বিরোধী দলের প্রবল আপত্তির মুখে অধিকৃত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে ভারতের বিজেপি সরকার। সোমবার রাজ্যসভায় এই সংক্রান্ত নতুন বিল প্রস্তাব করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
কাশ্মীর পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ স্বাক্ষর করেছেন।
এনডিটিভি জানায়, বেলা ১১টার কিছু পরে রাজ্যসভা অধিবেশনে অমিত শাহ কাশ্মীর নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানান। জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়া সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিলের প্রস্তাব করেন তিনি।
এ ঘোষণার পরই উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্যসভা। অমিত শাহের বিবৃতির প্রবল বিরোধিতা করেন কংগ্রেস নেতা গোলাম নবী আজাদ-সহ সমস্ত বিরোধী দলের নেতারা। আজাদ বলেন, “গণতন্ত্রকে আজ খুন করল বিজেপি।”
সেই সময় তাকে থামিয়ে দিয়ে অমিত শাহ বলেন, “১৯৫২ ও ১৯৬২ সালে কংগ্রেস একই পদ্ধতিতে ৩৭০ ধারার সংশোধন করেছিল। অতএব বিরোধিতা না করে আমাকে বলতে দিন। আপনাদের সব সন্দেহ এবং ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি পড়ে শোনান অমিত শাহ। তিনি জানান, কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্যই নতুন এ সংরক্ষণ বিল আনা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সংসদের মেঝেতেই অবস্থান নিয়ে বসে পড়েন কংগ্রেস, পিডিপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং ডিএমকে-র সাংসদরা।
আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, নিজের জামা ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান রাজ্যসভায় পিডিপি সাংসদ ফৈয়াজ আহমেদ মীর। সংবিধানের কপি ছিঁড়ে ফেলার জন্য পিডিপি সাংসদ ফৈয়াজ ও নাজির আহমেদকে সংসদ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান বেঙ্কাইয়া নায়ডু।
সংসদীয় বিষয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী বিরোধীদের তিরস্কার করে বলেন, “অমিত শাহ জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক ভুলকে সংশোধন করছেন।”
বিজেপি সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, পিডিপি, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি, জেডি (ইউ)। তবে এই প্রস্তাবের সমর্থন করেছে বহুজন সমাজ পার্টি, বিজু জনতা দল, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তেলঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, এআইএডিএমকে, আম আদমি পার্টি।
ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের জনগণ ভারতের ওপরে যে আস্থা রেখেছিল, তার সঙ্গে পুরোপুরি বিশ্বঘাতকতা করা হয়েছে ভারত সরকারের আজকের এই একতরফা এবং মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। এমন সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, গতকালকে সর্বদলীয় বৈঠকের মাধ্যমে এমনটাই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।”
আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মেহবুবা মুফতি বলেন, “আজকের দিনে ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে কালো অধ্যায় রচিত হলো। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের এই সিদ্ধান্ত একতরফা, অবৈধ ও অসাংবিধানিক। এর মধ্য দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে ভারত দখলদার শক্তি হিসেবে পরিণত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষকে সহিংস করে তুলে এই অঞ্চলের পূর্ণ অধিকার চায় তারা। কাশ্মীরকে দেওয়া ভারতের প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়েছে।”
৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোন ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতো। এই ধারাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ভিত্তিতেই কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭০ ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়।
মূলত সেখানকার জনসংখ্যার আনুপাতিক স্থিতি বজায় রাখতে বহিরাগত বসতিস্থাপন বন্ধে এসব সুরক্ষা দেওয়া হয়।
কেবল স্থায়ী বাসিন্দারাই ওই রাজ্যে সম্পত্তির মালিকানা, সরকারি চাকরি বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পান।
রাজ্যের বাসিন্দা কোনো নারী রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তার উত্তরাধিকারীদেরও সম্পত্তির ওপরে অধিকার থাকে না।
বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর এই অধিকার হারাবে কাশ্মীরের জনগণ। মূলত হিন্দু জনগণকে অঞ্চলটিতে বসবাসের সুযোগ করে দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কাশ্মীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
