রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ১০ বীরাঙ্গনা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ০৭:৩৮ পিএম

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সরকার ঘোষিত সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

১৯৭১ সালে দেশ-মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই সব নারীরা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাননি। তারা হলেন- মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পাল পাড়া গ্রামে বসবাস করেন রেনু বালা, মায়া সূত্রধর, রাশমুনি সূত্রধর, কালীদাসী পাল, সুষমা পাল, সন্ধ্যা পাল, ক্ষান্ত বালা পালসহ ১০ জন বীরাঙ্গনা। এদের মধ্যে বাণী পাল, রাণী পাল ও কান্তা রানী পাল মারা গেছেন।

একাত্তরের সেই দুর্বিষহ যন্ত্রণা, সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশায় অভাব-অনটন আর অসুস্থ্যতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবনসংগ্রাম। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বীরাঙ্গনা নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই তালিকায় নওগাঁর রাণীনগরের ১০ জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে ছায়ায় ঘেরা আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ওই এলাকায় নির্যাতন চালায়। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ সময় নারীরা স্বামী-সন্তানদের প্রাণে বাঁচানোর শেষ আকুতিটুকু করলেও পাক-জান্তাদের মন গলাতে পারেনি। উল্টো পাক-জান্তারা সুযোগ বুঝে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা শহরের উদ্দেশে চলে যায়। ৫২ শহীদের তাজা রক্তে সে দিন  নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে ভাসিয়ে যায়। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হৃদয় বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।

১৯৭১ সালে এই গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে আলাপকালে কালীদাশি পাল (৭৮) জানান, ২৫ এপ্রিল ওই দিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবি আসে তখন আমার স্বামীসহ আমি বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গেটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে হিঁচড়ে পাঞ্জাবিরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার কথা না শুনে চোখের সামনে আমার স্বামীসহ ৫২ জনকে হত্যা করে উল্টো আমার উপরও তারা নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিন মজুরের কাজ করে। আমি ও পেটের তাগিদে কখনো ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দু’মুঠো ডাল ভাত খেয়ে কোনো মতো বেঁচে আছি। স্বাধীনতার ৪৮বছর পার হলেও আমাদের খোঁজ খবর কেউ নেয়নি।

সুষমা পাল (৭২) জানান, ২৫ এপ্রিল ওই দিন সকাল নয়টার দিকে পাঞ্জাবিরা আমার স্বামীকে সুরেশ্বর পালের বাড়িতে ধরে নিয়ে লাইন করে আরও অনেকের সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় আমি ছোট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির বড় মাটির ডাবরের ভেতর আশ্রয় নেই। বাচ্চার কান্না শুনতে পেয়ে পাঞ্জাবিরা আমাকে মাটির ডাবর থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি ডাবর থেকে বের হয়ে দৌড়ে মাঠের মধ্যে পালিয়ে যাই। সে সময় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী মেয়েদের সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে।    

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অ্যাড. ইসমাইল হোসেন বলেন, এই গ্রামের বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আবেদন করার প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে গঠিত একটি তদন্ত দল সরেজমিনে তদন্ত করেছে। আশা রাখি তদন্ত প্রতিবেদন কাউন্সিলে জমা হলেই তাদের নাম গেজেটভুক্ত করা হবে এবং তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ সকল সুযোগ-সুবিধা পাবে।

রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, এই গ্রামের বীরাঙ্গনাদের দ্রুত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করব। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বরাবর পাঠিয়েছি। আশা রাখি সরকার বিষয়টি সুদৃষ্টি সহকারে দেখবেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। আতাইকুলা গ্রামের ১০বীরাঙ্গনার ব্যাপারে নিয়ম মাফিক যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাতে তারা তালিকাভুক্ত হতে পারেন সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত