স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর প্রথম নির্বাচিত ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। স্কুলে পড়ার সময়েই ছেষট্টির আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কারাবরণ করেন। কলেজে পা দিয়ে সক্রিয় ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে যান এবং গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ছিলেন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী সেলিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রত্ব শেষে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে প্রায় আট বছর কারারুদ্ধ ও আত্মগোপনে ছিলেন এই নেতা। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১২ সাল থেকে তিনি দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পঁচাত্তরের আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর রাজধানী ঢাকায় প্রথম প্রতিবাদী মিছিলের সংগঠক ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন ও একদলীয় শাসন প্রবর্তন নিয়ে তার সাম্প্রতিক মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এই প্রসঙ্গ নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি আপনার একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে এবং তা অনেক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। আপনি বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে ও সিপিবির উসকানিতে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন বলে যে ধারণা রয়েছে- তা ঠিক নয়। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এ রকম ধারণা অনেকেই প্রচার করে থাকে। বিশেষ করে যারা প্রগতিশীলতার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বিরোধিতা করে এবং সে সময়েও করতেন। তারা বাকশাল করার সব দায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্টদের ওপর চাপিয়ে দেন এবং বলেন যে, এই কারণেই বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হলো।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই সময়কার সিপিবির একেবারে শীর্ষ নেতারা কমরেড মণি সিং, কমরেড ফরহাদসহ অন্যরা বঙ্গবন্ধুকে ‘একদলীয় ব্যবস্থা’ তথা ‘বাকশাল’ গঠন না করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ‘সমাজতন্ত্র কায়েম করার জন্য একদলীয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ নয়। দলগুলোকে স্বাধীন থাকতে দিন। স্বাধীন দলগুলোকে একটা ঐকমত্যে নিয়ে আসেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা শোনেননি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সব দল নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করেন।
দেশ রূপান্তর : সে সময়ের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা এবং আপনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন মোশতাক (খন্দকার মোশতাক আহমেদ) সম্পর্কে সাবধানে থাকবা, মাথার ভেতরে খালি প্যাঁচ; একটা তারকাঁটা ঢোকালে দেখবা ওইটা একটা স্ক্রু হয়ে গেছে! আমি বললাম, আপনি তাহলে তাকে এত কাছে কাছে রাখেন ক্যান? বঙ্গবন্ধু বললেন, কাছে কাছে রাখি যাতে দুষ্টামি না করতে পারে। চোখে চোখে রাখতে হয়, এজন্যই বোগল তলায় রাইখা আমি চলার চেষ্টা করি। মোশতাক আমাকে কালকে কী বলেছে জানো বলেছে, মুজিব এত সমাজতন্ত্র কইরো না, মুক্তবাজার অর্থনীতি করো। আর বলল যে, এত ধর্মনিরপেক্ষতা কইরো না, একটু আল্লাহ আল্লাহ করো। আমি বলে দিসি ওর মুখের ওপরে মোশতাক, তোর কথা আমি শুনলাম না। আমার দেশের কৃষক-শ্রমিক অস্ত্র নিয়ে, জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে; আমি সমাজতন্ত্রের পথেই যাব, আমি ধর্মনিরপেক্ষতার পথেই যাব।
দেশ রূপান্তর : তারপর কী হলো? বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে কেন দায়ী করা হলো? কারা দায়ী করলেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই মোশতাক গং এবং অন্যরা বঙ্গবন্ধুকে এই অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকখানি আপস এবং কনসেশন (সম্মতি) আদায় করা সত্ত্বেও তারা এটা বুঝেছিল যে, তাকে (বঙ্গবন্ধুকে) না সরালে পরে এই দেশটাকে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য এবং কাঠামোর বাইরে নিয়ে আসা যাবে না। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করলেন, তখন তারা বললেন যে- এইটা তো বঙ্গবন্ধুর না, এইটা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির।
আমি এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, যারা এই কথা বলেন তারা আসলে বঙ্গবন্ধুকে অপমান করেন। তারা এই কথা বলে বোঝাতে চান যে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা ছিল না। তারা তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দালাল এবং কমিউনিস্ট পার্টির দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। কিন্তু আমরা জানি, স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা বিকশিত হয়েছিল। সেভাবেই তিনি নিজেকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাকশাল গঠনের মতো এত বড় একটা ভাইটাল ডিসিশনও তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি নিয়েছেন। সেটার ভালো-মন্দের বিচার করতে হলে, এটাকে তার সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করেই তা করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বাকশাল গঠনের পর তো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও বাকশালে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু আপনি সম্প্রতি দাবি করেছেন, তখন কমিউনিস্ট পার্টি বিলুপ্ত করা হয়নি, একটা কাঠামোর মধ্যে পার্টির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। বিষয়টা একটু বিশদভাবে বলুন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বঙ্গবন্ধু সংবিধান সংশোধন করে নতুন আইন করে, সব দল বিলুপ্ত করে দিলেন এবং একটিমাত্র একক জাতীয় রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা ‘বাকশাল’ গঠন করলেন। তখন আমাদের পার্টিও নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও তখন বাকশালে যোগ দেয়। কিন্তু বাকশালে যোগ দিলেও, আমাদের পার্টি অত্যন্ত গোপনে, একটা খুবই সংকুচিত কাঠামোয় পার্টির অস্তিত্ব বহাল ও সক্রিয় রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই সে কথা প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি অনেক পার্টি সদস্যকেও সে বিষয়টি তখন অবগত করে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত ছিল যে, আস্তে আস্তে পার্টির মেম্বারদের বিষয়টি জানানো হবে। আমি নিজেও ওই গোপন পার্টি কাঠামোতে ঢাকা জেলা কমিটির অধীনে ছিলাম। আমাদের ২২-২৩ জনের কমিটির মধ্যে আমরা ৮-৯ জন এটা জানতাম।
কিন্তু জনগণকে আমরা কী বলব? তখন আমরা একটা বিবৃতি দিলাম যে, এই এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পার্টি বিলুপ্ত করা হলো এবং পার্টির সব সদস্যকে বাকশালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলো। পরবর্তীকালে, আমাদের তৃতীয় কংগ্রেসে আমরা মূল্যায়ন করেছি যে, ওই বিবৃতি দেওয়াটা ঠিক হয়নি। এটা না দিলেও চলত, এটা কোনো অপরিহার্য বিষয় ছিল না।
দেশ রূপান্তর : পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশব্যাপী একটা অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রাজধানী ঢাকায় প্রথম প্রতিবাদ মিছিলসহ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নে আপনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময়টার কথা বলুন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সেই সময়টা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ওই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের দুটো দিক ছিল- একটি আমার নিজের রাজনৈতিক বিবেচনা, আরেকটি হলো ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমার দায়িত্ববোধ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের প্রথম ডাকসুতে আমি ভিপি নির্বাচিত হই। কিন্তু পরের বছর ১৯৭৩ সালে, জাসদকে ঠেকাতে গিয়ে ছাত্রলীগ ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে এবং ডাকসু নির্বাচন ভ-ুল হয়ে যায়। এরপর পঁচাত্তরের মধ্যে আর ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় কার্যত আমিই ডাকসু ভিপি ছিলাম। ফলে, নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের পাশাপাশি ডাকসুর ভিপি হিসেবেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো আমার দায়িত্ব বলে মনে করেছি।
সেই সময় আমি কিছু কঠিন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করি। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে, ঢাকার বাইরে কিছু কিছু জায়গায় কিন্তু ১৫ আগস্টেই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছিল। এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় খোলে অক্টোবরের আঠারো বা বিশ তারিখে। আমরা আর্টস বিল্ডিংয়ের করিডোরে ঝটিকা মিছিল করি। আর ৪ নভেম্বর আমরা মৌন মিছিল নিয়ে গিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি। এই কর্মসূচির জন্য আমরা লিফলেট বিতরণ করি এবং লিফলেট দিতে গিয়ে আমাদের কিছু কর্মী গ্রেপ্তারও হয়। বেশিরভাগই ছিল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী, তবে ছাত্রলীগেরও কিছু কিছু কর্মী ছিল।
দেশ রূপান্তর : ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট রচনায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ষাটের দশক থেকেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে ছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে আপনি কিছু বলবেন কি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটি একটি দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। সংক্ষেপে বললে এটা বলা যায় যে, কমিউনিস্টরা সবখানেই ছিলেন। পার্টি নিষিদ্ধ থাকার কারণে নানা ফর্মে তারা কাজ করে গেছেন। কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগের মধ্যেও ছিলেন। সাতান্ন সালে আওয়ামী লীগের ভেতরের বিরোধকে কেন্দ্র করে বামপন্থি চিন্তার মওলানা ভাসানী আলাদা দল গঠন করলেনÑ ন্যাপ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, সেখানেও কমিউনিস্টরা ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলতে গেলে, সত্যিই বলতে হয় যে, অনেক আগে থেকেই তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চিন্তা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল। বাষট্টির আন্দোলন শুরুর আগে একষট্টি সালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিব গোপন বৈঠক করেন। তিন-চারটি বৈঠক হয়েছিল। কীভাবে আন্দোলনের সূচনা করা যায়, কীভাবে ছাত্রদের রাস্তায় নামানো যায়- এসব নিয়ে কথা হয়। সেখানে রাজবন্দিদের মুক্তি, ভোটাধিকারসহ কোন কোন দাবিতে আন্দোলন হবে সে প্রসঙ্গে শেখ মুজিব কমিউনিস্ট নেতাদের বলেছিলেন, দাদা, আরেকটি দাবি লেখেন- ‘পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা কায়েম করতে হবে।’
(সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্তসার)
