মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করে তৈরি হচ্ছে পুলিশ ব্যারাক-সরকারি ভবন

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:৪৪ পিএম

মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পুরো গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুলিশের ব্যারাক, সরকারি ভবন এবং শরণার্থী পুনর্বাসন শিবির।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মিয়ানমার সরকারের আয়োজিত এক সফরে গিয়ে বিবিসি অন্তত চারটি স্থান খুঁজে পেয়েছে যেখানে সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

অথচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এগুলো আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের বসতি।

তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে এসব স্থাপনা তৈরির অভিযোগ নাকচ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের জেরে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

জাতিসংঘ একে জাতিগত নির্মূল কর্মকাণ্ডের ‘টেক্সট বুক’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে নিজেদের বাহিনীর হাতে বড় মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নাকচ করেছে মিয়ানমার।

গত মাসে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যর্থ হয় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টা। মিয়ানমারের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে কেউই ফিরতে রাজি না হওয়া এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ ২০১৭ সালে সংঘটিত নিপীড়নের জন্য কোনো জবাবদিহি নেই এবং নিজেদের চলাফেরায় স্বাধীনতা ও নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়েও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তবে এই ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছে মিয়ানমার। তারা বলছে,  অনেক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিল তারা। এই বিষয়টি প্রমাণ করতেই বিবিসি-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের তাদের প্রস্তুতি পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

রাখাইনে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর কড়াকড়ি করা হয় সাংবাদিকদের জন্য। সরকারি ব্যবস্থায় এই ভ্রমণে পুলিশের তত্ত্বাবধান ব্যতীত ছবি তোলা ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুমতি ছিল না তাদের।

তবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে উচ্ছেদের অকাট্য প্রমাণ দেখতে পান বিবিসির সাংবাদিক জোনাথন হেড।

স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ ভাগ গ্রাম পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের সরকার সাংবাদিকদের হ্লা পো কং নামে একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, স্থায়ী আবাসে ফেরার আগে এই শিবিরটিতে ২৫ হাজার শরণার্থী দুই মাস ধরে থাকতে পারবে।

জোনাথন হেড শিবিরটির পরিচালক সো শোয়ে অং-কে জিজ্ঞাসা করেন, গ্রাম দুটো গুঁড়িয়ে দেওয়া হল কেন, তখন কোনো গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন।

কিন্তু তিনি যখন স্যাটেলাইট চিত্রে এর প্রমাণ দেখালেন তখন শোয়ে অং বললেন যে, তিনি কয়েক দিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

এরপর কিয়েন চং নামে আরেকটি পুনর্বাসন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় সাংবাদিকদের। সেখানে জাপান এবং ভারত সরকারের সহায়তায় বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য।

তবে এই পুনর্বাসন শিবিরটি তৈরির জন্য মিয়ার জিন নামে একটি রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই গ্রামটি ছিল নতুন করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা পুলিশ বাহিনীর জন্য বানানো একটি ব্যারাকের পাশে।

২০১৭ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অংশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল রোহিঙ্গারা।

ক্যামেরার পেছনে মিয়ার জিন গ্রামটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন কর্মকর্তারা।

মংডু শহরের বাইরেই অবস্থিত মিও থু গাই নামে একটি গ্রামে একসময় ৮ হাজার রোহিঙ্গার বাস ছিল।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি সরকারি গাড়িবহরে করে ভ্রমণের সময় ওই গ্রামটির ছবি তুলেছিলেন জোনাথন। ওই গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বড় দালানগুলো অক্ষত ছিল। আর যে গাছগুলো রোহিঙ্গা গ্রাম বেষ্টন করেছিল সেগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু এখন, মিও থু গাই গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় সরকারি স্থাপনা আর পুলিশ কমপ্লেক্স ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি সাংবাদিকদের। এমনকি সেই গাছগুলোও নেই।

সাংবাদিকদের ইন দিন নামে আরেকটি গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টা নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি।

ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিল মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন, মুসলিমদের কোনো চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ এবং শান্তিপূর্ণ।

 

 

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত