এবার ‘জনসেবা’য় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়েছেন। ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সেই জীবনের মুখোমুখি হলেন ওমর শাহেদ।ছবি তুলেছেন তারেক রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৬১ সালে মাস্টার্স পাস করেছেন। তখন এ দেশের মানুষের কী কী সমস্যার কথা শিখিয়েছেন শিক্ষকরা?
অর্থনীতিতে ভর্তি হওয়ার পর বুঝলাম, বিষয়টি খুব কৌতূহলোদ্দীপক। অঙ্ক, পরিসংখ্যান খুব ভালোবাসতাম। অনার্স সাবজেক্ট অর্থনীতি, দুটি সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট অঙ্ক, পরিসংখ্যান নিলাম। পাস করলাম। যখন পড়তাম, সবই পড়ানো হতো, এখনো বোধহয় তাই। বিদেশি বই আসত; সেগুলো পড়ানো হতো। দেশের অর্থনীতি নিয়ে যে খুব একটা পড়ানো হতো, মনে পড়ে না। দেশের এই সমস্যা আছে, ছাত্রছাত্রীদের থিওরি বা উদাহরণে সে সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যাবে ওভাবে পড়ানো হতো না। এখনো বোধকরি পড়ানো হয় না।
জীবনে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন কে?
যখন হাইস্কুলে পড়তাম, বাংলার শিক্ষক মনোহর আলী কবিতার অংশ ক্লাসে বলতেন, ‘তোর নিজস্ব, সর্বাঙ্গে তোর দিলেন দাতা আপন হাতে/মুছে সেসব মেকি হলি/গৌরব কিছু বাড়ল তাতে?’ তখন থেকে এটি আমার মনে কাজ করেছে। আমার নিজস্বটি ব্যবহার করব, অন্যের মুখাপেক্ষী হব না, ধার করব না। অন্যেরটি নিয়ে বড়াই করব না। এর সেই অর্থ। ফলে মানুষকে নিয়ে চিন্তা করি। যে জায়গায় কাজ করব, সেই জায়গার প্রত্যেককে তার চাহিদা অনুযায়ী সবকিছুর ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে তো সেই সুবিধাগুলো নিয়ে দান করে দেব না। তার সেই ব্যবস্থাগুলো পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে সে কাজ করে সুযোগগুলো অর্জন করতে পারে। এটিই আমার মানুষকে কেন্দ্র করে জীবনের দর্শন। মানুষের বহুমাত্রিকতাগুলোকে ধারণ করে, সবগুলোকে সমন্বয় করে, সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্টে (পিআইডিএস) মানুষের জন্য কী কাজ করেছেন?
এখন এটি বিআইডিএস (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ), আগে ছিল পিআইডিএস। এটি পাকিস্তানের করাচিতে ছিল। ১৯৬৪ সালের শেষে যোগ দিলাম। সেখানে গবেষণা হতো। তখনকার গবেষণা সরকারি-বেসরকারি হোক; অন্যের থেকে তথ্য নিয়েই বিশ্লেষণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতাম না। নীতি নিয়ে কাজ হতো। আমরা যারা বাঙালি অর্থনীতিবিদ, তারা এ দেশের ওপর কাজ করতাম। আমি পাটের ওপর কাজ করেছি। যত পাটকল ছিল, সবগুলোর মালিক পশ্চিম পাকিস্তানি, শ্রমিকরা সব বাঙালি। সেই নীতিতে পাটচাষি মার খেয়ে যাচ্ছিল। কারণ পাটের দাম কোনো সময় বাড়ত না, মালিকরা অনেক মুনাফা করত। গবেষণায় দেখিয়েছি, পাটচাষিরা মার খাচ্ছে, শিল্পপতিরা অনেক মুনাফা করছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য যে বাড়ছে, আমরা সচেতন ছিলাম। পাটের বৈষম্য আমিই প্রথম তুলে ধরেছি।
ষাটের দশকে আমাদের অর্থনৈতিক সংগ্রামে আপনার ভূমিকা?
১৯৭০ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বরে পিআইডিকে আমরা ঢাকায় নিয়ে এলাম। ছয়দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে গেল। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি মুক্তির দিকনির্দেশনা দিলেন। সেখানে ছিলাম। তার শেষ বাক্যÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ আমার ওপর অনেক প্রভাব ফেলেছে। বহু লেখায় কথাটি আছে। যে কর্মসূচিগুলো নেই, সেখানে এই মুক্তির পথ দেখাই। পিআইডির ডিরেক্টর নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। তার প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো আমাদের জোগাড় করে দিতে বলতেন। চারজন মিলে জোগাড় করে দিতাম। বঙ্গবন্ধু ব্যবহার করতেন। পঁচিশে মার্চ রাতে আমার বাসায় মিটিং ছিল।
১৯৭১ সালের প্রবাসী সরকারে আমাদের শরণার্থী মানুষ ও তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর কী কাজ করেছেন?
প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেলে আমরা তিনজন অপেক্ষাকৃত তরুণ ছিলাম। আমার বয়স ২৯-৩০। আমাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাটনির্ভর অর্থনীতিতে দায়িত্ব দেওয়া হলো, কাল স্বাধীন হলে পাটনীতি কী হবে? পাটনীতি তৈরি করেছি। বাংলাদেশের প্রথম পাটনীতি হিসেবে এটি স্বাধীনতার পর ঘোষিত হয়েছে। পাটের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেছি, কৃষকবান্ধব করে তৈরি করেছি। বলেছি, তারা কীভাবে পাটের বীজ, মূল্য পাবেন, উৎপাদনশীলতা কীভাবে বাড়ানো যাবে।
বিআইডিএসে গবেষণা জীবন কীভাবে এদেশের মানুষের উন্নয়নে ছিল?
পিআইডিই পরে বিআইডিএস (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (বিআইডিই) ছিল। ১৯৭৪ সালে দেখলাম, যেসব কাজ আমরা করতে চাইছি, শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থেকে সেগুলো পুরো করা যাচ্ছে না। সে জন্য অন্যান্য বিষয়কে যুক্ত করতে ‘বিআইডিএস’ হলো। ১৯৬৪ সালের শেষে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ২৭ বছর ছিলাম। শেষ দিকে কয়েক বছর ‘রিসার্চ ডাইরেক্টর’। অনেক গবেষণা করেছি। ‘রুরাল ইন্ডাস্ট্রিজ স্টাডিজ প্রজেক্ট’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অর্থনীতির কীভাবে বিকাশ হবে, গবেষণায় তুলে ধরেছি। গ্রামের কম আয়ের মানুষ কীভাবে শিল্প গড়ে তুলতে পারবেনÑ গবেষণা করেছি। যিনি উদ্যোক্তা হবেন তার দক্ষতা, কীভাবে উদ্যোক্তা হতে সাহায্য করা যায়, কত টাকা কোন জায়গায় লাগবে, পণ্যের বাজারজাত কীভাবে করা যায় এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করেছি। আমরা গ্রামে শিল্প কীভাবে তৈরি করতে হবে গবেষণায় আলোচনা করেছি। ৪০টি স্থান নির্দিষ্ট করে ৪১টি গবেষণা করেছি। পিকেএসএফে (পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন) সেগুলো আছে। বিআইডিএসেও থাকার কথা। এটি ১৯৮১ সালে শেষ হলো। এরপর ৪০টি উপজেলা ধরে ধরে কোথায় কী করতে হবে, গবেষণা করেছি। পিকেএসএফে আছে। আশির দশকে কেউ বলেনি, এখন যে উদ্যোক্তা সৃষ্টির কথা বলা হয়Ñ আমি তখন বলেছি। পিকেএসএফে সেটি বাস্তবায়ন করেছি। প্রথম গবেষণা তিন-চার বছর, পরেরটি ১৯৮২-’৮৩ সালে শুরু হয়ে ’৮৭ সালে শেষ হলো। এরপর ছেড়ে দিলাম।
বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ কেন প্রতিষ্ঠা করতে হলো? সেখানে কী কাজ করেছেন?
প্রথম যে প্রকল্প ১৯৮১ সালে শেষ হলো, সেই গবেষণার সঙ্গে ২০০-২৫০ জন গবেষক ছিলেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় থাকতেন। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের চাহিদা, জীবনযাপন নিয়ে আসতেন। প্রকল্প শেষে ফিরে এলেন, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে বসলাম। বললেন, ‘গ্রামের সমস্যাগুলো বুঝলাম, এখন এই কাজ করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ি চলুন।’ এই গবেষণা ও প্রচারাভিযানের জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটি করলাম। গবেষণা ও ফলাফল প্রচারের কাজ শুরু করলাম। সংলাপ, আলোচনা সভা আমরাই আবিষ্কার করেছি। একমাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৫শ, সাড়ে ৫শ গবেষণা করেছি। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নদীর পানিবণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি। বাংলাদেশের প্রথম বই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আমি ও নিউজিল্যান্ডের সহকর্মী ডিক ওয়ারিক করেছি। এখান থেকে ছোট ছোট সাত প্রকাশনা ১৯৯৪ সালে প্রকাশ করেছি। পুরো বইটি নেদারল্যান্ডস থেকে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে। নাম ‘ইমপ্লিকেশনস অব ক্লাইমেট চেইঞ্জ অ্যান্ড সি লেভেল রাইজ ফর বাংলাদেশ’, ৪শ পাতার বই।
পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে ১০ বছরে গরিব মানুষের জীবনকে উন্নত করতে কী কাজ করেছেন?
আমি যোগদানের আগে এটি ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থা ছিল। কিছু টাকা দিত, আদায় করত। যোগদানের পর এটি মানুষকে কেন্দ্র করে কাজ করতে শুরু করল। এখন ক্ষুদ্রঋণ দেয় না। আমাদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ‘সমৃদ্ধি’ প্রকল্প ২০৩টি ইউনিয়নে চালু আছে।
মানুষকে কেন্দ্র করে তার চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য তাতে কর্মসূচি আছে। ইউনিয়নগুলোতে বেদে, হিজড়া, হরিজন, ভিক্ষুকদের ওপরও কাজ চলছে। ভিক্ষুক থেকে বেরিয়ে তারা স্বাবলম্বী হতে চাইলে আমরা ঋণ নয়, অনুদান দেই। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আরও টাকা লাগলে ঋণ নেয়। ইউনিয়নগুলোর ছাত্রছাত্রীরা স্কুল থেকে যেন ঝরে না পড়ে, সে জন্য ‘শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম’ আছে। মোট ছয় হাজার গ্রামে কার্যক্রমটি আছে। সেগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা আছে। গ্রামের প্রতি বাড়িতে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী মাসে একবার গিয়ে রক্ত পরীক্ষা, প্রেশার ইত্যাদি মেপে নিয়ে আসেন, কম্পিউটারে তালিকা করা হয়। সমস্যা দেখলে প্যারামেডিক যান। জটিল হলে এমবিবিএস ডাক্তার যান। প্রয়োজন মনে করলে রোগীকে হাসপাতালে পাঠান। ১শ টাকা করে পুরো পরিবার এ স্বাস্থ্যসেবা কার্ড করেন। এ টাকা সম্মানী। টিউবয়েল, ডিপ টিউবয়েলের ব্যবস্থা করি। ২০৩টি ইউনিয়নে এভাবে সমন্বিত উন্নয়ন করছি। অন্য জায়গায় আলাদাভাবে কাজ করছি। ২০১১ সালে যেসব গ্রামে এই কর্মকা- শুরু করেছি, সেগুলোতে এখন অতি গরিব নেই। হাওর, উপকূল, দ্বীপেও আমাদের কার্যক্রমগুলো আছে। তামাক চাষের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছি। কুষ্টিয়াতে এখন তামাক চাষ বাদ দিয়ে অন্য কিছু করলে তাদের দেড় থেকে তিনগুণ লাভ হচ্ছে। রসুন হলো উদাহরণ। কুষ্টিয়ায় ১শ পরিবারের মধ্যে শুরু করে এখন প্রায় তিনশ, বান্দরবানে কয়েকশ, হালদা নদীর পাশে তামাক চাষিদের নিরুৎসাহিত করতে প্রকল্প করেছি। ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার ‘কিশোর ক্লাব’, ‘কিশোরী ক্লাব’ করেছি। জীবন গঠন, নেতৃত্বদানের শিক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছি। আমাদের যুব উন্নয়নে ‘যুব সমাজ’ এ দেড় লাখ যুবককে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশে ১৬ ঘণ্টার ডিজিটাল ট্রেনিং দিয়েছি। এখন তাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। গর্ভধারণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি আছে। স্কুলগুলোতে ক্রীড়ার জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আছে। ‘প্রবীণ কর্মসূচি’ আছে। তাদের জন্য ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা আছে। আমরা একে অপরকে মিলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। আমি প্রত্যেক মানুষকে মানব মর্যাদায় দেখতে চাই।
(২৬ মার্চ, ২০১৯, ঢাকা)
