“বছুরির পর বছুর কেটি গ্যালু, ভ্যালু পানির ব্যবুস্থা কেউয়ু কইরি দিলু না। তাইতি এই বিষের পানিই পান করতি হইচি” -এভাবেই আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বললেন, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভোলাডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধা আসমা বেগম (৬১)।
তাদের কাছে পানি পান, এখন বিষ পান। এভাবেই বেঁচে আছেন মেহেরপুর জেলার আর্সেনিকপ্রবন ১৩ গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ।
সুপেয় স্বাস্থ্যকর পানি না পেয়ে ওই সমস্ত গ্রামের মানুষ এখন পুকুর কিংবা ডোবার দূষিত পানি ফুটিয়ে পান করছেন। আবার অনেকেই উপায় না পেয়ে জেনেশুনে নিষিদ্ধ নলকূপের পানি পান করছেন। কেননা, ওই ১৩ গ্রামের শত ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
গত ৩০ বছরেও গ্রামগুলোতে আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় স্বাস্থ্যকর নিরাপদ পানির ব্যবস্থা হয়নি।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বিভাগ জানান, মেহেরপুরের ১৩ গ্রামের শত ভাগ নলকূপের পানিতে আর্সেনিক আছে। কিন্তু চাহিদা অনুপাতে সরকারী বরাদ্দ না পাওয়ায় এতদিনেও গ্রামগুলোতে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি সরবরাহের কোন ব্যবস্থা করা যায়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় পানি নিয়ে হাহাকার অবস্থা মেহেরপুরের ওইসব গ্রামে। আর্সেনিক আক্রান্তদের শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষত বিক্ষত দগদগে ঘা হয়েছে। দেখতে ভয়াবহ। তবুও চিকিৎসা নেই কোথাও। এমন পরিবারগুলো সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। চিকিৎসাবিহীন এমন অবস্থায় মধ্যে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেড়ে উঠছে ওই সমস্ত পরিবারের সন্তানেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এভাবেই প্রতিমুহূর্ত মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে আছেন ২০ হাজার মানুষ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী জেলায় আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৭৯ জন।
স্থানীয়দের দেওয়া হিসাবে গত ২০ বছরে এই রোগে মারা গেছেন প্রায় তিন শতাধিক নারী পুরুষ। তবে, স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা থাকলেও মৃতের পরিসংখ্যান নেই বলে জানান।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, নব্বই দশকের পর মেহেরপুর জেলার মানুষ আর্সেনিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। জেলার ষোলটাকা, ভোলাডাঙ্গা, আলমপুর, বেলতলাপাড়া, সুবিদপুর, বুড়িপোতা, তারানগর, জয়পুর, আমঝুপি, মদনাডাঙ্গা, সহগলপুর গ্রাম সহ আর্সেনিক আক্রান্ত ১৩ গ্রাম। যেখানে পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ৫০ পিপিবি। সেখানে ওই সমস্ত গ্রামের পানিতে ৩০০ পিপিবি মাত্রার আর্সেনিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলেছেন জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকবৃন্দ।
আর্সেনিকের কারণে গ্রামে ছেলেদের বিয়েতে সমস্যা না হলেও মেয়েদের বিয়ে দিতে সমস্যা হয়। অনেক মেয়ের বিয়ে হয়নি এমন ঘটনাও আছে।
জনস্বাস্থ্য বিভাগ সহ বিভিন্ন এনজিওর দেওয়া নিরাপদ পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। এগুলো সচল করতে সংশ্লিষ্টদের কাছে ধরনা দিয়েও কোন ফল হয়নি। আবার বিদ্যুত সংযোগের অভাবে চালু করা যায়নি অনেক পানি শোধনাগার ক্ষুদ্র প্লান্ট।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন শামিম আরা নাজনিন জানান, এই জেলার অনেক গ্রাম আর্সেনিক আক্রান্ত শুনেছি। দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে মানুষ আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ থেকে ক্যান্সার, লিভার, কিডনি ড্যামেজ সহ নানা রোগ হতে পারে। কেবলমাত্র আর্সেনিক মুক্ত পানিই পারে এ রোগ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে। এই রোগ মোকাবিলায় সরকারিভাবে তেমন কোন ওষুধ সরবরাহ নেই। ফলে, স্বাস্থ্য বিভাগ আর্সেনিক আক্রান্তদের শুধুমাত্র স্বাস্থ্য পরামর্শ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না।
মেহেরপুর জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল গাফ্ফার মোল্লা জানান, বরাদ্দ অপ্রতুলতার কারণে এখনও আর্সেনিকপ্রবন এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায়নি।
তিনি আরো জানান, ২০০০ সালের পর কোন জরিপ হয়নি। তাই জুনের পর নতুন জরিপ করে জেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত সংখ্যা ও এর ভয়াবহতা নির্ণয় করা হবে। তারপর নতুন পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হবে কাজ।
