সত্তর-আশির দশকে আবাহনী কিংবা মোহামেডানে না খেলেও যে কজন ফুটবলার তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন তাদেরই একজন হাসানুজ্জামান খান বাবলু। ‘ব্রাদার্সের বাবলু’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও দাপটের সঙ্গে খেলেছেন সাবেক এই মিডফিল্ডার। দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবন শেষে বেছে নিয়েছিলেন কোচিং ক্যারিয়ার। বয়সভিত্তিক দলের কোচ হিসেবে সুনাম কুড়ানোর পর দায়িত্ব পালন করেছেন সিনিয়র জাতীয় দলের। কোচিং থেকেও অবসর নিয়েছেন ১২ বছর আগে। তবে দীর্ঘদিন পর আবারও তাকে দেখা যাচ্ছে এই পরিচয়ে। বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার বাছাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে। এবারের সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকারে থাকছে দীর্ঘ আলোচনার চুম্বক অংশ।
কোচিং ছাড়ার ১২ বছর পর ফের এই রূপে দেখা যাচ্ছে আপনাকে। হঠাৎ আবার কোচিংয়ে ফেরার কারণ কী?
সত্যি বলতে, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কোচিং বরাবরই উপভোগ করি। কোচিং ক্যারিয়ারের বড় একটি সময় বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল নিয়েই কেটেছে। টুকটাক সাফল্য এনে দিতে পেরেছিলাম। আবারও তরুণ ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ আসলে করে দিয়েছে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের কথা যখন সংগঠনটির মহাসচিব জানালেন তখনই রাজি হয়ে গেলাম। কারণ গত ১৫ বছরে তৃণমূল থেকে ফুটবলার তুলে আনার মতো কার্যকরী কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি বাফুফেকে। পাইপলাইনে তাই মরচে ধরে গেছে। বাফুফের বাইরে থেকে একটি সংগঠন এমন উদ্যোগ নেওয়ায় আমি চ্যালেঞ্জটা নিলাম। শুরু থেকেই আমার সঙ্গে পেয়েছি জনি ও আসলামের মতো দুই সাবেক তারকাকে। আর এই আয়োজনের শেষভাগে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আমারই ছাত্র সাইফুর রহমান মনি ও জালাল। এই পাঁচজন মিলেই মূল বাছাইটা করেছি।
বাছাই প্রক্রিয়ার শুরুর থেকেই ছিলেন টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান হিসেবে। প্রক্রিয়াটা একটু সবিস্তারে বলবেন?
বাফুফের সহায়তা ছাড়া দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছানো আসলে সত্যিই কঠিন। তবে আমরা যেটা করেছি সেটা হলো আটটি বিভাগে তিনজন করে মোট ২৪ জন কোচ নিয়োগ দিয়েছি। তারা প্রতিটি বিভাগে উন্মুক্ত ট্রায়ালের আয়োজন করেছে জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তা নিয়ে। সেখানে একটা প্রাথমিক বাছাইয়ের মাধ্যমে আমরা ৩০ জন করে ফুটবলার বাছাই করেছিলাম। তাদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে দুই মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়েছে। এরপর নড়াইল ও নাটোরে আটটি বিভাগের দল নিয়ে শেখ কামাল অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়। সেখান থেকে আমরা সেরা ৫৩ জন ফুটবলারকে বেছে নিয়েছি দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য। জুলাইয়ে চট্টগ্রামে যেটা শুরু হবে। আমি বলতে পারি এরা যদি সঠিক পরিচর্যা পায় তবে এক বছরের মধ্যে শীর্ষ লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। এরাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
গত ছয় মাসে এই আয়োজনের কারণেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গেছেন আপনি। বলা হয় ক্রিকেটের আগ্রাসনে গত দুই দশকে ফুটবলের জনপ্রিয়তা এ দেশে কমে গেছে। কথাটা কি সত্যি?
কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে। যদি জরিপ করা হয়, তবে এখনো দেখবেন ফুটবলের জনপ্রিয়তা ক্রিকেটের থেকে অনেক বেশি। কিন্তু গত ১৫ বছরে জেলায় নিয়মিত ফুটবল লিগ না হওয়ার ফলে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। জেলার উঠতি ছেলেরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না একদমই। অথচ এই জেলা লিগগুলো খেলেই একসময় ঢাকা মাতিয়েছেন বড় বড় সব তারকা। জেলা লিগ অনিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি স্কুল ফুটবলও প্রায় বন্ধ। ফলে কিশোরদের মধ্যে একটা হতাশা তৈরি হয়ে গেছে। ফুটবলই পারে সেই হতাশা কাটিয়ে তুলতে। গত ছয় মাসে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অনেক ফুটবল প্রতিভা চোখে পড়েছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আমরা তুলে এনেছি। বিডিডিএফএ যেটা করেছে তার জন্য অবশ্যই তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। একমাত্র বাফুফেই পারে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ফুটবল প্রতিভা খুঁজে নিয়ে আসতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, সেটা বাফুফেকে করতে দেখা যায় না।
আপনারা অনূর্ধ্ব-২০ বয়সীদের বাছাই করেছেন। এটা দিয়ে কি সত্যিকার অর্থে ফুটবলের উন্নতি সম্ভব?
আমি জাপানে গিয়ে দেখেছি তারা কেবল ডেভেলপমেন্ট খাতে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার খরচ করে। আমাদের দেশে তার কিছুই হয় না। এই সংগঠন যেটা করেছে সেটা তৃণমূলে একটা নাড়াচাড়া দেওয়া। অনূর্ধ্ব-২০ বাছাই কখনই আদর্শ নয়। এদের পরিকল্পনা আছে ভবিষ্যতে অনূর্ধ্ব-১৮ এবং পর্যায়ক্রমে অনূর্ধ্ব-১৬ ও ১৭-তে নামিয়ে আনার। তারা যদি এটা নিয়মিত করে তাহলে ফুটবলার সংকট অনেকটাই কমবে বলে মনে করি। দেখুন, আমি কিন্তু রাজশাহীতে আন্তঃস্কুল ফুটবলে থেকে ঢাকায় আসতে পেরেছি। ঢাকায় এসেও মোহামেডান-আবাহনীর মতো বড় দলে শুরু থেকে খেলিনি। খেলেছি ব্রাদার্সের হয়ে। নিজের প্রতিভা দিয়েই এই ব্রাদার্সের হয়েই তারকাখ্যাতি পেয়েছি। আজ মানুষ আমাকে চেনে ব্রাদার্সের বাবলু হিসেবে। সুতরাং তৃণমূল ও স্কুল ফুটবলে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
