বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১৩ পিএম

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যু এবং নৃশংস হত্যা কাঁপিয়ে দিল আমাদের মানসিক  স্থৈর্যকে। ১০ হাজার ছাত্রের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হল নামের ছাত্রাবাসে ৫ শতাধিক ছাত্রের বাস। সেখানে ৬/৭ ঘণ্টা ধরে পেটানো হয়েছিল আবরারকে। কী ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে কেউ কেউ বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে, শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ক্যান্টিনে গিয়ে খেয়ে এসেছে, তারপর আবার পিটিয়েছে। ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে একজন নাকি দেড় ঘণ্টা ধরে পিটিয়েছে, মারতে মারতে ঘেমে গিয়েছে। কিন্তু মারলেই তো হবে না, মানুষের মার সহ্য করার তো একটা সীমা আছে। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে আবরার বলেছিল, ‘ভাই, ও ভাইগো, আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগতেছে’। এরপর সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর তাকে নামিয়ে এনে রাখা হলো সিঁড়ির গোড়ায়। যারা পিটিয়েছে তাদের একজন মোটরসাইকেল চালিয়ে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনল। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন আবরার বেঁচে নেই। যারা পিটিয়েছে, মৃত্যুর কথা শুনে তাদের একজন রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এসব বর্ণনা প্রায় সব পত্রিকায় লেখা হয়েছে। পত্রিকায় গত ক’দিন ধরে এই বিষয়ে বিস্তৃত লেখা পড়ে কারও পক্ষে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার উপায় কি আছে? তাই সারা দেশে মানুষের মধ্যে এক আবেগময় উৎকণ্ঠা, বেদনাময় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, কী হচ্ছে আমাদের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? কী মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে অথবা বড় হচ্ছে আমাদের মেধাবী ছাত্ররা? মেধার সঙ্গে মানবিকতা কি মিলছে না? শিক্ষার সঙ্গে সম্মেলন ঘটছে না কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষক ও ছাত্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না? উচ্চতর শিক্ষা শুধু উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করবে, নৈতিক মান ও গণতান্ত্রিক দায় সম্পন্ন মানুষ কি তৈরি হবে না এখানে?

আমাদের জীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হত্যাকাণ্ড তো আর কম দেখা হলো না। এ দেখার শুরু কবে থেকে আর শেষ কোথায় তা বলতে গেলে একমত হওয়ার উপায় নেই। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখতে দেখতে আমরা কি মানবিক বোধগুলো হারিয়ে ফেলছি? বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের লাশ পড়ে, রক্তাক্ত হয় সবুজ ক্যাম্পাস কিন্তু ধরা পড়ে না কেউ, শাস্তি পাওয়ার নজির নেই কারও। আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত খুন হয়েছে ৫৪ জন যার মধ্যে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেছে ৩৯ জন। এক হিসাবে দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুন হয়েছে ১৫১ জন ছাত্র। এদের মধ্যে সংখ্যার বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার চেয়ে এগিয়েÑ ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জনের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৪ সালে বুয়েট ক্যাম্পাসে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কর্মী আহমেদকে দিনের বেলা খুন করে গিয়েছিল কারা তা আজও জানতে পারা যায়নি। সাবেকুন নাহার সনি হত্যাকাণ্ড ব্যথিত করেছিল সকলকেই কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হয়নি আজও সেই ঘটনার। বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের বোধহীন করে ফেলছে ক্রমাগত। কিন্তু আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া মানবিকবোধও মাঝে মাঝে চমকে ওঠে হত্যা প্রক্রিয়ার নৃশংসতা ও ভয়াবহতা দেখে। আবরার হত্যা যেন সেই ধরনের একটি আঘাত। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আঘাত কি আমাদের জাগিয়ে তুলবে নাকি অতীতের মতো বেদনার সাগরে আলোড়ন তুলে মিলিয়ে যাবে? খুনিদের শাস্তি দেওয়ার জনপ্রিয় দাবির আড়ালে কৌশলে ছাত্রসমাজের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুচতুর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটবে কি?

সব হত্যাকাণ্ড বেদনার, তবে সব হত্যা সমান বিক্ষোভের জন্ম দেয় না। আবরারের হত্যাকাণ্ড শুধু বুয়েটের ছাত্রদেরই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে তাই নয় সারা দেশে প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছে। আবরারের মৃত্যু ভাবিয়ে তুলেছে সকলকেই। হত্যার সঙ্গে জড়িত যে ২০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের কথা ভাবলে তো আতঙ্কিত হতে হয়। কীভাবে মেধাবী ছাত্রদের কারও কারও মধ্যে খুনি মানসিকতার জন্ম হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। গ্রেপ্তারকৃত ছাত্ররা যেসব জবানবন্দি দিয়েছে এবং তার যতটুকু পত্রিকায় এসেছে তাতে হত্যার মোটিভ খুঁজে বের করা যাবে হয়তো। কিন্তু কেবল হত্যার মোটিভ বের করা আর শাস্তি দেওয়াই শেষ কথা নয়। ছাত্র যুবকদের মনস্তাত্ত্বিক গড়ন বোঝা এবং ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে নির্যাতন ও হত্যা খুনের কী সম্পর্ক তা জানার জন্য এসব হত্যার কারণ উদঘাটন করা জরুরি। কেন দরিদ্র পরিবারের একজন মেধাবী ছাত্র এসএসসি, এইচএসসিতে এত ভালো ফলাফল করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নির্যাতনকারীতে পরিণত হলো? সে ঢাকায় এসেছিল যখন তখন তার পেছনে ছিল বাবা-মায়ের মুখ আর সামনে ছিল তার নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। কে বা কোন প্রক্রিয়া তাকে এই পথে টেনে আনল?

এখন প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে টর্চার সেল ছিল, হলের গেস্ট রুমগুলোতে ম্যানার শেখানোর নামে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নির্যাতন করা হতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটা তথাকথিত ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার কথা, সেগুলো মাথা নিচু করে চলার সবক শেখানোর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে মর্যাদা নিয়ে চলা শিক্ষকের সংখ্যা হাতেগোনা। তারাও ওপরের ভাইস চ্যান্সেলর আর নিচে ‘বড় ভাই’দের দাপটে নিজের সম্মান নিজে রক্ষা করে চলার পথ অনুসরণ করে চলেছেন। ভাইস চ্যান্সেলর এখন আর আদর্শ শিক্ষাবিদের প্রতিমূর্তি নন। আনুগত্য, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতি সীমাহীন স্নেহ এবং ছাত্রস্বার্থের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতা যে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার প্রধান যোগ্যতা তা প্রমাণিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলররা শ্রদ্ধার পরিবর্তে মুখরোচক আলোচনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এতে শুধু শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে তাই নয়, সাংস্কৃতিক মানেরও অধঃপতন ঘটেছে। বাংলাদেশে এখন ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আরও ৪টি অনুমোদন পেয়েছে, যেগুলোতে ২/১ বছরের মধ্যেই ক্লাস শুরু হবে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠন করা তো দূরের কথা, প্রকৃত অর্থে শিক্ষা কার্যক্রম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত হয় তা কি আমরা কেউ বলতে পারি? কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করা একজন ছাত্রের জন্য মানুষ হিসেবে সুসমন্বিত বিকাশের কী কী আয়োজন আছে সমাজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে? বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা না শিখলে আর কোথায় শিখবে তা?

যৌবন চায় নিজের সক্ষমতার প্রকাশ ঘটাতে। সে চায় তাকে দেখুক সবাই, তারিফ করুক তাকে। বিতর্ক, খেলাধুলা, সংগীত চর্চা, ছবি আঁকা, সংগঠন করা এসব তাদের সুপ্ত ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ কোথায়? ফলে জান্তব শারীরিক শক্তি তার প্রধান অবলম্বন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিকশিত হওয়া নয় প্রতিপক্ষকে পরাস্ত এবং নির্মূল করার মাধ্যমে সে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। এক্ষেত্রে সে ক্ষমতার আশ্রয় প্রশ্রয়ে বড় হতে চায়, দুর্বলের ওপর তার প্রয়োগ ঘটাতে চায়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জবাবদিহি না থাকলে সে দুর্বিনীত হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে র‌্যাগিং, হলে বাকি খাওয়া, টাকা রোজগারের অনৈতিক পথ যেমন সিট বাণিজ্য, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, প্রতিষ্ঠানের চারপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় এই সব কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্ররা যুক্ত তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার কাজে ব্যবহৃত হয় এরা। এদের নৈতিকতার মান এতটা নামিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দেশের স্বার্থে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের আন্দোলন, শিক্ষার বাজেট বরাদ্দের আন্দোলন, সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার আন্দোলন, নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মতো কোনো আন্দোলনেই তাদের উপস্থিতি নেই বরং প্রতিটি আন্দোলন দমন করতে উৎসাহী ভূমিকায় দেখা যায় তাদের। এরা রাজনীতি শিখেছে কার কাছে, শিখছে কাদের কাছে, করছে কোন রাজনীতি? মন্ত্রী, এমপিরা তাদের কোন নৈতিক মানে উদ্বুদ্ধ করেন? আবরার হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে কিন্তু যে রাজনীতি তাদের খুনি বানায় তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে কে?

আবরার হত্যায় অন্যতম অভিযুক্ত অনিক সরকারের বাবা আনোয়ার হোসেন বুক ভরা কষ্ট নিয়ে যে কথা বলেছেন তাতো সব বাবা-মায়েরই কথা। তিনি বলেছেন, ‘অনেক কষ্ট করে তাকে টাকা পাঠিয়েছি মাসের পর মাস। সব বাবা-মা চান তার সন্তান ভালোভাবে পাস করে আসুক, বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করুক। কিন্তু অনিক এমন হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে ভাবতে পারছি না।’ কিন্তু বাবা-মা ভাবতে না পারলেও বাজার অর্থনীতির মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতা যে লক্ষ যুবকের মনুষ্যত্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে তা অস্বীকার করা যাবে না। আবরার প্রথম নয়, গত কয়েকদিনে আরও কয়েকজনের মৃত্যু ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ড সমাজের যে ক্ষত উন্মোচিত করে দিয়েছে মলম দিয়ে তাকে নিরাময় করা যাবে না। চুনকাম করে দেয়ালের ফাটল আড়াল করা যায় কিন্তু ফাটল বন্ধ করা যায় না। রাজনীতি বন্ধের মুখরোচক দাবির আড়ালে তাই বিকল্প রাজনীতির বিকাশ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা বন্ধ করা জরুরি। যে রাজনীতি শেখায় যুক্তির চর্চা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তার বিকাশ ঘটলে আবরারদের মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে।
 

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan. spb@gmail. com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত