ভুল দল-নির্বাচনের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কারণ

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ১২:২০ এএম

একদিনের সেমিফাইনাল দুদিনে হারল ভারত! যে নিউজিল্যান্ডকে পেয়ে অধিনায়কও মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিলেন, ‘বাকি দুটি ম্যাচ’-এর কথা, সেই নিউজিল্যান্ডই ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছল, ভারতকে ১৮ রানে হারিয়ে। ভারত ম্যাচ হেরে গিয়েছিল চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে, ৫ রানে তৃতীয় উইকেট হারিয়ে। অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াইয়ে ছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা আর মহেন্দ্র সিং ধোনি, সপ্তম উইকেটে ১১৬ রান জুড়ে। কিন্তু, ৪৭.৫ ওভারে জাদেজা আর ৪৮.৩ ওভারে ধোনির আউট নিশ্চিত করে দেয়, বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচের বিজয়ীর সঙ্গে কেন উইলিয়ামসনরা লর্ডসে খেলবেন আগামী রবিবার, ফাইনালে।

নতুন দিন, সকালের ভারী আবহাওয়া, ঢাকা উইকেটের স্যাঁতসেঁতে ভাব। এই সবগুলো কারণ যথেষ্ট ছিল কিউই জোরে বোলারদের কাছে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে এভাবেই প্রস্তুতি ম্যাচে কিউইরা দেখিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় ব্যাটিংয়ের কঙ্কালসার ছবিটা। উইকেট-টু-উইকেট জোরে বোলিং, ব্যাটসম্যানকে রান তোলার সুযোগ না দিয়ে ক্রিজে আটকে রাখার চেষ্টার বিরুদ্ধে এই ভারতীয় দল ততটা স্বচ্ছন্দ নয়। বল সুইং করলে তো আরও সমস্যা! সেই সুযোগটা দুর্দান্তভাবেই নিলেন বোল্ট-হেনরি-ফার্গুসনরা। ৫ রানে তিন উইকেট এবং আউট হওয়া সেই তিনজনের নাম যখন রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল আর বিরাট কোহলি, ভারতের লক্ষ্যটা ২৪০ থেকে এমনিতেই ৩৪০ তখন!

সঞ্জয় মাঞ্জরেকর টুইটারে কী বলবেন এবার? ৩০.৩ ওভারে হার্দিক পান্ডিয়া আউট হওয়ার পর মাঠে এসেছিলেন জাদেজা। ভারতের রান ৬ উইকেট হারিয়ে ৯২। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের দুই কাণ্ডারি সেখান থেকে হাল ধরেছিলেন ইনিংসের। ৫৯ বলে ৭৭ জাদেজার, চারটি করে বাউন্ডারি এবং ছক্কা। ধোনি, উল্টোপ্রান্তে, যথারীতি ‘গাইড’-এর ভূমিকায়। এখন যে ভূমিকায় তিনি থাকেন সাধারণত, এগিয়ে দেন তরুণতর প্রজন্মকে, অন্যপ্রান্তে ঝড় তুলে দিতে।

শুরু থেকেই জাদেজা বুঝিয়েছিলেন, দিনটা তার হতেই পারে। রস টেইলরকে রান আউট করার পরের বলেই ল্যাথামের দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসকে ২৩৯ রানের বেশি এগোতে দেননি। ব্যাট হাতেও তিনি ধুন্ধুমার শুরু থেকেই। যে মাঠে ভারতের বাকি ব্যাটসম্যানরা রান তুলতে ব্যর্থ, একা তিনিই রান করে গেলেন একশোর বেশি স্ট্রাইক রেট রেখে। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা হলেও সহজ হয়েছিল উইকেট। সকালের সেই বিপজ্জনক ভাবটা ততক্ষণে উধাও, যে সময়টা ক্রিজে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য হার্দিক ও ঋষভের খানিকটা প্রশংসা প্রাপ্য অবশ্যই। কিন্তু, ‘স্যার’ জাদেজা, যে-নামে তিনি প্রসিদ্ধ ভারতীয় সমর্থকদের কাছে, বুঝিয়ে গেলেন আবারও, তাকে বিশ্বকাপের শুরু থেকে না খেলিয়ে কী ভুলটাই না করেছিল শাস্ত্রী বাহিনী। ক্রিকেট, কখনো কখনো, নিষ্ঠুর। জাদেজার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালটা যেমন। ১০ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে এক উইকেট, দুটি ক্যাচ, একটি রান আউটের পর ব্যাটে ৭৭! তবুও তিনি পরাজিত দলে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল না হলে হয়তো ম্যাচের সেরার পুরস্কারটা হেনরির (৩৭ রানে তিন উইকেট) জায়গায় জাদেজার হাতেই উঠত। ম্যাচটা ‘ম্যাচ’ হয়ে উঠেছিল জাদেজার জন্যই।

প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, ভারতের মিডল অর্ডার ভঙ্গুর। যেকোনো একদিনের দল ভালো খেলে প্রথম তিনজন ব্যাটসম্যান বড় রান করলে, প্রমাণিত সত্য। কিন্তু, সেই দলই ভালো থেকে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যখন চার-পাঁচ-ছয় নম্বরে থাকা ব্যাটধারীরা বলপ্রতি এক রানের বেশি তোলেন নিয়মিত। সেখানে ভারত চার নম্বর থেকেই প্রায় প্রতিবন্ধী। আম্বাতি রাইডুকে নেওয়া হয়নি, দিনেশ কার্তিক দলে! কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, কার্তিকের অভিজ্ঞতা বেশি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগল কি? যখন সুযোগ পেলেন, চূড়ান্ত ব্যর্থ। বিশেষত, সেমিফাইনালে, যেখানে সময়ও ছিল হাতে। কিন্তু, ছন্দেই নেই যিনি, এত বড় দায়িত্ব কী করে পালন করবেন? রাইডু অভিমানে অবসরই নিয়ে ফেললেন, ভারতীয় কোচ মাথা ঘামাতে রাজি হননি।

ভুল দল-নির্বাচনের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই ভারতের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের কারণ। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে অস্ট্রেলিয়ার হারও খানিকটা। অস্ট্রেলিয়া জিতলে ভারতকে খেলতে হতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, এজবাস্টনে। সেই মাঠেই ইংল্যান্ডের কাছে গ্রুপ লিগে হেরেছিল ভারত। কিন্তু, সেই কারণেই মাঠে হয়তো তাগিদ আরও বেশি থাকত ভারতীয়দের, আগের ম্যাচের ফল ভুল প্রমাণ করতে হবে বলে। সবচেয়ে বড়, ম্যানচেস্টারের বৃষ্টিভেজা দিনও দেখতে হতো না হয়তো, ম্যাচটা যেখানেও হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল ভারতের।

মোহম্মদ শামিকে না-খেলানো নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, চাহালের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও। তবু, বোলিং-ফিল্ডিং নিয়ে প্রশ্নের জায়গা তত নেই, যা আছে ব্যাটিং নিয়ে। রোজ রোহিত খেলতে পারেন না, সম্ভব নয়। বিরাটও একদিন কম রানে আউট হতেই পারেন। এত লম্বা লেজ নিয়ে কখনো কোনো দল কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে? ধোনির কাছে ২০১১-এর, এমনকি ২০১৫-এর ফর্ম আশা করাটাই অনুচিত। তবুও, চেষ্টার কসুর করেননি। তার ৭২ বলে ৫০ হারকে সম্মানজনক করল। শেষ পর্যন্তথাকলে কী হতো, ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা আগামী দিনেও আফসোস করবে। ভারতের দরকার ছিল চার-পাঁচে রাইডু-ঋষভদের শুরু থেকে, যাতে ব্যাটিং নিয়ে এই আতঙ্কটা বুকে চেপে না বসতে পারে, রোহিত-বিরাট আউট হলেই। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়লে চলে না! চোর যাতে না পালাতে পারে, বন্দোবস্ত আগেই করে রাখতে হয়। যা করেনি ভারত। ফলে আবারও ফাইনালের একধাপ দূর থেকেই বিদায়!

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত