নুসরাত হত্যা: কেরোসিন ও বোরকা সরবরাহকারীকে খুঁজছে পিবিআই

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৫:৩০ পিএম

মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া কেরোসিন ও বোরকা সরবরাহকারী এবং মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেনের শামীমের ভাগনিকে (চাচাতো বোনের মেয়ে) খুঁজছে পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এদিকে রবিবার রাতে নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ার পর থেকে কামরুন নাহার মনি ও জান্নাতুল আফরোজ মনি নামে ওই মাদ্রাসার দুই ছাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পিবিআই।

নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামিমের প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে দেওয়া ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। জবানবন্দিতে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া শাহাদাত হোসেন শামিম, জাবেদ হোসেন ও জোবায়ের আহাম্মদ, উম্মে সুলতানা পপির নাম উল্লেখ করলেও শাহাদাত হোসেন শামিমের ভাগনি কে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী কর্মকর্তা।

পিবিআই-এর পরিদর্শক (ওসি) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, আসামিদের স্বীকারোক্তির আলোকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। নুসরাতের আরও দুই সহপাঠীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, জিজ্ঞাসাবাদে আগুন লাগানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছে, ওই দিন সকাল পৌনে ৯ টার দিকে বান্ধবী নিশাতকে মারধরের কথা বলে নুসরাতকে ডাকতে যায় পপি। তখন তারা নিচতলার শ্রেণিকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণ পর পপি ও নুসরাত ছাদে ওঠে। তাদের পেছন পেছন ওঠে শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে। এরপর তৃতীয় তলা থেকে তারা তিনজন ছাদে যায়।

তারা আরও জানায়, ছাদে ওঠার পর পপি প্রথমে নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে বলে। সে তখন নিশাতকে ছাদে খুঁজে না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর মনিও তাকে মামলা তুলে নিতে বলে। নুসরাত তখন জবাবে বলেছিলেন, ‘আমার গায়ে কেন হাত দিল। আমি মামলা তুলে নেব না। আমি এর শেষ দেখব।’ নুসরাতের এমন মনোভাবে ক্ষুব্ধ শাহাদাত পেছন থেকে এক হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে ও অন্য হাত দিয়ে হাত ধরে। পপি তখন নুসরাতের পা ধরে। আর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে মনি তার শরীর চেপে ধরে। তিনজন মিলে নুসরাতকে তারা ছাদের মেঝেতে ফেলে দেয়। এ সময় পপিকে তারা কৌশলে ‘শম্পা’ বলে ডাক দেয়।

জবানবন্দিতে শাহাদাত বলেছে, নুসরাতকে শুইয়ে ফেলার পর ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলে জোবায়ের। জাবেদ তখন তার সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেয়। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নামতে নামতেই তিনজন বোরকা খুলে কাপড়ের নিচে ঢুকিয়ে ফেলে। ছাত্রী দুজন মাদ্রাসায় তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যায়। আর বাকি তিনজন পালিয়ে যায়।

অধ্যক্ষের মুক্তি দাবির আন্দোলন ও বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন বলে শামীম জানিয়েছে।

জবানবন্দিতে শাহাদাত জানান, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে সে সোনাগাজী বাজারে যায়। তখন তার চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে মনি তাকে একটি পুরনো ও দুটি নতুন বোরকা দিয়ে যায়। সে তাকে পপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিকভাবে কাজ করতে বলে বাজারে কেরোসিন কিনতে যায়। এক লিটার কেরোসিন কিনে সে ‘ডাবল পলিথিনে’ করে নিয়ে আসে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ও মাদ্রাসাছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ ও জাবেদ হোসেন সাইক্লোন শেল্টারের (মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবন) নিচতলার শ্রেণিকক্ষে বসে।

আলোচিত এ মামলায় এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে ওই অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহাম্মদ, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার ও জান্নাতুল আফরোজ। এদের মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত আটজনের মধ্যে ৭ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাফেজ আবদুল কাদের নামে এজাহারভুক্ত আরও এক আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করায় সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল (বুধবার) রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে বিকেলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত