বাবার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল এ মাসের বেতন নিয়ে বাড়িতে এসে প্রথম রোজা রেখে ইফতারি করবে বাবা-ভাই-বোনদের সাথে। কিন্তু ধর্ষণকারীদের হাতেই জীবন দিতে হয়েছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের কৃষক গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে, ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে (২৩)।
জানা গেছে, তানিয়ার বাবা গিয়াস উদ্দিন একজন দরিদ্র কৃষক। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়া করাতো। সে ছিল চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। কটিয়াদি স্থানীয় স্কুলে এসএসসি পাশ করে কিশোরগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে এ ভর্তি হয় তানিয়া। কোর্স শেষ করার আট মাস পর ইবনে সিনা হাসপাতালে চাকরি হয় তার। চাকরি হবার দুই মাস পর তার মা ক্যানসারে মারা যায়। তানিয়া অবিবাহিত থাকায় তার চাকরির বেতন পুরোটাই সংসারের কাজে লাগাত। ফলে অন্যান্য ভাই বোনদের লেখাপাড়ার খরচ চালাতে পারত সে। তানিয়া ঢাকা কল্যাণপুর এলাকায় একটি মেসে থেকে চাকরি করত।
তানিয়ার লাশ বাড়িতে আনার পর কান্নায় আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। তানিয়াকে দেখতে বাড়িতে ভিড় জমায় আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসীরা। সারা বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল কে কাকে সান্ত্বনা দেবে বুঝে ওঠাই দায় হয়ে পড়েছে।
নিহত তানিয়ার ভাই কফিল উদ্দিন সুমন বলেন, সোমবার সকালে তানিয়ার সঙ্গে ফোনে আমার বাবার কথা হয় যে, সে রাতে বাড়িতে এসে রোজার প্রথম সেহেরি ও ইফতারি করবে আমাদের সাথে। আমরাও সেই অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস বোনটি আসল, তবে সে আর জীবিত নেই।
নিহত তানিয়ার বাবা গিয়াস উদ্দিন বারবার কান্নায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। মাথায় পানি ঢেলে বেশ কয়েক বার জ্ঞান ফিরানো হয়। একটু সুস্থ হলে তিনি বলেন, তানিয়া ঢাকা থেকে রওনা হবার আগ থেকেই তার ভাই বোনদের ফোনে কথা বলে। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া মঠখলা আসার পরও রাত শোয়া আটটার দিকেও আমার সাথে তানিয়ার ফোনে কথা হয়। সে বলে বাবা বাড়ি আসতে আর ১৫/২০ মিনিট লাগবে। তা শুনে আমি তারাবি পড়তে চলে গেলাম।
সুমন জানান, তানিয়াকে বাসস্ট্যান্ড থেকে আনতে গিয়েছিলাম কিন্তু আমার বোন আর আসেনি আর আমার ফোনও আর ধরেনি। গভীর রাতে সংবাদ পাই তানিয়ার লাশ কটিয়াদী হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে রাখা হয়েছে। শুনে হাসপাতালে ছুটে যাই।
সে জানায়, তানিয়ার সাথে একটি এলইডি ১৯ ইঞ্চি টেলিভিশন, একটি স্যামসাং অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও বেতনের ১৫-১৬ হাজার টাকা ছিল।
প্রসঙ্গত, সোমবার বিকেলে এয়ারপোর্ট কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে স্বর্ণলতা নামক যাত্রীবাহী একটি বাসে শাহিনুর আক্তার তানিয়া কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কটিয়াদী পর্যন্ত আসার পর বাসের অন্য যাত্রীরা নেমে গেলে মেয়েটিকে একা পেয়ে গাড়ির ড্রাইভার এবং হেলপার কৌশলে নিজেদের পরিচিত আরও কয়েকজনকে বাসে তুলে নেয়। পরে, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলী নামক নীরব জায়গায় তানিয়াকে জোরপূর্বক চলন্ত গাড়িতে দল বেঁধে ধর্ষণ করে তারা এবং পরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। তার মৃত্যুর পর ধর্ষণকারীরা রাত পৌনে এগারোটার দিকে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে দুর্ঘটনা কথা বলে লাশ ফেলে রেখে যায়।
কটিয়াদীতে থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল রেজিস্ট্রার সূত্রে লাশটির যারা নিয়ে আসে তাদের নাম পাওয়া যায়। এছাড়া ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ব্যাগ, কাপড়চোপড় পাওয়া যায়। নিহতের শরীরে বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ জানান, পুলিশ রাতেই বাসটির স্থানীয় দুই কর্মীসহ তিনজনকে আটক করে। পরে তাদের সহায়তায় বাসের ড্রাইভার নূরুজ্জামান, হেলপার লালন মিয়াসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে তারা ধর্ষণের কথা স্বীকার করেনি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন।
