বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের লড়াই। ভুলের কোনো সুযোগ নেই। একটি বেচাল মানে পুরো দলের ভরাডুবি। এমন ম্যাচে দল অতল সমুদ্রে পড়লে যোগ্য কা-ারিকেই তো চাই। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৪ রানে ৪ উইকেট হারালে ভারত ওই অবস্থায় পড়ে। সে সময় বন্দরে নোঙর করার যোগ্য একজনই ছিলেন, মহেন্দ্র সিং ধোনি। ঋষভ পান্ত, হার্দিক পান্ডিয়া এই সেদিনের ক্রিকেটার। কিন্তু ধোনি ২০০৭ থেকে ভারতকে অনেকবার এমন দিকহারা অবস্থা থেকে পথ দেখিয়েছেন। তাই তাকে বলা হয় ‘দ্য ফিনিশার’। এমন ব্যাটসম্যানকে খেলানো হলো পান্ত ও হার্দিকের পরে, সাত নম্বরে। এ নিয়ে সমালোচনায় ফেটে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটাঙ্গন। তবে এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা লোকও আছেন।
আরেকটু ওপরে নামলে ধোনি আরও সময় পেতেন উইকেটে সেট হতে। তখন আরও বল খেলে জয় ভারতের কব্জায় টেনে আনার সুযোগ পেতেন ধোনি। ১০ ওভারের মধ্যে ৪ উইকেট পড়ার পরও কেন তাকে পাঁচে নামানো হলো না? ম্যাচ শেষে অবধারিতভাবে প্রশ্নটি ছুটে গেল কোহলির দিকে। ভারত অধিনায়ক যেন জানতেন এ নিয়ে কথা উঠবে, প্রশ্নও আসবে। তাই সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে দিলেন, ‘বাইরে থেকে অনেক কিছুই বলা যায়। ভেতরে কী হচ্ছে তারাই জানে যারা ভেতরে থাকে। মাহিকে সাতে নামানোর সিদ্ধান্ত টিম ম্যানেজমেন্টের ছিল। দলের ভালো জন্যই। ওর রোলটাই দেওয়া ছিল নিচে নেমে ইনিংসটা শেষের দিকে নিয়ে যেতে।’
ক্যারিয়ারজুড়ে অনেকবার এমন পরিস্থিতিতে সফল হয়েছেন ধোনি। তার দায়িত্ব নিয়ে কখনই প্রশ্ন ওঠে না তাই। এবার মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হলেন বলেই কোহলির দিকে প্রশ্ন ছুটে এলো। তবে মিথ্যে বলেননি কোহলি, এই আসরের দিকে তাকালে শুরু থেকেই পান্ডিয়ার পরে নেমেছেন ধোনি। সর্বশেষ দুই ম্যাচে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পান্ত দলে ঢোকায় খেলেছেন সাতে। একমাত্র আফগানিস্তানের সঙ্গে পাঁচে নেমেছিলেন সাবেক ভারত অধিনায়ক। কিন্তু ওই ম্যাচেই চরম ব্যর্থ, তাই ধোনির ব্যাটিংয়ের সমালোচনাও হয়। সেমিফাইনালেও একই স্ট্র্যাটেজি মেনে এগিয়ে ছিল ভারত। কিন্তু এবার পুরো দলই ব্যর্থ।
তাই সমালোচনায় ভেসে যেতে হচ্ছে কোহলিদের। সমালোচনার শুরুটা একদম সাবেকদের থেকেই। এই আসরে ধারাভাষ্য দিতে আসা শচীন-সৌরভরা এমন বিপদের দিনে ধোনিকে পরে নামানোর পরিকল্পনা মেনে নিতে পারেননি। ম্যাচ চলাকালে ধারাভাষ্য কক্ষে ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। ধোনির ওপরে কার্তিক, পান্ত, হার্দিক দেখে বলে ওঠেন, ‘ধোনিকে এখনো বসিয়ে রাখার
মাথামু-ু কিছুই বুঝতে পারছি না। কার্তিকের আগে ধোনির আসা উচিত ছিল। এই সময়ে ওর মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের উইকেটে থাকা খুব জরুরি ছিল। সে থাকলে হয়তো ঋষভ উড়িয়ে খেলার সাহস পেত না। কারণ ধোনিই অন্যপ্রান্তে থেকে বলত, এখনো সময় হয়নি।’
এছাড়া কোচ রবি শাস্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেছেন সাবেক ভারত অধিনায়ক। রোষের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোচ কী করছিল বা ভাবছিল আমি জানি না। কিন্তু সে কি বোঝেনি যে ধোনি ওপরে এলে আরও চার ব্যাটসম্যান কার্তিক, পান্ত, পান্ডিয়া ও জাদেজাকে পাচ্ছে। তখন ইনিংস টেনে নেওয়া আরও সহজ হতো তার জন্য।’ একই সঙ্গে ভারতের হারের কারণও তুলে ধরলেন সৌরভ। তার চোখে নিজেদের ইনিংসের শুরুতেই হেরে গেছে ভারত, ‘ভারত শুরুতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে। তিন ওভারে তিন উইকেট চলে গেলে এমনই তো হবে। তবে প্রশংসা করব ধোনি-জাদেজার। ওই চাপের মধ্যেই ওরা কিন্তু দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছে।’
সৌরভের মতো ধারাভাষ্য দেওয়া শচীন টেন্ডুলকারও মনে করেন, ধোনি পাঁচে ব্যাট করলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতো। ‘ধোনি যেভাবে শেষদিকে জাদেজাকে নিয়ে সেট হয়েছিল সেটা অবিশ্বাস্য। আরও একটু সময় পেলে হয়তো সে ম্যাচটা বের করে আনত। তাই ধোনির পাঁচে নামা উচিত ছিল। তাহলে ফলও অন্যরকম হতে পারত।’
এদিকে সমালোচকদের বিপরীতে দাঁড়ানো লোকও আছে। জ্যাক ক্যালিস ও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট জানিয়েছেন, অনেক সময় অনেক সিদ্ধান্ত বিপরীত দিকে যায়। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান অলরাউন্ডার ক্যালিস জানান, ‘শাস্ত্রী ও বিরাটের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। ঝুঁকি এড়ানোর সব সিদ্ধান্তই সবসময় সঠিক হয় না। তাই সমর্থক ও ধারাভাষ্যকার সমালোচনা করার সময় খেয়াল রাখা উচিত, সিদ্ধান্তটা কিন্তু দলের ভালো জন্যই নেওয়া হয়েছিল।’ সাবেক অজি তারকা গিলক্রিস্ট বলছেন, ‘সমর্থক ও বাকি, যারা কোহলিদের সমালোচনা করছেন দয়া করে থামুন। সেমিফাইনাল হেরে অবশ্যই তাদের মন ভেঙে আছে। ওদের সমবেদনা জানান। আর নিউজিল্যান্ড সেরা ক্রিকেট খেলেই জিতেছে। তাদেরও প্রশংসা করা উচিত।’
এদিকে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট ইয়ান চ্যাপেল নিউজিল্যান্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নিজের একটি কলামে চ্যাপেল লেখেন, ‘নিউজিল্যান্ডকে সবসময় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট বলা হতো। কিন্তু টানা দুবার ফাইনালে উঠে সে কালিমা দূর করেছে তারা। পেস বোলিংয়ের অসাধারণ এক পসরা দিয়ে তারা ভারতকে উড়িয়ে দিয়েছে। ভারত ফেভারিট হিসেবেই নেমেছিল কিন্তু এদিনটি ছিল উইলিয়ামসনদের।’
ধোনির আউট বিতর্ক
৩০ গজ দূর থেকে মার্টিন গাপটিলের অনবদ্য থ্রো। বিদ্যুৎগতিতে বল এসে আছড়ে পড়লে উইকেটের ওপর। ধোনিও দৌড়াচ্ছিলেন প্রাণপণে। কিন্তু বলের গতির সঙ্গে পেরে উঠলেন না। মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের জন্য রান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হলো তাকে। সেই সঙ্গে শেষ হলো ভারতের বিশ্বজয়ের স্বপ্নও। কিন্তু এই চিত্রনাট্যটা কি বদলাতে পারত? ধোনি যে বলটিতে আউট হলেন সেই বলটি কি নো বল ছিল? নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের বিরাট বড় ভুলটিও কি চোখ এড়িয়ে গেল আম্পায়ারদের? এমনটাই অন্তত নেটিজেনদের দাবি। ১০ বলে তখন ২৫ রান বাকি। মহেন্দ্র সিং ধোনি ব্যাটিং করছেন। ঠিক এই পরিস্থিতিতে ধোনির রান আউট ম্যাচ থেকে ভারতকেও আউট করে দিল। তবে নেটিজেনদের দাবি, যে বলে ধোনি আউট হলেন সেই বলটি নো বল ছিল। সে সময় নিউজিল্যান্ডের ছয়জন ফিল্ডার ছিলেন ৩০ গজের সীমানার বাইরে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী ৪০ ওভারের পর ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে পাঁচজনের বেশি ফিল্ডার থাকতে পারেন না। পাঁচজনের বেশি থাকলে সেই বলটিকে নো বল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নেটিজেনদের দাবি, হিসাবমতো ধোনির আউটের বলটিও নো বল ছিল। যদিও আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী নো বলেও রান আউট হওয়া সম্ভব। কিন্তু নেটিজেনদের দাবি, ধীর-মস্তিষ্কের ধোনি ওই বলটি নো বল জানলে রানই নিতেন না। কারণ পরের বলটি ফ্রি-হিট। আর ফ্রি-হিট বলটিতে নিজেই স্ট্রাইক রাখতে চাইতেন মাহি। তাই হয়তো বা তিনি রান নিতেন না। এই নিয়ে আপাতত সরগরম নেটদুনিয়া। যদিও এ ধরনের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করলে অনেক কিছুই হয়। বা হতে পারে। এসব বদলে তো আর ফলাফল বদলাবে না। কঠিন বাস্তব এটাই যে, ভারত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে।
