ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৬শ’ ৭২তম স্থান অর্জন করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন সন্তান পান্না আক্তার। দিনমজুর বাবা আর গৃহকর্মী মায়ের পক্ষে মেয়েকে মেডিকেল কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। ফলে ভালো রেজাল্ট করেও মুখের হাসি উধাও হয়ে যায় পান্নার। অবশেষে পান্নার মুখের হাসি ফিরিয়ে দিতে তার মেডিকেল কলেজে পড়ার দায়িত্ব বহনের ঘোষণা দিয়েছেন চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের সাংসদ মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম এবং চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান।
হাজীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড়কুল ইউনিয়নের দক্ষিণ রায়চোঁ গ্রামের মুনশি বাড়ির মো. দুলাল হোসেন এবং কোহিনুর বেগমের তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট মেয়ে পান্না। তাদেরই ছোট মেয়ে অদম্য মেধাবী পান্না সকল প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে উতরে যায় মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা। কিন্তু অর্থের অভাবে তার মেডিকেলে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান পান্নার শিক্ষকরা। অদম্য মেধাবী পান্নার মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং পড়াশোনায় সহায়তা চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মানবিক সহায়তা চায় তারা। এ সংক্রান্ত খবর গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
এরপরই এই আবেদনে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন স্থানীয় সাংসদ মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম এবং জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান। দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটির ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া এবং পড়ালেখার যাবতীয় খরচ বহন করার ঘোষণা দেন উভয়ই।
বৃহস্পতিবার রাতে পান্না ও তার পরিবারের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিক। এ সময় তিনি পান্না ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নেন, এবং তার পাশে থাকার ঘোষণা দেন। একই দিন সন্ধ্যায় চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মাজেদুর রহমান খাঁন মেয়েটির মেডিকেল কলেজে ভর্তির ব্যয়ভার বহন করবেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মাজেদুর রহমান খান বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়া ওই শিক্ষার্থীর ভর্তি হতে যত টাকা লাগবে তার পুরোটাই চাঁদপুর জেলা প্রশাসন দেবে। এ ছাড়া সে যে কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে আমি সেই কলেজের সভাপতি হিসেবে পরবর্তীতে আরও সহযোগিতা করব।
এদিকে, এমন খবরে খুশির বন্যা বইছে পান্নার পরিবার ও তার শিক্ষকদের মাঝে। পান্নার মা কোহিনূর বেগম জানান, রাতে এমপি স্যার ও ডিসি স্যার মোবাইল ফোনে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা আমার মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের কাছে আজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব আমরা।
মেডিকেল কলেজের ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে পান্না বলেন, আজ আমি পৃথিবীর সুখী মানুষের একজন। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় পড়ালেখার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে আমাকে। অনেক অসুবিধার মধ্যে থাকলেও আমি চেয়েছিলাম পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট করতে। পড়ালেখায় ভালো বলে স্কুল এবং কলেজের শিক্ষকরা আমাকে অনেক সাহায্য-সহায়তা করেছেন। তাদের সহায়তার না পেলে আজ আমি এত দূর আসতে পারতাম না। শুধু তাই নয়, এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পরে কলেজের স্যাররা আমাকে কুমিল্লায় এক ম্যাডামের বাসায় রেখে মেডিকেলের কোচিং করিয়েছেন। স্যারদের সহায়তা আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। কিন্তু ভর্তির সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। আজ সেই সমস্যা সমাধান হওয়ায় এখন আমি একজন আদর্শবাদ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষে এগিয়ে যাচ্ছি।
পান্না হাজীগঞ্জ উপজেলার বেলচোঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেন। পরে তিনি চলতি বছর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৬৭২তম স্থানে আসায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়।
রায়চোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরিন শামীম বলেন, অত্যন্ত হত দরিদ্র ঘরের সন্তান পান্না। আমাদের স্কুল থেকে পান্না কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। পরবর্তীতে সে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়ও ভালো রেজাল্ট করে মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তার এই অসামান্য সাফল্যে আমরা অত্যন্ত খুশি। তার বাবা দিনমজুর এবং মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বিত্তবানদের সহযোগিতায় মেয়েটি যদি উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করতে পারে তাই আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, যে কেউ পান্নার উচ্চ শিক্ষায় সহায়তা করার জন্য ০১৮৩১-৪০১২৭২ নম্বরে যোগাযোগ করে আর্থিক সহায়তা পাঠাতে পারেন।
প্রসঙ্গত, পান্নার উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনার সব খরচ বহন করেছে হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ। তার কোচিং চলাকালীন সম্পূর্ণ খরচ বহন করেছিল একই কলেজের সহকারী অধ্যাপক বেলাল এবং তার স্ত্রী সহকারী অধ্যাপক বিলকিছ বেগম।
