বাবাকে সম্মান জানানোর ইচ্ছাই বেয়ারস্টোর শক্তি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ১২:৫২ এএম

চার দিন আগে জনি বেয়ারস্টো একটি মন্তব্য করে বিপাকে পড়েন। সংবাদমাধ্যম, ইংল্যান্ডের সাবেকরা থেকে শুরু করে দলের ভেতরও ছড়িয়ে পড়ে তার মন্তব্যের প্রতি বিরক্তির ভাব। ব্যাপারটি ভালো লাগেনি ইংল্যান্ড ওপেনারের। ঠিক করেন, ব্যাটেই জবাব দেবেন। তাই ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, তার পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেও একটি। ইতিহাসের প্রথম ইংলিশ ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি। বেয়ারস্টোকে এমন জ্বলে ওঠার রসদ জুগিয়েছে ওই অভিমান-খারাপ লাগা। তার জীবনে বিরাট এক বিভীষিকা আছে। যে ঘটনাটি ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে এগিয়ে যাওয়ার-সাফল্য পাওয়ার শক্তি জোগায়।

বেয়ারস্টোর এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা তার বাবা। ডেভিড বেয়ারস্টো, ছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লর্ডসে দেশের শততম টেস্টের দলেও ছিলেন। কাউন্টিতে ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলতেন। ইংল্যান্ডের হয়ে তার ক্যারিয়ার থেমে যায় চার টেস্ট ও ২১ ওয়ানডেতে। দলে সুযোগ না পাওয়ায় দ্রুত অবসর নিতে হয়। এই বিষণœতাতেই কি না ১৯৯৮-এ আত্মহত্যা করেন। সে বছর শীতের ওই রাতটির কথা কখনই ভোলেন না বেয়ারস্টো। সেদিনের আট বছরের শিশু দেখেছেন বাবার ঝুলন্ত লাশ। ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে থাকা মা ও এক বোনকে নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সফলতার পথে হেঁটেছেন। এর পেছনে তাকে সবসময়ই সাহস জুগিয়েছে বাবার না পাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার স্পৃহা। এ শক্তিতেই শক্তিমান বেয়ারস্টো এখন এতটা সফল। টেস্ট বা ওয়ানডের প্রতি সেঞ্চুরি আকাশের দিকে তাকিয়ে উৎসর্গ করেন পরলোকে থাকা বাবাকে।

বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হয়েছেন বেয়ারস্টো। বাবার মতোই খেলেন ইয়র্কশায়ারে। ২০১১-তে ওয়ানডে অভিষেক আর এক বছর পর টেস্ট। সেই থেকে খেলেছেন ৬৩ টেস্ট, করেছেন ৩৮০৬ রান। আর গতকালের ৭২তম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি দিয়ে করেছেন ২৭৯১ রান। গত বছর অ্যাশেজে ক্যারিয়ারের প্রথম অ্যাশেজ সেঞ্চুরি করে মুখে বলেছিলেন বাবাকে শতরান উৎসর্গের বিষয়টি। বাবাকে সম্মান জানানোর এ ইচ্ছা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই হৃদয়ে ছিল বেয়ারস্টোর, এখনো আছে। বাবাকে উৎসর্গ করে লিখেছেন বই, যার নামের বাংলা করলে দাঁড়ায়Ñ পরিষ্কার নীল আকাশ। যাতে বাবাকে হারানোর দিন থেকে নিজের প্রতিজ্ঞার কথা লিখেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে বাবা যে সম্মান পায়নি, সেই সম্মান চাই তার। এই প্রতিজ্ঞা তাকে টেনে এনেছে আজকের অবস্থায়। অভিমান-খারাপ লাগা-চাপ ভালোবাসেন বেয়ারস্টো। এই পরিস্থিতিগুলো তাকে আরও জেদি হতে সাহায্য করে।

যেমনটি করল এবারও। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারের পর বললেন, ‘সবাই বসে থাকে আমাদের ব্যর্থতার জন্য। মিডিয়া আলোচকদের অর্থ দিয়ে আমাদের সমালোচনা করান।’ বিপরীতে মাইকেল ভন বললেন, ‘নিজেদের ব্যর্থতা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।’ সতীর্থ জস বাটলার বললেন, ‘বেয়ারস্টো একদমই বাজে কাজ করেছে। এমনটা বলা উচিত হয়নি।’ এসব দেখে ক্ষেপে যান বেয়ারস্টো। ভারতের বিপক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই নিজের দিকে আসা সমালোচনার তীরের জবাব দিয়ে দিলেন। ১০৯ বলে করলেন ১১১। আর গতকাল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করলেন ৯৯ বলে ১০৬ রান। এতে প্রথম ইংলিশ ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বকাপে টানা সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন। ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরিতে এই আসরে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় সেরা দশে উঠে এলেন নয় ম্যাচে ৪৬২ রান নিয়ে। কালকের সেঞ্চুরি দিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা তৃতীয় সেঞ্চুরির কীর্তিও দেখালেন বেয়ারস্টো। গত বছর মার্চে ডানেডিনে ১৩৮ ও পরের ম্যাচে ক্রাইস্টচার্চে করেছিলেন ১০৪। এরপর এই বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়ে আবারও সেঞ্চুরি।

পরলোকে থাকা বাবা ডেভিড নিশ্চিত দেখছেন ছেলের কীর্তি। গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে মুচকি হাসছেনও হয়তো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত