২০১০ থেকে ২০১৬। ছয় বছরের ব্যবধানে এসএ গেমসে বাংলাদেশের অর্জন ১৮ স্বর্ণ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছিল চারে। ভারতের শিলং ও গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ আসরের দ্বিতীয় দিনে, অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেন ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। সেদিনই সুইমিং পুলে সবাইকে চমকে দিয়ে স্বর্ণপদক জেতেন সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শীলা। পরের দিন আরেকটি স্বর্ণপদক আসে শীলার হাত ধরে। দেশকে সর্বশেষ স্বর্ণপদকটি এনে দেন শুটার শাকিল আহমেদ খান। অথচ বিস্ময়কর হচ্ছে এই তিনজনের কাছ থেকে শুরুতে স্বর্ণপদকের আশা কেউই করেনি।
তিন বছর পর আবার বেজে উঠেছে এসএ গেমসের দামামা। ১ থেকে ১০ ডিসেম্বর নেপালের কাঠমান্ডু-পোখারায় হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এই আসরকে সামনে রেখে ১৫ জুলাই থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা। সেবার আলোচনায় না থেকেও সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন ওই তিন স্বর্ণজয়ী। এবার কিন্তু শুরু থেকেই আলোচনায় তারা। গতবারের মতো এবারও দেশকে সোনায় মোড়ানো সাফল্য এনে দিতে পারবেন তো?
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে খানিকটা হতাশ হতে হলো। শীলার আসছে আসরে খেলাটাই অনিশ্চিত। অথচ গেলবার তিনিই ছিলেন দেশের সবচেয়ে সফল ক্রীড়াবিদ। আসলে ২০১৬ গেমস-পরবর্তী সময়ে সাঁতারে পুরোপুরি মনোনিবেশ করারই সুযোগ ছিল না শীলার জন্য। একে তো ফেডারেশনের কর্মকা-ের স্থবিরতা; তার ওপর মায়ের অসুস্থতা, নিজের সংসার, পড়ালেখা, চাকরি। সব মিলিয়ে শীলা নিজের কক্ষপথ থেকে ছিটকেই গেছেন বলা যায়। তারপরও ক্যাম্পে আছেন তিনি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত থাকবেন কীনা সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বাহিনীর চাকরির বাধ্যবাধকতায় মন খুলে কথাও বলছেন না শীলা। তবে তার স্বামী, সাবেক সাঁতারু শাহজাহান আলী রনি অনিশ্চয়তার কথাটা খোলাসা করেছেন, ‘সাঁতার ও পরিবার দুটিই শীলার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসএ গেমসে খেলার সিদ্ধান্তটা আমি চাই ও নিজেই নিক। আসলে আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছি। এ নিয়ে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যেও আছি। এ অবস্থায় ক্যাম্পের লোডটা ও নিতে পারবে কীনা এটা ওর সিদ্ধান্ত। তবে আমি ওকে যতটা জানি ও ভালো কিছু করার ব্যাপারে খুব জেদী। আমি মনে করি, আসছে এসএ গেমসে সাঁতারে ভালো কিছু অর্জনের ক্ষমতা যাদের আছে, ও তাদের একজন।’
এ তো গেল শীলার কথা। সীমান্ত কী ভাবছেন সামনের আসর নিয়ে? তিন বছর আগে মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কান প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে স্ন্যাচ এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্ক মিলিয়ে ১৪৯ কেজি তুলেই স্বর্ণপদক জিতেছিলেন সীমান্ত। দেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ জিতে জাতীয় সংগীতের সময় তার কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য আজও হাজারো বাঙালির চোখে ভাসে। সেই সীমান্ত যা বললেন, তাতে নিরাশ হতেই হয়Ñ ‘সত্যি বলতে, আমরা কেউই স্বর্ণপদক জয়ের স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি না।’ এসএ গেমসেও যদি লক্ষ্য স্বর্ণপদক না হয়, তাহলে বাংলাদেশের মানটা কোথায় পৌঁছেছেÑ এই প্রশ্নে সীমান্তের সোজা-সাপ্টা উত্তর, ‘দেখুন, স্বর্ণপদক ধরে রাখতে হলে যে পথে হাঁটা উচিত ছিল সেই পথে কী আমরা হাঁটতে পেরেছি গত তিন বছরে? আগের চেয়ে এখন আমি প্রায় ৩২-৩৩ কেজি বেশি ওজন তুলি। অথচ আমার ইভেন্টে এখন যা তুলছি তা স্বর্ণ তো দূরে থাকা রৌপ্য জেতার জন্যও যথেষ্ট নয়। এই ইভেন্টে ভারতের রাখী হালদার ২০০’র কাছাকাছি তোলে। এছাড়া শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মেয়েরাও অনেক এগিয়ে গেছে। পাকিস্তানের মেয়েরা গতবারের চেয়ে এবার ভালো করবে। সেদিক থেকে আমাদের সম্ভাবনা অনেক কম, কারণ আমরা সঠিক পরিচর্যা পাইনি। অনেক দেরি করে আমাদের ক্যাম্প শুরু হয়েছে। একজন ভারোত্তোলকের ফিটনেস সঠিক মানদ-ে নিয়ে আসতে কমপক্ষে ৬ মাস সময় প্রয়োজন হয়। এরপর সে হাই পারফরম্যান্স ট্রেনিং শুরু করতে পারে। কিন্তু আমাদের সেই সময়ই তো নেই। বছরব্যাপী ক্যাম্পের সুযোগ পেলে অন্তত সাহস করে কিছু বলতে পারতাম।’
শীলা-সীমান্তর কাছ থেকে নিরাশার কথা শোনা গেলেও গত বছর কমনওয়েলথ গেমসে রৌপ্যপদক জেতা পিস্তল শুটার শাকিল কিন্তু আশা ছাড়ছেন না। এসএ গেমস নয়, এই শুটার দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জনের। আগামী নভেম্বর কাতারের দোহায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি কোটা প্লেস অর্জনের চেষ্টাটা করবেন। গত বছর কমনওয়েলথ গেমসের পর থেকে কোরিয়ান কোচের অধীনে নিজেকে প্রস্তুত করা শাকিল বলেন, ‘এসএ গেমসে তো অবশ্যই ভালো কিছুর আশা নিয়েই খেলব। তার আগে দোহায় কোটা প্লেস পাওয়া আমার লক্ষ্য। সেটা পূরণ হলে দেখবেন এসএ গেমসেও স্বর্ণপদক জিতব। তবে গেলবার ৫০ মিটার ইভেন্টে স্বর্ণ জিতলেও এবার সেই ইভেন্টটি থাকছে না। তাই আমার জন্য একটাই অপশনÑ ১০ মিটার।’
২০১৬-তে স্বর্ণজয়ী সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী তাদের ডেকে নিয়ে তুলে দিয়েছিলেন ফ্ল্যাটের চাবি। ফ্ল্যাট না হওয়া পর্যন্ত তাদের মাসিক বাসাভাড়া দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সরকারের। উত্তরায় রাজউকের সেই ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে বহুদিন হলো। অথচ বরাদ্দটা এখনো বুঝে পাননি তারা। এমনকি ২০১৭ সালের এপ্রিলের পর থেকে সেই বাসাভাড়াও পাচ্ছেন না তারা। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করেও লাভ হচ্ছে না। তাই তো আক্ষেপ করেই সীমান্ত বললেন, ‘আরেকটি গেমস চলে এলো, অথচ ফ্ল্যাট আর বুঝে পেলাম না। ৬ মাসের মতো বাসাভাড়া পাওয়ার পর এখন সেটাও পাই না। তাই বাধ্য হয়ে গত বছর বড় বাসা ছেড়ে ছোট বাসা নিয়েছি।’
