প্রকৌশলীকে মেয়রের থাপ্পড়ের ঘটনায় ক্ষোভ

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:২৬ পিএম

নগরের হালিশহরের পোর্টকানেক্টিং রোডে ড্রেন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এক প্রকৌশলীকে চড়-থাপ্পড় মেরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এর প্রতিবাদে তারা কর্মবিরতি পালন করেছেন। বিষয়টি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন গৃহায়ণের চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম।

জানা যায়, হালিশহর হাউজিং এস্টেটের পোর্ট কানেকটিং রোডের বড়পোল রাস্তার মাথা এলাকায় ড্রেন নির্মাণ করতে গিয়ে চসিক কর্তৃপক্ষের সাথে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সার্কেলের মধ্যে জায়গা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। চসিক ড্রেন নির্মাণ করতে গেলে সেখানে বাঁধা দেয় গৃহায়ণের প্রকৌশলীরা। এই বিষয়ে আলোচনার জন্য চট্টগ্রাম নগর ভবনে দু’পক্ষের একটি সভা ডাকা হয়। সভার একপর্যায়ে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন উত্তেজনার বশে গৃহায়ণের এক প্রকৌশলীকে চড়-থাপ্পড় মারেন।

সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগর ভবনে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তবে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এরকম মারধরের ঘটনার কথা অস্বীকার করেছেন।

মেয়রের কাছে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার আশরাফুজ্জামান পলাশ গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী। এছাড়াও তিনি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহসভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক।

আশরাফুজ্জামান পলাশ বলেন, মেয়র মহোদয়কে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে গিয়ে আমি লাঞ্ছিত হয়েছি। গেঞ্জির কলার চেপে ধরে তিনি আমাকে থাপ্পড় মারেন। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার জুবায়ের সাহেবও আমাকে মেরেছেন। গৃহায়ণের জায়গায় ড্রেন করতে চায় চসিক। মেয়র বলেছেন, গৃহায়ণের কত জায়গা দখল হয়ে আছে। সোজা করে ড্রেনটি করতে হবে। তাই জায়গাটি লাগবে। কিন্তু আমি প্রসঙ্গক্রমে বলেছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনের মাধ্যমে জায়গাটি নিতে হবে। আমরা তো জায়গার মালিক নই। এরপরেও মেয়র মহোদয় বলেছেন, যেকোনোভাবে ড্রেনটি সোজা করে নির্মাণ করতে হবে। দখল বুঝি না, জায়গা আমাদের দিতে হবে। পরবর্তীতে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মেয়র উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং আমাকে থাপ্পড় মারেন। তখন কাউন্সিলর জুবায়ের সাহেবও আমার গায়ে হাত তোলেন। ’

তিনি বলেন, সরকারি কাজ করতে গিয়ে এরকম লাঞ্ছিত হয়েছি। যা কাম্য নয়। শুধু আমার নয়, আমি গৃহায়ণের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা চাই এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। প্রয়োজনে চসিকের সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে তদন্ত হোক, যোগ করেন পলাশ।

এই ব্যাপারে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চসিকের সঙ্গে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটি সমাধানের জন্য আমরা নগর ভবনে গেছি। চসিকের প্রকৌশলী তৈয়ব সাহেবের মাধ্যমে সিটি মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করতে যাই। আমরা ৬ সদস্যের একটি টিম মেয়র সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাই। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর মেয়র মহোদয়ের সাক্ষাৎ পাই, তাও একটি বৈঠকের মধ্যেই। যেহেতু আশরাফুজ্জামান পলাশ ওই প্রকল্পটি দেখভাল করেন, সেহেতু তাকে ব্রিফ করতে বলি। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে মেয়র মহোদয় আমার প্রকৌশলীর গায়ে হাত তুলেছেন। এমনকি ওই সময়ে ওখানে থাকা এক কাউন্সিলর জোবায়ের সাহেব বেশি উত্তেজিত হন। বিষয়টি আমরা লিখিতভাবে গৃহায়ণের চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। কর্মবিরতিও পালন করেছি। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

প্রকৌশলীকে চড়-থাপ্পড় মারার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি। থাপ্পড় মারার তো প্রশ্নই আসে না। ড্রেন নির্মাণের বিষয়ে কথা বলতে গৃহায়ণের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বেশ কজন নগর ভবনে আসেন। কিন্তু ওই প্রকৌশলী আমাদের চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। মূলত সেখানে বাজার বসিয়ে অপরাধ আড়াল করার জন্য থাপ্পড় মেরেছি বলে অপপ্রচার করে কর্মবিরতি পালন করছে। এর একটি চক্র আছে। অপরাধীকে তো আড়াল করা যাবে না।  

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সোহরাব হোসেনের সই করা একটি চিঠির কপি দেখিয়ে সিটি মেয়র আরও বলেন, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং সোসাইটির অধীন বড় পোল রাস্তা সংলগ্ন পরিত্যক্ত স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাঁচাবাজার বসানোর আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু তা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এরপরও সেখানে কাঁচাবাজার বসেছে। কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও সেখানে আবার বসে যায়। স্থানীয়রা আশঙ্কা করেছেন নির্মাণাধীন ড্রেনটি যদি সোজা করা না হয়, তাহলে আসন্ন বর্ষাকালে সেখানে জলাবদ্ধতা হবে।

 

পরবর্তীতে সোমবার ড্রেন নির্মাণ করতে গেলে গৃহায়ণের প্রকৌশলীরা বাঁধা দেয় জানিয়ে সিটি মেয়র বলেন, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে আলোচনার জন্য আসতে বলি। তারা যখন আসে, আমি তাদের বলেছি, নগরে জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসী চরম ভোগান্তিতে আছেন। ড্রেনটি করতেই হবে। নইলে পুরো সড়ক জুড়ে পানি উঠবে। তখন আলোচনার একপর্যায়ে পেছন থেকে একজন বলে উঠে চসিককে ১২০ ফুট জায়গা হস্তান্তর করা হয়েছে। এর বাইরে আর আসতে পারবে না। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের জায়গা হকাররা দখল করে আছে। তখন আমি তাকে বলি, যেটি জিজ্ঞেস করছি, সেটি বলবেন। আপনার এতো বেয়াদবি করার দুঃসাহস কোত্থেকে পেলেন?

মেয়র বলেন, আসল কথা হচ্ছে সেখানে বাজার বসিয়ে তারা নিয়মিত টাকা আয় করত। বাজার তুলে দেওয়ায় তাদের এতো সমস্যা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নগরে ড্রেন নির্মাণে জোর দিয়েছি। এই নালাটা করা খুব জরুরি।

সিটি মেয়র বলেন, ড্রেনটি বাঁকা হলে পানি আটকে যাবে। কোনোভাবেই বাঁকা করা যাবে না। যখন পানি উঠবে, তখন সব দোষ হবে মেয়রের। দিন শেষে দায়ী হব আমি। তাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছে বলে এখন মিথ্যে অভিযোগ করছে বলেও জানান আ জ ম নাছির উদ্দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত