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন বন্দুকধারীর সামনে। আল নুর মসজিদে নিহতদের মধ্যে প্রথমেই শনাক্ত করা হয় দাউদকে।  

তার মতো পাকিস্তানি নাগরিক নাঈম রশিদও এগিয়ে আসেন বন্দুকধারী ট্যারেন্টকে থামাতে। ট্যারেন্টকে গুলি করতে দেখে নাঈম তাকে জাপটে ধরেন। বন্দুক না নামানো পর্যন্ত তিনি এভাবে ছিলেন। ওই সময় তার শরীরে গুলি লাগে।

দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি মসজিদে গিয়েছিলেন জুমার নামাজ পড়তে। এতে নিহত হন তার বড় ছেলে তালহা রশিদ। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন অন্য ছেলেও।

ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দুকধারী ট্যারেন্টকে প্রতিহত করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন রাশিদ। এতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি মারা যান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে একজন বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

রাশিদের ভাই খুরশিদ আলম ভিডিওতে তার ভাইকে দেখে জানান, তার ভাইয়ের সাহসী কর্মকাণ্ডে তিনি গর্বিত। তিনি বিবিসিকে বলেন, “সে ছিল সাহসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে আমি শুনেছি, বন্দুকধারীকে আটকাতে এগিয়ে গিয়ে সে কিছু মানুষকে বাঁচিয়েছে।” 

খুরশিদ আরও বলেন, “সে বীরত্বের কাজ করলেও তাকে হারানোর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছি না। তার ত্যাগ আমাদের জন্য এখন মর্যাদার কিন্তু তাকে হারানোটা অপূরণীয়। মনে হচ্ছে, আমার একটি অঙ্গ হারিয়ে ফেলেছি।”

নাঈম পাকিস্তানে থাকাকালীন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন। পরে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে নিউ জিল্যান্ডে চলে যান।

এদিকে নিজের জীবনের পরোয়া না করে বহু মানুষকে বাঁচানো নাইমের পরিবারের জন্য জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

তিনি টুইটে লেখেন, ‘আমরা নাঈমের পরিবারের পাশে আছি। পাকিস্তান তার জন্য গর্বিত। জাতীয় পুরস্কার দিয়ে তার এই সাহসিকতাকে মূল্যায়ন করা হবে।’

ট্যারেন্টকে আটকাতে এগিয়ে আসেন আরও একজন আফগান। আফগানিস্তানের নাগরিক আব্দুল আজিজ ওয়াহাবজাদাহ মুসল্লিদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান সশস্ত্র সন্ত্রাসীর সামনে। ওয়াহাবজাদাহ বন্দুকধারী ট্যারেন্টকে থামাতে তার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন কার্ড পেমেন্ট মেশিন।

ইতিমধ্যে বীর হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন ৪৮ বছর বয়সী এ আফগান। তিনি বলেন, “আমি কোনো বীরত্বের কাজ করিনি। একজন মানুষ হিসেবে আমার যা করা উচিত ছিল, সে সময় সেটিই আমি করেছি।”

তিন দশক ধরে নিউ জিল্যান্ডে বাস করছেন ওয়াহাবজাদাহ। একটি দোকান চালান তিনি। শুক্রবার চার শিশুকে নিয়ে লিনউড ইসলামিক সেন্টার মসজিদে তিনি জুমার নামাজ পড়তে যান।

ওয়াহাবজাদাহ বলেন, “আমি প্রথমে তাকে দেখে মনে করেছিলাম, সে মজা করছে।” তার হাতে বন্দুক দেখে ফ্র্যাঙ্ক হিসেবেই নেন তিনি।

তিনি বলেন, “তখন কেউ চিৎকার করে বলছিল- সে বাইরে মানুষকে গুলি করেছে।” তিনি দৌড়ে বাইরে গিয়ে দেখেন, ইতিমধ্যে ট্যারেন্ট তিনজনকে হত্যা করে ফেলেছে। তখন মসজিদের দরজার পাশ থেকে কার্ড পেমেন্ট মেশিন তুলে নিয়ে বন্দুকধারীর দিকে ছুটতে থাকেন এই আফগান।

তিনি বলেন, “আমি দৌড়ে বাইরে আসলাম। তখন সামরিক বাহিনীর পোশাক পরিহিত তাকে দেখেই বুঝলাম, সে কোনো পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর কেউ না। ওই লোক তখন আমার দিকে গালিগালাজ করতে করতে এগিয়ে আসছিল। তখন আমি তাকে কার্ড মেশিনটি ছুঁড়ে মারলাম।”

এরপর তার চার শিশুর একজনের চিৎকার শুনে মসজিদের একপাশে দৌড়ে গেলে, সেখানে এক মৃতদেহের পাশে একটি শটগান পড়ে থাকতে দেখেন ওয়াহাবজাদাহ। শটগানটি নিয়ে ট্রিগার চাপতে গিয়েই দেখেন এতে গুলি নেই। এরপরেও তিনি বন্দুকটি উঁচিয়ে ধরে সন্ত্রাসী ট্যারেন্টকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে তাকে ডাকতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে ট্যারন্ট ওই জায়গা ত্যাগ করে। 

ওয়াহাবজাদাহর এমন দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে বীর হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন তিনি। লিনউড মসজিদের ইমাম লাতিফ আলাবি বলেন, “ওয়াহাবজাদাহ যদি এইভাবে এগিয়ে না আসতেন, তাহলে আরও বেশি মানুষ নিহত হতো।”

তিনি বলেন, “কোনোভাবেই যদি বন্দুকধারী মসজিদের ভেতরে চলে আসত তাহলে আমরা কেউই বাঁচতাম না।”

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত