অবজ্ঞার প্রতিবাদে এসএ গেমসেই অংশ নিতে চান না শীলা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৯, ১০:১৬ পিএম

ফেডারেশনের উপেক্ষা, অবহেলা আর বঞ্চনার গল্পগুলো অনেকবারই বলেছেন দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) জোড়া স্বর্ণ জয়ী সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শীলা। এই বঞ্চনার আগুনে পুড়েই ২০১৬ গৌহাটি-শিলংয়ে অনুষ্ঠিত আসরে গড়েছিলেন ইতিহাস। দেশের প্রথম নারী সাঁতারু হিসেবে স্বর্ণজয়ের নজির গড়েন যশোরের এই স্বর্ণ কন্যা। কিন্তু সেই সাফল্যের পরও ভাগ্য বদলায়নি শীলার।

অবজ্ঞার কথাগুলো বলতে বলতে ক্লান্ত শীলা তাই নীরবেই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি ১-১০ ডিসেম্বরে নেপালে হতে যাওয়া এসএ গেমসের ১৩তম আসরে অংশই নিতে চান না দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল এই নারী সাঁতারু।

‘দেখুন, আমি তো খেলাধুলা করতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনারা তো দেখতে পরেছেন ফেডারেশনের কর্মকাণ্ড। এত ভালো রেজাল্ট করার পরও বাইরে কোনো ট্যুর দিচ্ছে না। তারা নিজেরাই বলেছে, আমার কাছ থেকে কিছু আর আশা করেন না। যেহেতু আমাকে নিয়ে তারা আশাকরে না, তাই আমার দ্বিতীয় অপশন তো বাছতেই হবে।’- বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এভাবেই বলছিলেন শীলা।

দক্ষিণ এশিয়ান গেমস (এসএ গেমস) সামনে রেখে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতে চলছে এখন জোর প্রস্তুতি। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) তত্ত্বাবধানে ১৫ জুলাই থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে বিভিন্ন ফেডারেশন। ২০১৬ সালে গৌহাটি-শিলংয়ে অনুষ্ঠিত আসরে ৪টি সোনা জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে বিওএ।

গেলবার চারটি সোনার দুটিই আসে শীলার হাত ধরে। ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে স্বর্ণ জয়ের পর ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকেও স্বর্ণ জেতেন গেমসের রেকর্ড টাইমিং করে। অন্য দুটি স্বর্ণ আসে ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও শ্যুটার শাকিল আহমেদের হাত ধরে। মাবিয়া ও শাকিল দুজনই নিজেদের তৈরি করছেন আরেকটি আসরের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাঁতারু শীলা দলের সঙ্গে থাকলেও আসলে গেমস নিয়ে তেমন ভাবতে চাইছেন না।

নিজের সংস্থা থেকে ফেডারেশনে তার নাম পাঠানো হয়েছে এসএ গেমসের ক্যাম্পের জন্য। সংস্থার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ শীলা তাদের সেই সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু দলের সঙ্গে থাকলেও তিনি এখন আছেন কিছু ডাক্তারি রিপোর্টের অপেক্ষায়, ‘কর্তৃপক্ষ সব ভালো বোঝেন। তারা আমাকে ক্যাম্পে পাঠিয়েছেন। আমি নিজে আসলে একটু শারীরিকভাবে অসুস্থ। ডাক্তার বলেছে আপনাকে হার্ড ওয়ার্ক করা যাবে না। বিশ্রামে থাকতে হবে। আমার ডকুমেন্টও মোটামুটি কমপ্লিট। দেখি রবিবার আমি তা সাবমিট করব। এরপরও যদি ফেডারেশন মনে করে আমাকে রাখবে, সেটা ফেডারেশনের ব্যাপার।’

শীলা যখন এই কথাগুলো বলছিলেন কণ্ঠে অভিমানটা পুরো আঁচ করা যাচ্ছিল। সাঁতার থেকে সরে গিয়ে তিনি আসলে মন দিতে চাইছেন সংসারে। ২০১৬ সালে আরেক স্বর্ণ জয়ী সাঁতারু শাহজান আলী রনির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন শীলা। খেলা ছেড়ে তিনি এখন ভাবছেন সন্তান নেওয়ার কথা।

অভিমান নিয়েই ৩০ বছর বয়সী সাঁতারু বললেন সেটি, ‘আমার যে ইভেন্ট, আমি যদি এখনো চেষ্টা করি ভালো কিছু করা সম্ভব। কিন্তু ফেডারেশন যেহেতু কিছু ভাবছে না, তাই আমাকে দ্বিতীয় অপশন বাছতেই হবে। আমি তাই পরিবার নিয়ে ভাবছি। ফেডারেশন আমাকে নিয়ে না ভাবলে আমি নিজেকে নিয়ে ভাবলে তো হবে না।’

এসএ গেমসে জোড়া স্বর্ণ জয়ের পরও গেল সাড়ে তিন বছরে মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন শীলা। ২০১৭ সালে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে অংশ নেন, যেখানে নিজ ইভেন্টে সেরা টাইমিং করেন। হাঙ্গেরিতে অন্য এক আসরে অবশ্য ভালো টাইমিং হয়নি তার। তবে কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে উপেক্ষিত ছিলেন তিনি।

শীলা বলছেন, ‘এটা আজকের ব্যাপার না। একেকজনকে দুই-তিনটা করে ট্যুর দেওয়া হচ্ছে। তারা আমার থেকে কী এমন আহামরি ভালো পারফরম্যান্স করেছে? এখন শুধু এসএ গেমসে শীলাকে খুঁজবে, বাকি গেমসগুলোতে খুঁজবে না…। এখন তো আমাকে না পাঠালেই নয়, তাই পাঠাবে। এই নোংরা রাজনীতি আমার আর ভালো লাগে না।’

এখানেই থামেন না শীলা। সরাসরি বলে দেন, ‘বাকুতে আমি ভালো টাইমিং করিনি? গত ন্যাশনালেও পাঁচটা গোল্ড পেয়েছি। ফেডারেশন যেহেতু আমাকে প্রয়োজন মনে করছে না, আমি গোল্ড পেয়েছি, আমাকে না ডাকলে তো নয়, তাই এখন ডেকেছে। কিন্তু আমি তো শুধু সাফ গেমসের জন্য নই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত