একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর খুলনা বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজনীতির মাঠে নামলেও পরাজয়ের পর আবার নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মামলা-হামলায় বিধ্বস্ত বিএনপি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে তাদের বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে খুলনা বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনো হতাশা ভুগছেন।
এদিকে উল্টো চিত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। জাতীয়, সিটি এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একতরফা বিজয়ে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। তবে ফাঁকা মাঠে বিপুল বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনেক আত্মবিশ^াসী। স্বার্থের দ্বন্দ্বে খুলনার বিভিন্ন স্থানে নিজ দলের নেতাকর্মীরাই এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ।
খুলনা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মতো খুলনা বিএনপি মামলা-হামলার শিকার হয়ে বাড়িছাড়া। এর মধ্যে অনেকে জেলে। অনেকে এখন পলাতক।
এদিকে গত ২৪ মার্চ খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নবনির্বাচিত ১২ কাউন্সিলর বিএনপি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তারা খুলনা মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ছিলেন। ১২ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দলের সংকটময় মুহূর্তে তাদের দল ত্যাগের ঘটনায় হতাশ খুলনা বিএনপি।
এদিকে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন হামলা-মামলার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ গোপনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপির দুজন প্রার্থী হওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়। খুলনা নগরীর কেডি ঘোষ সড়কে দলীয় কার্যালয়ের সামনে খুব একটা দেখা যায় না দলের নেতাকর্মীদের।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের দায়িত্বশীল নেতাদের একাংশ বিভিন্ন মামলায় কারাগারে। মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও বিএনপি শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে তৃণমূল থেকে সংগঠিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দলীয় ভিত শক্ত করেই গণতন্ত্র উদ্ধারে রাস্তায় নেমে পড়ব।’ নেতাকর্মীদের দল ত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাঁচার ত্যাগিদে বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে অনেক কিছু করছেন। তাদের মুখে এক, বুকে আর এক।’
এদিকে রাজনীতির মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ নিষ্ক্রিয় থাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে সদ্য উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধ প্রকট হয়। খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে সাতটিতে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নির্বাচন করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীরা ছোট-বড় সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে খানিকটা চিন্তিত খুলনা আওয়ামী লীগ। যদিও দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি বিরোধ খুব সাময়িক। অচিরেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
বিএনপিবিহীন উপজেলা নির্বাচনের আগেই রূপসা, তেরখাদা, ডুমুরিয়া, কয়রা ও দীঘলিয়ায় আওয়ামী লীগের দুপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও এসব স্থানে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ৪ এপ্রিল রূপসায় বিজয়ী ভাইস চেয়ারম্যানের সমর্থক স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হন উপজেলার মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহিনা আকতার লিপি ও তার ছেলে জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত। হামলাকারীরা তাদের বাড়ি ভাঙচুর করে। লিপি নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। এদিকে কয়রা আওয়ামী লীগের একাংশের অভিযোগ, নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ায় প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দলের অসংখ্য নেতাকর্মী।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সুজিত অধিকারী বলেন, ‘খুলনা আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে। নবনির্বাচিত বিদ্রোহী চেয়ারম্যানদের খুশি করতে অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থক নিজ দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে।’ তিনি আর বলেন, ‘দীর্ঘদিন জেলা কমিটির সভা না হওয়ায় দলের মধ্যে বিভেদ বাড়াসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। খুব দ্রুত সভার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
