স্কুটির গতির সঙ্গে যুতসই পোশাক

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ০১:৪৯ এএম

কখনো কাছের মানুষ আবার কখনো সমাজ ব্যবস্থা বাদ সাধে নারীর পথচলায়। নারীরা সব থেকে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন যাতায়াতে। তাই বলে কখনো থেমে যায়নি অগ্রযাত্রা। যুগের প্রয়োজনেই হোক কিংবা নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করতে নারীরা এখন নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে বেরিয়ে পড়েছেন ঘরের বাইরে । এখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যায় নারীর সাহসী বিচরণ। প্রায় প্রতিদিনই নানা কাজে নারীদের বেরিয়ে পড়তে হয়, ছোটাছুটি করতে হয় মাইলের পর মাইল। আর তাদের এই চলার পথকে একধাপ এগিয়ে নিতে যুক্ত হয়েছে দ্বিচক্রযান স্কুটি। অনেক নারীর পথের সঙ্গী এখন স্কুটি। বিশেষ করে তরুণীদের কাছে এই দ্বিচক্রযানটি বেশ জনপ্রিয়। আমাদের দেশের যানবাহনে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সেই সঙ্গে নিরাপত্তা অনেক কম। আর যেকোনো গন্তব্যে যাওয়ার পথে যাতায়াত ব্যবস্থা হয়ে ওঠে একজন নারী ও তাদের পরিবারের চিন্তার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে এই অসুবিধার জন্য থেমে যায় তাদের কাজ। মেট্রোলাইফে বৈচিত্র্য এনেছে স্কুটি। স্কুটির পাশাপাশি বাইকও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নারীদের কাছে। স্কুটি বা বাইক একজন নারীর যাতায়াত সুবিধায় প্রদান করে না সেই সঙ্গে নারীকে আত্মবিশ্বাসীও করে তোলে। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে অফিসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নারীরা এই বাহন বেছে নিয়েছে। তবে স্কুটি চালাতে গিয়ে নিজেদের আধুনিক ও ফ্যাশনেবল করার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের দিকেও লক্ষ রাখতে হয়। কেননা মার্জিত পোশাক সেই সঙ্গে আচরণে দৃঢ়তা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়।
স্কুটি কিংবা বাইক আপনি যেই বাহনই ব্যবহার করুন না কেন আপনাকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে আপনার পোশাক নিয়ে। সাধারণত সব ধরনের পোশাক পরেই স্কুটি চালানো যায় তবে বাইকের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শাড়ি। অনেকেই মনে করেন ওয়েস্টার্ন পোশাকেই বাইক বা স্কুটি চালাতে হয়। এমন ধারণা ঠিক নয়। আপনি ওয়েস্টার্নের পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ কিংবা শাড়ি পরেও স্কুটি চালাতে পারেন। মোট কথা যে পোশাকে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন সেটাই বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে সুতি, রেয়ন কিংবা লিলেন কাপড়ই স্কুটি চালানোর জন্য বেশ আরামদায়ক। শাড়ি, সেলোয়ার-কামিজ, কুর্তি, ফতুয়া, টপস, জিন্স বা গ্যাবার্ডিনের সঙ্গে শার্ট বা টি-শার্ট এবং ফরমাল শার্ট-প্যান্টও পরতে পারেন। যেহেতু ঢাকার রাস্তার কমবেশি জ্যাম থাকে। তার ওপর ধুলোবালি ও প্রচ- গরম থাকে। এই পরিস্থিতিতে স্কুটি বা বাইক চালাতে পোশাক কেমন হওয়া উচিত তা জেনে নিন।

পোশাকের ধরন
হালকা ফেব্রিক্স :  বাইক কিংবা স্কুটি চালানোর সময় মোটা ও ভারী কাপড় এড়িয়ে চলুন। কেননা তা মোটেও আরামদায়ক নয় এবং যাতায়াতে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলবে। তাই সব সময় হালকা কাপড় বেছে নিন। এতে শরীরে সহজে বাতাস প্রবেশ করবে। আপনার চলাফেরাকে করবে স্বাচ্ছন্দ্যময়।
ওয়েস্টার্ন  পোশাক :  যেহেতু এদেশের আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত এবং রাস্তাঘাটে ধুলোবালি। তাই আরামে বাইক বা স্কুটি চালানোর জন্য ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নের যেসব পোশাক রয়েছে যেমনÑ শার্ট, টি-শার্ট, টপস, ফতুয়া, জিন্স এসব পোশাক বেছে নিতে পারেন। অনেকেই এই পোশাকে স্কুটি চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করেন।

পোশাকের কাটিং : এমন যানবাহনে আপনি বেছে নিতে পারেন লেন্থ কম এরকম  পোশাক। শর্ট কামিজ, শর্ট ফতুয়া, টি-শার্ট এমন পোশাক। পোশাকের হাতা হাফ-হাতা, হাতকাটা, ঘটিহাতা কিংবা থ্রি- কোয়ার্টার হলে ভালো হয়। এছাড়া গলার কাট চারকোনা, ভি-গলা বা গোল গলা পরতে পারেন। এতে সহজে বাতাস প্রবেশ করবে যা ঘাম শুকাতে সাহায্য করবে।
ঢিলেঢালা পোশাক :  আঁটসাঁট বা বডি ফিটিং পোশাক মোটেও আরামদায়ক নয় আর গরমে ঘামে পোশাক শরীরে লেগে থাকে। এতে আপনি অস্বস্তিবোধ করবেন। তাই স্কুটি কিংবা বাইক চালানোর সময় ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।
হালকা রং :  হালকা রং ও সুতির পোশাক বেছে নিতে পারেন। এই ধরনের পোশাকে তাপ শোষণ ক্ষমতা কম তাই হালকা রঙের পোশাক পরতে পারেন। যা প্রচ- রোদে বা দীর্ঘ জ্যামে তাপ শোষণ কম করবে এবং আপনি আরামবোধ করবেন।

স্কার্ফ : স্কুটি কিংবা বাইক আপনি যে বাহনই চালান না কেন অবশ্যই হেলমেট ব্যবহার করুন। তবে এর পাশাপাশি আপনার ত্বক ভালো রাখতে স্কার্ফ ব্যবহার করতে পারেন। অনেকটা সময় রোদে থাকার ফলে আপনার গলা, ঘাড়, হাত রোদে পুড়ে যায়। তাই সূর্যের ক্ষতিকর এই তাপ থেকে রক্ষা পেতে হেলমেটের পাশাপাশি স্কার্ফ ব্যবহার করুন। আর অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
স্কুটি চালকের অনুষঙ্গ

জুতা : পোশাকের পাশাপাশি স্কুটি চালকের জুতা কেমন হবে তা জেনে রাখা উচিত। বাইক কিংবা স্কুটিতে নারীদের জন্য সব থেকে আরামদায়ক জুতা হলো ‘শু’। বাইক চালানোর ক্ষেত্রে বেশ আরামদায়ক। তবে প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য কেডসও বেছে নিতে পারেন। এতে রোদ, বৃষ্টি, ধুলাবালি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য জুতার তুলনায় কেডস অনেক টেকসই। তবে এক্ষেত্রে ভালো মানের উন্নত ব্র্যান্ডের কেডস বেছে নিতে হবে। ক্যাডস কিংবা শু ছাড়াও বাইক চালানোর সময় ফ্লিপফ্লপ স্যান্ডেল, ফ্ল্যাট স্যান্ডেল, স্নিকার, লোফার পরা সবচেয়ে আরামদায়ক। হাইহিল বা পেনসিল হিল এড়িয়ে চলুন। আপনি চাইলেই সেমিহিল কিংবা বক্স হিলও পরতে পারেন। এছাড়া বাইক ও স্কুটিচালকদের জন্য কিছু বিশেষ বুট জুতা রয়েছে। দাম একটু বেশি হলেও এই জুতা বাইক চালানোর জন্য খুব উপযোগী।
ব্যাগ: শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবীসহ নানা পেশার নারীদের বাইরে বের হওয়ার সময় অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বহন করতে হয়। তাই ব্যাগ একটু বড় কিংবা মাঝারি মানের হলে ভালো হয়। বাইক চালানোর সময় সব থেকে উপযোগী ব্যাগ হলো ব্যাকপ্যাক। এটি সহজে পিঠে ঝুলিয়ে নেওয়া যায়। এখন বিভিন্ন সাইজের ও ডিজাইনের ফ্যাশনেবল ব্যাকপ্যাক পাওয়া যায়। কাপড়, রেক্সিন ও লেদারের ব্যাকপ্যাক প্রায় সব শপিংমলে পাওয়া যায়। অনেকগুলো চেম্বার থাকার কারণে অনেক জিনিস গুছিয়ে নেওয়া যায়।

চুল : স্কুটি বা বাইক চালানোর সময় চুল বেঁধে রাখাই নিরাপদ। এতে চুল ধুলাবালি ও ঘাম থেকে রক্ষা পাবে। চুল বড় হলে খোঁপা, পনিটেল কিংবা বেণী করে নিতে পারেন। চুল ছোট হলে হেডব্যান্ড কিংবা ববি ক্লিপ দিয়ে আটকে দিতে পারেন।
নিরাপদ যাত্রার সঙ্গী বাইক কিংবা স্কুটি চালানোর সময় কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখুন। যা আপনার যাতায়াতকে সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে। এগুলো হলোÑ

হেলমেট : হেলমেট ছাড়া কখনো স্কুটি বা বাইক চালাবেন না। এটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেফটি গিয়ার। বাজারে বিভিন্ন ধরনের হেলমেট পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফুল ফেস, সেমি ও ৩/৪ হেলমেট সব থেকে জনপ্রিয়। হেলমেটের দাম নির্ভর করে এর সাইজ, ব্র্যান্ড ও ফিচারের ওপর। সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে আপনি হেলমেট পেয়ে যাবেন। এছাড়া গ্লাস পাবেন ৪৮০ টাকা থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে।


জ্যাকেট : বাইক থেকে পড়ে গিয়ে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে সুরক্ষা দেবে জ্যাকেট। বাজারে বিভিন্ন দামের চামড়া ও সিনথেটিক কাপড়ের জ্যাকেট পাওয়া যায়। নিজের সুরক্ষার জন্য এবং হাই রোডে বাইক বা স্কুটি চালানোর সময় জ্যাকেট ব্যবহার করতে পারেন।
গ্লাভস :  বাইক চালানোর সময় প্রায় অনেকেরই হাত ঘেমে যায় এতে বাইক নিয়ন্ত্রণে ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই এসময় গ্লাভস ব্যবহার করুন। বাজারে কাপড়, চামড়া, ফোম ও সিনথেটিকের গ্লাভস পাওয়া যায়। তবে গ্লাভস যেন হাতের মাপের সঙ্গে মানানসই হয় সেদিকে লক্ষ রাখবেন।

চশমা : বাইরে যাওয়ার সময় সবারই রোদ চশমা ব্যবহার করা উচিত। বাইক বা স্কুটি চালানোর সময় অবশ্যই রোদ চশমা ব্যবহার করুন। ফুলফেস হেলমেট হলে ব্যবহার না করলেও চলবে। তবে সেমি হেলমেটের জন্য রোদ চশমা পরার কোনো বিকল্প নেই। বাইকারদের জন্য বাজারে কিছু রোদ চশমা পাওয়া যায় যা আপনাকে রোদের তাপ, ধুলাবালি ও বাতাসের ধাক্কা থেকে রক্ষা করবে।

সতর্ক থাকুন

পথে যাত্রার ক্ষেত্রে সব সময় মেনে চলুন কিছু সাবধানতা। আপনার একটু সাবধানতাই পারে আপনাকে সুন্দর ও নিরাপদ জীবন দিতে। জেনে নিন কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।
    চালক ও আরোহী দুজনই হেলমেট পরুন।
    সঠিক মাপের হেলমেট ও গ্লাভস ব্যবহার করুন।
    দুজনের বেশি আরোহণ করবেন না।
    হেডফোনে গান শোনা থেকে বিরত থাকুন।
    ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।
    মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে বাইক সাইড করে থামিয়ে কথা বলুন।
    গতি ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।
    ওড়না, স্কার্ফ বা শাড়ির আঁচল ভালোভাবে গুছিয়ে রাখুন।
    লেন পরিবর্তনের সময় সতর্ক থাকুন।
    ভেজা রাস্তায় ধীরে চালাবেন।
    ট্রাফিক আইন মেনে চলুন।
    যে বাইক বা স্কুটি ব্যবহার করবেন তা চালানোর আগে এর বিভিন্ন সিস্টেম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন।

কোথায় শিখবেন

স্কুটি বা বাইক চালানোর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জায়গা ও দক্ষ প্রশিক্ষকের। ঢাকার বেশ কিছু জায়গায় স্কুটি ও বাইক চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেমন মোহাম্মদপুর রিংরোডে উত্তরা ড্রাইভিং ও মোহাম্মদীয়া ড্রাইভিং নির্দিষ্ট ফি নিয়ে স্কুটি ও বাইক চালানো শেখায়। এছাড়া পুরান ঢাকায় নারী বাইকারদের একটি সংগঠন রয়েছে যা বাংলাদেশ উইমেন রাইডারস ক্লাব নামে পরিচিত। এখানেও বাইক ও স্কুটি চালানো শেখানো হয়। এছাড়া কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা নিজ উদ্যোগে ক্রেতাদের বিনামূল্যে স্কুটি চালানো শেখায়।

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত