চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় শাশুড়িকে ছুরিকাঘাতে খুন করা সিআইডির কনস্টেবল অসীম ভট্টাচার্যকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর পুলিশের কয়েকটি টিমসহ গোয়েন্দারা তাকে গ্রেপ্তারে হন্যে হয়ে খুঁজেও কোন কোন সন্ধান পায়নি অসীমের। তার দুটি ফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। হত্যার কিছুক্ষণ পর তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিও ডি-এ্যাক্টিভ করা হয়েছে।
ঘটনা বিশ্লেষণ করে পুলিশ ধারণা করছে, সিআইডি কনস্টেবল অসীম পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভাবেই স্ত্রী ফাল্গুনীকে হত্যা উদ্দেশে যখন ছুরিকাঘাত করেন, তখন বাঁধা দিতে গিয়ে খুন হন শাশুড়ি শেফালী অধিকারী। হত্যাকাণ্ডের পর আলমডাঙ্গা থানা-পুলিশ ঘাতক অসীমের শয়ন কক্ষ থেকে ২১ বোতল ফেনসিডিল ও একটি ভারতীয় সিমকার্ড উদ্ধার করেছে।
অসীমের ঘর থেকে মাদক ও বিদেশি সিমকার্ড উদ্ধারের সত্যতা নিশ্চিত করে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আসাদুজ্জামান মুন্সি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর তার মাদকাসক্তির বিষয়টিও তাদের নজরে এসেছে। এ ছাড়া সে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলামকে। তিনি ইতিমধ্যে তার কাজ শুরু করেছেন।
এদিকে নিহত শেফালী অধিকারীর স্বামী সদানন্দ অধিকারী স্ত্রী হত্যার অভিযোগে জামাতা সিআইডির কনস্টেবল অসীম ভট্টাচার্যের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। শনিবার রাতে তিনি মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, দীর্ঘ ৯ বছর আগে অসীমের সাথে আমার মেয়ে ফাল্গুনীর বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে অসীম স্ত্রীকে সন্দেহ করতে শুরু করে। এ বিষয়টি নিয়ে মাঝে মধ্যেই তাদের কলহ দেখা দিত। দিনে দিনে অসীমের সন্দেহের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং কারণে অকারণে আমার মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতো। ঘটনার দিন শুক্রবার রাতেও এই একই বিষয় নিয়ে গলার ওড়না জড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় ফাল্গুনীকে। এ সময় ফাল্গুনী কৌশলে ঘর থেকে বেড়িয়ে সামনে আমার বাড়িতে চলে আসে। এর কিছুক্ষণ পরেই অসীম আমার বাড়িতে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে। এ সময় ফাল্গুনী গেট খুলতেই তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত শুরু করে অসীম। তাকে বাঁচাতে আমার স্ত্রী শেফালী অধিকারী, ছেলে আনন্দ অধিকারী এগিয়ে গেলে তাদেরকেও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত শুরু করে। অসীমের ছুরিকাঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় আমার স্ত্রী শেফালী অধিকারী।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মামলাটি খুবই স্পর্শকাতর। এ জন্য অতি সতর্কতার সাথে তদন্তকার্য চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে অসীমের প্রতিবেশীসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যে তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে এ হত্যাকাণ্ড নাকি ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারণ আছে এমন প্রশ্নে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তদন্তকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম।
তবে ঘাতক অসীম ভট্টাচার্যের শ্বশুর পক্ষের স্বজনদের দাবি- নিজের বৌদির সাথে দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়া চালিয়ে আসছিল অসীম। এটি নিয়েই বিরোধ বাঁধত। সেটি ধামাচাপা দিতে উল্টো স্ত্রী ফাল্গুনীকেই পরকীয়ার অভিযোগ এনে নির্যাতন চালানো হতো।
রোববার সকালে আলমডাঙ্গার মাদ্রাসা পাড়ায় সরেজমিন অনুসন্ধান করেও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তেমন কোন নতুন তথ্য মেলেনি। তবে স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছেন স্ত্রী ফাল্গুনী অধিকারীর ফোন ব্যবহার পছন্দ করতেন না স্বামী অসীম।
স্থানীয় বাসিন্দা ফয়েজ উল্লাহও এমন তথ্য দিয়ে জানান, এই বিষয়টি নিয়ে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতো। গন্ডগোলও লাগত। চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যেত।
চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে কনস্টেবল অসীম ভট্টাচার্য। তাকে গ্রেপ্তারে আমরা প্রযুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি। পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম সাদা পোশাকে কাজ করছে। এর বাইরে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে মাঠে নামানো হয়েছে। খুব দ্রুতই তাকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারব।
এদিকে, নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শাশুড়িকে খুনের অভিযোগ ও স্ত্রী -শ্যালককে আহত করার ঘটনায় অসীম ভট্টাচার্যকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে শনিবার ভোরে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা শহরের মাদ্রাসা পাড়ার ভাড়াটিয়া বাসাতে শাশুড়ি শেফালী অধিকারীকে ছুরিকাঘাত করে খুন করে চুয়াডাঙ্গা সিআইডিতে কর্মরত কনস্টেবল অসীম ভট্টাচার্য। একই সাথে স্ত্রী ফাল্গুনী অধিকারী ও শ্যালক আনন্দ অধিকারীকেও খুনের উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে জখম করা হয়। পরে তাদের দুজনকে উদ্ধার করে প্রথমে কুষ্টিয়া আড়াই শ বেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেলে পাঠানো হয়। ঘটনার পর থেকেই লাপাত্তা রয়েছেন অভিযুক্ত অসীম ভট্টাচার্য।
