শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টান-মুসলিম বিরোধ নেই, তাহলে হামলার নেপথ্যে কী?

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:৫৫ পিএম

ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় গোটা শ্রীলঙ্কা এখনো শোকস্তব্ধ হয়ে আছে। রাস্তায় স্বাভাবিক গাড়ি চলাচল করলেও সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও খোলা আছে অফিস। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, অল্প কয়েক দিনেই শোক কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে গৃহযুদ্ধ পার করে আসা দেশটির জনগণ।

রোববার খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডের প্রার্থনা চলাকালীন ওই হামলায় নিহত বেড়ে ৩১০ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দেশটির পুলিশ জানিয়েছে।

কিন্তু গির্জা ও হোটেলে একযোগে নিষ্ঠুর এ হামলা কে চালালো? কারা এর জন্য দায়ী? এমন প্রশ্নের এখনো সুরাহা হয়নি। ভারতের পত্রিকা আনন্দবাজার এ নিয়ে প্রকাশ করেছে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

তিন গির্জায় বিস্ফোরণের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার যোগসূত্র খুঁজছেন কেউ কেউ। কিন্তু এমন কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। শ্রীলঙ্কা সরকার ধারণা করছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামায়াত (এনটিজে)’ নামের একটি মুসলিম সংগঠন।

স্বাভাবিকভাবেই একটা বিষয় উঠে আসে, এই হামলার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টান ও মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন সেটি ঘেঁটে দেখা। শ্রীলঙ্কার মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। অন্যদিকে মুসলিমরা হচ্ছে জনসংখ্যার ৯.৭ শতাংশ।

কিন্তু দেশটির এ দুই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কোনো ধরনের বৈরিতা নেই। এমনকি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়াননি তারা। তাদের মধ্যে নেই কোনো শত্রুতা।

তবে খ্রিস্টানদের সঙ্গে মনোমালিন্য রয়েছে শুধু বৌদ্ধদের। ধর্ম পরিবর্তনের প্ররোচনার অভিযোগ ওঠায় অতীতে একাধিক গির্জা আক্রান্ত হয়েছে চরমপন্থী বৌদ্ধদের দ্বারা। কিন্তু রোববারের হামলায় দায়ী করা হচ্ছে মুসলিম সংগঠনকে। অথচ দেশটিতে মুসলিমদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের কোনো বিরোধই নেই।

সিঙ্গাপুরের ‘এস রাজারত্নম সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর অধ্যাপক রোহন গুনরত্নের মতে, কলম্বোর সিরিজ বিস্ফোরণটা আসলে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের কাজ। নিজেদের ‘শ্রীলঙ্কা শাখা’র সঙ্গে হাত মিলিয়েই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে তারা। এনটিজে-কে আইএসেরই সেই শাখা সংগঠন বলে মনে করছেন তারা।

সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে গবেষণায় শ্রীলঙ্কার অন্যতম বিশেষজ্ঞ গুনরত্নে ফোনে আনন্দবাজারকে বলেন, “পশ্চিমা দেশ আর খ্রিস্টানদের গির্জাগুলো আইএসের নিশানা। ইরাক আর সিরিয়ার ঘাঁটি থেকে আইএস-কে উৎখাত করেছে পশ্চিমা দেশগুলোর একটা জোট। আইএস মনে করে, পশ্চিমা দুনিয়াকে আদর্শগতভাবে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে খ্রিস্টধর্ম। শ্রীলঙ্কাসহ সারা বিশ্বেই স্থানীয় শাখাগুলোকে ব্যবহার করে মুসলিমদের মৌলবাদের পথে চালিত করছে আইএস।”

খ্রিস্টান-পশ্চিম আর ইসলামি মৌলবাদ- এই দুইয়ের মধ্যে আদর্শগত সংঘাত চলছে বিশ্বজুড়ে। শ্রীলঙ্কার গির্জায় বোমা হামলা, নিউজিল্যান্ডে মসজিদে বন্দুকহামলা- সবই এই সংঘাতের ফসল বলে মনে হয়। কারও মতে ক্রাইস্টচার্চের এক খ্রিস্টান বন্দুকবাজের হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে হয়তো কলম্বোর গির্জায় হামলা।

যদিও নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পল বুচানন বলেছেন, তাদের দেশে মসজিদে ব্রাশফায়ারে হামলা চালিয়ে মুসলমানদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের দিনে বোমা হামলার সম্পর্ক থাকার সুযোগ নেই।

কলম্বোর তিনটা পাঁচতারা হোটেলে হামলার ব্যাপারটাও নজরে আনার মতো। সাংগ্রি-লা, সিনামন গ্র্যান্ড, কিংসবেরি- সবই পশ্চিমা নাগরিকদের পছন্দের হোটেল। হামলাকারীরা জানতো, বিশ্ববিখ্যাত এই হোটেলগুলোয় হামলা চালালে যেমন প্রচার পাওয়া যাবে, তেমনই ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে পশ্চিমা নাগরিকদের মধ্যে।

বিস্ফোরণের পরে এলটিটিই-র কথা উঠছে। দেশটির এই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘তামিল টাইগার’ আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে বলে শোনা যায়। কিন্তু এদের বা সামগ্রিক তামিল জাতিগোষ্ঠীকে খুব একটা সন্দেহের বৃত্তে রাখছে না সরকার ও পুলিশ সূত্র।

সরকার-এলটিটিই যুদ্ধের পরে তামিলরা এখন বিচার চান। মানবাধিকার নিশ্চিত চান। তার জন্য জাতিসংঘসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং অধিকার সংগঠনগুলোর দ্বারস্থ হতে চাইছে তারা। এই অবস্থায় এমন কাণ্ড ঘটিয়ে তামিলরা পশ্চিমা দুনিয়ার রোষের কারণ হবেন না।

তবে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, দেশের এমন বিপর্যয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য। কয়েক মাসের মধ্যেই দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের নির্বাচন। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম ভোট টানতে চাইবে সব দলই।

গত ২০১৫ সালে মুসলিমরা দলে দলে বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় হারতে হয়েছিল মাহিন্দা রাজাপক্ষকে। ফলে মনে হয় না, ভোটের আগে কোনো দল ধর্মের আগুন জ্বালাতে চাইবে। ‘বোদু বালা সেনা’র মতো কিছু মুসলিম-বিরোধী গোষ্ঠী হয়তো নানা রকম প্রচার চালাতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাতে কান দেবেন বলে মনে হয় না। ভয়াবহ হামলা পরবর্তী এখন পর্যন্ত দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া এমনটাই বলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত