সুদানে জনগণের বিক্ষোভের মুখে এবার সামরিক সরকারের প্রধান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আওয়াদ ইবনে আউফ পদত্যাগ করলেন। মাত্র একদিন আগে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করে তার নেতৃত্বে একটি সামরিক কাউন্সিল অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিল।
বিবিসি জানায়, শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে জেনারেল আওয়াদ এক ঘোষণায় এ সিদ্ধান্ত জানান। একইসঙ্গে উত্তরসুরী হিসেবে লেফটেনেন্ট জেনারেল আবদেল ফাতাহ আব্দেলরহমান বুরহানের নাম ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার সুদানে তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বশিরকে দেশটির সেনাবাহিনী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং গ্রেপ্তার করে গোপন স্থানে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে যায়।
সেদিন রাতেই ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আহমেদ আওয়াদ ইবনে আউফ ঘোষণা করেন, তার নেতৃত্বে একটি সামরিক কাউন্সিল দুই বছরের জন্য দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিয়েছে। এরপর নতুন সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এক মাসব্যাপী কারফিউ এবং সব সীমান্ত বন্ধ রাখার কথাও ঘোষণা করে সেনাবাহিনী। তবে সামরিক কাউন্সিল নেতৃত্বাধীন সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে দেশটির জনগণ। কারফিউ ভেঙে খার্তুমের রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করে। গত দুই দিনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সৃষ্ট সহিংসতায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়।
এর আগে ডিসেম্বরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সৃষ্ট অসন্তোষ একপর্যায়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। টানা গণবিক্ষোভের ফলে সৃষ্টি রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী এবং তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বশিরকে বিদায় নিতে হয়।
রয়টার্স জানায়, বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে 'বিজয়' বলে আখ্যায়িত করে বিক্ষোভকারীরা। পরে সামরিক সরকারের ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে তারা। দেশটির পেশাজীবীদের সংগঠন দ্য সুদান প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন (এসপিএ) প্রেসিডেন্ট বশির বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
সামরিক সরকারের ঘোষণার বিরোধিতা করে এসপিএ'র একজন সংগঠক সারা আবদেলজলিল বলেন, এটি আগের শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। ফলে আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ এবং লড়াই অব্যাহত আছে। জানায়, 'এটি আগের শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা'
বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা এক পর্যায়ে কারফিউ ভেঙে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে পড়ে। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন জেনারেল আওয়াদ। এসপিএ তার সিদ্ধান্তকে 'পুনরায় বিজয়' বলে আখ্যায়িত করেছে।

এদিকে সামরিক কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র ঘোষণা করেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা চাই না। বিক্ষোভকারীরাই দেশের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে সেনাবাহিনী সরকারের নির্দেশনা মেনে চলবে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।
আফ্রিকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অন্যতম প্রেসিডেন্ট বশির। ১৯৮৯ সালে একদল সামরিক কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশটির ক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি।
গত কয়েক মাসে বিক্ষোভ দমনে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় অর্ধশতাধিকেরও বেশি। এ ছাড়া তিন হাজারের অধিক সুদানিকে গ্রেপ্তার করে গোপন বন্দিশিবিরে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।
সৈনিক হিসেবে চাকরি শুরু করা জেনারেল আওয়াদ হয়ে ওঠেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী কর্মকর্তা। বাহিনীতে তিনি জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। দারফুর গণহত্যা চলাকালীন তিনি ছিলেন সুদানের সামরিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান।
জাতিসংঘের মতে, ২০০৩ সালে সংগঠিত ওই গণহত্যায় নিহত হয়েছে ৩ লাখ মানুষ। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০৯ বশিরের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগ আনে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় এ গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার অভিযোগে জেনারেল আওয়াদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আনে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি সহ সুদানের আরও দুই শীর্ষ কর্মকর্তার সম্পত্তি আটকে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
২০১০ সালে অবসরে যাওয়ার পর জেনারেল আওয়াদ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক হয়ে ওঠেন। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মিশর ও ওমানে। ২০১৫ সালে খার্তুমে ফিরলে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট বশির। মাত্র ছয় মাস আগে তাকে দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়েছিলেন বশির।
