ডেঙ্গু জ্বরে মারা যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র ফিরোজ কবীর স্বাধীনের মরদেহ ক্যাম্পাসে আনতে না দেওয়ায় তার বন্ধু-সহপাঠীরাসহ ঢাবি শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এদিকে ঢাবি ছাত্রের জানাজা ক্যাম্পাসে না হওয়ার প্রতিবাদে রোববার মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার রাত দেড়টায় ক্যাম্পাসে স্বাধীনের জানাজা করতে বন্ধু-বান্ধবদের দাবি সত্ত্বেও প্রশাসন, ডাকসু ও হল সংসদের আপত্তির কারণে লাশ ক্যাম্পাসে আনা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার মরদেহ ক্যাম্পাসে আনা হলে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়াতে পারে ওই আশঙ্কা থেকেই ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাতেই ওই ছাত্রের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ডাকসু ও হল সংসদের দাবি পরিবারের সিদ্ধান্তেই ওই ছাত্রের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি খুবই দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। ক্যাম্পাসে জানাজা হওয়ার বিষয়ে আমার জানা নেই। হলের প্রভোস্ট, হাউজ টিউটর ও ডাকসু প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়েছিলেন। যেহেতু পরিবারের লোকজন সাথেই ছিল, তারাই তার লাশ গ্রহণ করেছে। পরিবারই তাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে হল প্রভোস্টের দাবি, দ্রুততম সময়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যাম্পাসে ওই ছাত্রের মরদেহ আনা হয়নি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে রাতে জানাজা হওয়ার কথা, এমন বিষয় আমার জানা নেই।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, একজন শিক্ষার্থী মারা গেলে এমনিতে আমাদের সবার মনোবেদনা হয়। একটু লেট হয়ে যাওয়াতেই তাকে দ্রুত বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার ট্রিটমেন্টও পরিবারের পক্ষ থেকে হয়েছিল, পরিবারই নিজেদের দায়িত্বে দ্রুততম সময়ে লাশ নিয়ে গেছে। আমি কিন্তু জানি না ক্যাম্পাসে জানাজা হওয়ার কথা ছিল কিনা।
এদিকে মৃত্যুর পর ফিরোজের লাশ শেষবারের মতো ক্যাম্পাসে না আনায় ফিরোজের বন্ধুদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বাধায় লাশ ক্যাম্পাসে আনতে দেওয়া হয়নি। তার লাশ নিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ অস্থিতিশীল হতে পারে, সেই ভয় থেকেই ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী, বঙ্গবন্ধু হল সংসদের ভিপি, জিএস এবং হল প্রভোস্ট লাশ আনতে বাধা দেন।
এ বিষয়ে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীকে একাধিক বার ফোন দিয়েও তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।
তবে এ বিষয়ে ডাকসুর ভিপি ও সাধারণ ছাত্র অধিকার অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরু নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কি অদ্ভুত রাজনীতি! বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মারা গেল, তার বন্ধু ও সহপাঠীরা জানাজা পড়ার জন্য ক্যাম্পাসে লাশটি আনতে চেয়েছিল কিন্তু প্রশাসনের অনাগ্রহ আর তথাকথিত অতিরাজনীতিবিদ ছাত্রনেতাদের কারণে লাশটি ক্যাম্পাসে আনা হলো না!’
এদিকে মৃত্যুর পর জানাজা নিজের ক্যাম্পাসে না হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ধিক্কার জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে।
মো. গিয়াসউদ্দিন নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ফিরোজ ভাইয়ের জানাজা ক্যাম্পাসে হলে নাকি ঢাবি প্রশাসনের বদনাম হবে। তাই জানাজা করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিটা হলে হলে মশা, মাছি, ছারপোকা, তেলাপোকা ইত্যাদির সাথে বসবাস করতে হয় ঢাবির স্টুডেন্টদের। এতে প্রশাসনের কোন মাথা ব্যথা নেই। কেননা তারা তো এসিতে ঘুমান। স্টুডেন্ট মরলে বা বাঁচলে তাদের কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর জন্য রয়েছে একটি মেডিকেল সেন্টার। কিন্তু সেখানে প্যারাসিটামল ছাড়া ভালো ওষুধ নেই। এমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমরাতো চাইনি’।
ডাকসু নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরেক ছাত্র লিখেন, বেশির ভাগ গণরুম গুলোতে মশারি টাঙানোর ব্যবস্থা নেই, সম্ভবও না। এই মহামারিতে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণার আহ্বান করছি। একটু অসতর্কতা সারা জীবনের কান্না হতে পারে।
অন্যদিকে মশা নিধনে প্রশাসনের অবহেলা এবং ফিরোজ কবীর স্বাধীনের জানাজা ক্যাম্পাসে হতে না দেয়ার প্রতিবাদে রোববার বিকেল সাড়ে ৪ টায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
উল্লেখ্য ফিরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-২০১৪ সেশনের ব্যবসায় অনুষদের ফিন্যান্স বিভাগের ছাত্র ছিলেন। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
