জিততেই মাঠে যাবেন লিটন দাস

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ০২:২৪ এএম

টানা অনুশীলন, খেলা আর ভ্রমণ থেকে রেহাই, একটা দিন ক্রিকেট থেকে বাইরে। খেলাটা পেশা। এর বাইরেও জীবন আছে ক্রিকেটারদের। ক্লান্তির ওষুধ হিসেবে ব্যক্তিগত সময়, নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া দরকার হয়। আর দশজন মানুষের মতোই তাদেরও বিনোদন চাই। তাই স্টিভ রোডসের পাঠশালা থেকে এক দিন ছুটি পেয়ে সবারই যেন মনে পড়ে গেছে, ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি।’ ঘুম থেকে উঠেই যে যার মতো বেরিয়ে গেছেন, কেউ কেউ আবার লোকচক্ষুর আড়ালে হোটেলেই দিন গুজরান করেছেন। যারা হোটেলে ছিলেন, তাদেরও সময়টা মন্দ কাটার কথা না। রিভারব্যাংক প্লাজা হোটেলের সামনের দিকে জানালায় এলেই যে টেমস নদীর সৌন্দর্যে দুই চোখ ভরে নেওয়া যায়। বুধবারই ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন বলে দিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার টাইগার দলের সবার ব্যক্তিগত দিন। দেশ থেকে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের খবর চাই। তাই মানা না শুনে ঠিকই হোটেলে ভিড় জমানো। অবশেষে পাওয়া গেল লিটন দাসকে।

সৌম্য সরকারের অফফর্মের কারণে গত উইন্ডিজ সফর থেকে তামিম ইকবালের উদ্বোধনী জুটি হিসেবে পোক্ত হয়ে গিয়েছিলেন লিটন। এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাজিস্টিক সেই সেঞ্চুরির পর নিউজিল্যান্ডে গিয়ে চরম হতাশ করেন তিনি। তিন ওয়ানডেতে ১, ১, ১ স্কোরে তিনি নিজেই সৌম্যর ফিরে আসার পথ খুলে দেন। প্রিমিয়ার লিগের শেষ দুই রাউন্ডে সেঞ্চুরি আর ডাবল সেঞ্চুরি করে আবাহনীকে শিরোপা এনে দিয়ে নিজের ভাগ্য লিখে নেন সৌম্য। এরপর ত্রিদেশীয় সিরিজে ব্যাট হাতে এমন আলো ছড়িয়েছেন, বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তামিমের সঙ্গে ওপেন করতে নামবেন সৌম্য। লিটন কি প্রতিযোগিতা থেকে দূরে? একদমই না। টিম ম্যানেজমেন্টকে বার্তা দিয়ে রেখেছেন, তিনিও প্রস্তুত আছেন। যুক্তরাজ্যে এসে দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন। দুটিতেই ফিফটি করেছেন। আয়ারল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে খেলেছেন ৭৬ ও ৭৩ রানের দুটি ইনিংস। যা কোচ ও অধিনায়কের জন্য মধুর সমস্যা তৈরি করেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতাকে দলের জন্য আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন লিটন। ইনিংস শুরুর দায়িত্ব না পান, যদি একাদশে থাকেন, দলের প্রয়োজনে ব্যাটিং অর্ডারের যেকোনো জায়গায় খেলতেও মানসিকভাবে প্রস্তুত আছেন লিটন। সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন তিনি। সুযোগটা এলে চেষ্টা করবেন নিজেকে উজাড় করে দিতে। তার কাছে দলের জন্য অবদান রাখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।

খেলা যেহেতু ইংল্যান্ডে, কথাবার্তায় ঘুরেফিরেই কন্ডিশন এবং উইকেট প্রসঙ্গ আসছে। কন্ডিশন নিয়েও তিনি আর কোনো জুজুর ভয় দেখছেন না। ত্রিদেশীয় সিরিজের পর লেস্টারের ক্যাম্প আর কার্ডিফে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন সবাই। গ্রীষ্ম এখনো শুরু হয়নি। তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৭ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। যা নাকি আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার পরের তাপমাত্রার তুলনায় অনেক উষ্ণ। লিটন মনে করেন, দেশে ক্যাম্প করলে এত ভালো প্রস্তুতি হতো না। যা বাংলাদেশ দলকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। আগে থেকে উইকেট নিয়ে চিন্তা না করার পক্ষে এই ওপেনার। যেখানে যেরকম উইকেট পাওয়া যাবে, ওভাবেই খেলাটা খেললে দলের জন্য ভালো হবে। উইকেট নিয়ে একরকম চিন্তা করে গিয়ে আরেকরকম পেলে বরং মানসিক একটা দ্বিধা তৈরি হবে।

লিটনের মতে, শুধু টপ অর্ডারেই না, প্রতিযোগিতা আছে সব বিভাগেই। স্কোয়াডের ১৫ জনই ম্যাচ খেলার সমান দাবিদার। ম্যাচের একাদশ নির্বাচন করা যাদের দায়িত্ব, তারা যা ভালো বোঝেন সবাই সেভাবেই নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করবে। লিটনের বিশ্বাস, এবার বিশ্বকাপে বড় রান হবে। টাইগার দলের সবাই সেভাবেই প্রস্তুত হয়েছে, ‘যদি তিনশোর ওপরে টার্গেট থাকে, আমরা সেটা তাড়া করতে নামব। আর নিজেরা আগে ব্যাট করলেও তিনশোর ওপরে স্কোর করার লক্ষ্য নিয়েই নামব।’ লিটন এটাও জানেন, বিশ্বকাপে কোনো প্রতিপক্ষই সহজ নয়। আর প্রথম তিন ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে হওয়ায় প্রাথমিক লক্ষ্য সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোও অনেক কঠিন হবে। তিনটি দলই ইংলিশ কন্ডিশনে খেলে অভ্যস্ত। কিন্তু সাহস হারাচ্ছেন না লিটন, ‘আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে। কিন্তু এমন না যে আমরা পারব না। শুধু প্রথম ম্যাচ না, শেষ ম্যাচ পর্যন্তও আমরা জয় নিয়েই চিন্তা করব। এখানে এসেছি জেতার জন্য। জিতব কি হারব সেটা তো পরের বিষয়। মাথায় তো সবসময় লক্ষ্য থাকে জেতারই। সব ম্যাচেই জেতার জন্য নামব।’

সেমিফাইনালে যেতে হলে জেতার মধ্যেই থাকতে হবে, প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক। লিটনও জানেন, কেউ এসে বাংলাদেশকে পয়েন্ট দিয়ে যাবে না। সেটা জিতেই অর্জন করতে হবে। এই মানসিকতা নিয়ে টাইগাররা প্রতি ম্যাচে এগোবে। যে চিন্তাটা অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা দলের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

টুর্নামেন্টে ভালো করার ক্ষেত্রে ফিল্ডিং বিরাট গুরুত্বপূর্ণ হবে। দলের ব্যাটিং নিয়ে লিটনের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। বোলিং শক্তিতেও যথেষ্ট আস্থা আছে। ফিল্ডিংয়ে উন্নতি করার অনেক জায়গা দেখেন তিনি। সেটা করতে পারলে কিছু রান আটকানো যাবে, যা প্রতিপক্ষের চেয়ে বাংলাদেশ দলকে আলাদা করে দিতে পারে। ছুটির দিনে স্বল্পভাষী লিটন দাসও আধুনিক ক্রিকেট দর্শনের পাঠ নিয়ে নিয়েছেন, শিক্ষক তিনি নিজেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত