'আমাদের দেশে ডাক্তাররা যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান পান না'

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৯, ০৫:৫১ পিএম

বাংলাদেশের কূটনীতিক শাহানা গাজি জানিয়েছেন তার সন্তানের ডেঙ্গুমুক্ত হওয়ার খবর। বৃহস্পতিবার ফেসবুকে তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা জানান।

শাহানা গাজি উল্লেখ করেন বাংলাদেশের চিকিৎসকদের বিরামহীন সেবা দানের বিষয়টিও। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন, আমাদের দেশের চিকিৎসক, নার্স হাসপাতালকর্মীরা যে সেবা দেন তা বিশ্বের অনেকে দেশেই পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান পান না বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন এ কূটনীতিক।

বর্তমানে তিনি ব্যাংককে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।

তার স্ট্যাটসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

আজ আট দিন হলো আমার মেয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহর অসীম দয়ায় গত রাত থেকে তার প্লেটিলেট একটু একটু করে বাড়া শুরু করেছে, এবং শংকামুক্ত বলে মনে হচ্ছে। অবস্থার আরেকটু উন্নতি হলে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব ইনশাআল্লাহ।

এই আটটি দিন আমাদের উপর দিয়ে কি গেছে বলে বোঝানো যাবে না। জ্বরের তৃতীয় দিন থেকে তার ব্লাড প্রেশার আশংকাজনকভাবে কমে যায়, দুপুরে তার ব্লাডপ্রেশার ৫০/৩০-এ নেমে যায়, রানিং আইভি স্যালাইন দিয়েও ঠিক হচ্ছিল না। ঐদিন রাতে সে একবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম এই শেষ। আল্লাহর অশেষ রহমতে জ্ঞান ফিরে আসলেও অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। এই কষ্ট চোখে দেখা যায় না।

আল্লাহর কাছে সে কতবার মাফ চেয়েছে, আত্মীয়স্বজনদের কাছে একজন একজন করে মাফ চেয়েছে, আরো কত কথা যে বলেছে। কোন মা বাবাকে যেন কখনো সম্তানের এতো কষ্ট দেখতে না হয়, সন্তানের জীবন নিয়ে আশা নিরাশার দোলাচলে এমন কঠিন মুহূর্ত যেন পার করতে না হয়।

ভাবছি আমার সন্তান তো ভাল চিকিৎসা পেল। দেশে কোথায় কে কি অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে কে জানে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবাইকে সুস্থ রাখুক, রোগাক্রান্তরা যেন সময় মতো চিকিৎসা পায়। যদি আপনার অধঃস্তন কোন ব্যক্তি বা তার পরিবারের কেউ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয় বা এই রোগ হয়েছে বলে মনে হয়, তবে তাকে ছুটি দিন যাতে সে হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করতে যেতে পারে ও নিজে বা পরিবারের কেউ রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করতে পারে। চাকরির চেয়ে জীবন বড় এটা মনে রাখতে হবে। আমি নিজে কয়েক ঘন্টার নোটিশে বিদেশ থেকে দেশে চলে আসতে পেরেছি, আপনারাও রোগকে অবহেলা না করে সময়মত চিকিৎসা করান।

আমি ডাক্তার নই, তবে একজন অভিভাবক হিসাবে যা দেখলাম, এখনকার ডেঙ্গুতে খুব বেশি জ্বর ওঠে না। প্রথম দিকে মনে হয় এমনি সাধারণ জ্বর। এরপর হঠাৎ ব্লাড প্রেশার কমে যায়, যাকে বলা হয় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। এই সময়টা ভয়ংকর, মুহূর্তের মধ্যে চরম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এ সময়ে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টই আসল। শরীরের ওজন ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্যালাইন দিতে হয়। মনিটর করতে হয়। বার বার ব্লাড প্রেশার মাপতে হয়। এটা কেবল ডাক্তাররাই পারবেন। টোটকা ওষুধ বা এই পাতা সেই পাতার রস খেয়ে তা সম্ভব না। আবার জ্বর হলে রক্তের প্লেটেলেট কমে যেতে থাকে, শেষের দিকে অতি দ্রুত কমতে থাকে, এজন্য ঘন ঘন রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। বেশি কমে গেলে শরীরে প্লেটেলেট দিতে হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন থেকে প্লাজমা থেকে ফ্লুইড বেড়িয়ে শরীরে দ্রুত পানি জমতে থাকে, ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট ও অর্গান ফেলিউর হতে পারে।কাজেই ডেঙ্গু মোটেই হেলাফেলা করবার রোগ নয়।

শেষ কথা হল, আমাদের দেশে ডাক্তাররা মোটেই তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সন্মান পান না। আমার সন্তান যে ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠছে, সেজন্য আল্লাহর পরেই আমি ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের কর্মীদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। তাঁদের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না। পৃথিবীর অনেক দেশে টাকা দিয়েও এমন সেবা পাওয়া যায় না। দু-একটা অবহেলার ঘটনা হয়তো ঘটেছে, তবে সেজন্য দেশের সব হাসপাতাল বা ডাক্তারদের দায়ী করবেন না। দেশে এখন একটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস চলছে। প্রতিটা হাসপাতাল রোগীতে সয়লাব। আমার একজন ভাই, যিনি ডাক্তার, রাত দুটো পর্যন্ত রোগী দেখছেন। তিনি বললেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল (যেখানে তিনি কাজ করেন) ও অন্য হাসপাতালগুলোতে তিলধারণের ঠাঁই নেই। এরই মধ্যে ডাক্তার, নার্স, আয়া ও হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে রোগীদের বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এর আগে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যখন আগুন লেগেছিল তখন নিজেদের জীবন বাজি রেখে তারা রোগীদের রক্ষা করেছিলেন। এইসব ঘটনা ফলাও করে মিডিয়ায় আসেনি। এত নিবেদিতপ্রাণ ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালকর্মী, যারা যেকোন দুর্যোগে এতো রোগীকে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিকিৎসাসেবা দেয়, পৃথিবীর আর কয়টি দেশে আছে জানি না। ২০১১ সালে একবার আমেরিকার একটি টপ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে আমার মেয়েকে সাত ঘন্টা বসে থাকতে হয়েছিল, তারপর ডাক্তার দেখেছে। ২০০৫ সালে স্টকহোমের পৃথিবীখ্যাত একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চার ঘন্টা ব্যাথায় কাতরাতে হয়েছে, ডাক্তার তো দূরের কথা একজন নার্সও আসেনি।

সবাই ভাল থাকুন। আমার মেয়েটাসহ দেশের সব ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর আরোগ্যের জন্য দোয়া করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত