এম এ আজিজ স্টেডিয়াম কাল ভরদুপুরে ছিল সুনসান নীরবতা। খাঁ-খাঁ করছে গ্যালারি। অথচ আজ এই গ্যালারিই চঞ্চল হয়ে উঠবে হাজারো দর্শকে। চট্টগ্রামবাসী আজ স্টেডিয়াম পানে ছুটবেন অভিন্ন প্রত্যাশায় শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপের শিরোপাটা উঠুক স্বাগতিক চট্টগ্রাম আবাহনীর হাতে। শেষ ১২ দিন এই বন্দরনগরী পরিণত হয়েছিল ফুটবলের নগরীতে। তাই শেষটাও তারা রাঙাতে চাইবে শিরোপা উদযাপনে। সেই উদযাপনে তাদের সামনে বাধা মালয়েশিয়ার তেরেঙ্গানু এফসি। যাদের সামনে আছে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ের হাতছানি। তাই এই সুযোগ তারাও চাইবে না হাতছাড়া করতে।
চট্টগ্রাম আবাহনী এই আসরের প্রথম সংস্করণের চ্যাম্পিয়ন। মাঝে ২০১৭ সালের টুর্নামেন্টে তারা থেমেছিল সেমিফাইনালে। এবার শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধারের সুবর্ণ সুযোগ। তেরেঙ্গানুর ফাইনালে আসার পথটা ছিল আরও মসৃণ। আগের চার ম্যাচের একটিতেও হারেনি দলটি। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোলও (১৩ গোল) তাদের নামের পাশে। ফাইনাল প্রতিপক্ষের চেয়ে দুটি গোল বেশি। দু’দলই আবার নিজ নিজ গ্রুপের সেরা হয়ে নাম লিখিয়েছিল সেমিফাইনালে। তো, বলে দেওয়াই যায় আসরের সেরা দুটি দলই খেলতে যাচ্ছে ফাইনাল।
সেমিফাইনালে চট্টগ্রাম আবাহনী দেখিয়েছে তাদের লড়াকু মানসিকতা। ভারতের গোকুলাম কেরালার কাছে দুবার পিছিয়ে থাকার পরও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সময়ের গোলে জিতে প্রমাণ করেছে দল হিসেবে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার দৃঢ়তা। তেরেঙ্গানু দলটির গ্রাফ ওপরের দিকে উঠেছে কেবল একজনকে কেন্দ্র করে। তিনি ইংলিশ প্লেমেকার লি টাক। গ্রুপের শেষ ম্যাচে বসুন্ধরা কিংসকে তিনি বিদায় করে দেন দারুণ এক হ্যাটট্রিকে। আর সেমিফাইনালে মোহনবাগানের বিপক্ষে আরও জ¦লে উঠে পেয়েছেন দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক।
তেরেঙ্গানুর আছে লি টাক। তার মানের কেউ না থাকলেও স্বাগতিক চট্টগ্রাম আবাহনীর রয়েছে ছন্দে থাকা মিডফিল্ডার জামাল ভুইয়া, নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড চিনেডু ম্যাথিউ, আইভরিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার চার্লস দিদিয়ের এবং মন্টেনেগ্রেইন স্ট্রাইকার লুকা রতকোভিচ। এই চারের সঙ্গে রয়েছেন একঝাঁক তরুণ তুর্কি। যারা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন কোচ মারুফুল হককে।
গতকাল ফাইনাল নিয়ে বলতে গিয়ে একটা কথা মিলে গেল দু’দলের কোচের। তেরেঙ্গানুর কোচ নাফুজি বিন জাইন বললেন, ‘কাল স্বাগতিকরাই থাকবে ফেভারিট। আমরা নামব আন্ডারডগ হিসেবে। আর চাপের কথা বললে সেটা থাকবে স্বাগতিকদের, কারণ তাদের খেলতে হবে নিজেদের দর্শকের সামনে।’ চট্টগ্রাম আবাহনী কোচ মারুফুল হক পরে প্রত্যয়ী কণ্ঠেই বললেন, ‘ফাইনালের ফেভারিট আমরাই। ফাইনালের চাপও থাকবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস আছে সেটাকে উপভোগ করে সেরা ফুটবলটাই খেলবে ছেলেরা।’
দু’দলের কোচ, অধিনায়ক একটা বারুদে ম্যাচের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সময়ই বলে দেবে সেই লড়াইয়ে কাদের লক্ষ্যপূরণ হয়।
কোচদের ভাবনা
মারুফুল হক, চট্টগ্রাম আবাহনী
লক্ষ্য : আসর শুরুর আগে লক্ষ্যটা ছিল শিরোপা জয়। তাই এটা আমাদের জন্য একটা প্রত্যাশিত ফাইনাল। দুটি সেরা দল শিরোপার জন্য খেলবে। আগের ম্যাচগুলোতে সামর্থ্যরে স্বাক্ষর রেখেছি। সেটা অব্যাহত রেখেই আমরা ফাইনাল জিতব।
দু’দল প্রসঙ্গে : ওরা মিডফিল্ডটা সব সময় নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেখান থেকে ফরোয়ার্ডরা ধীরে ধীরে সামনে চলে আসে। আর পেছনে একটা স্পেস রেখে আসে। লি টাক এবং আরেক মিডফিল্ডার বলের জোগান দেয় আর ব্রুনো এবং সাইফিক বিন ইসমাইল আক্রমণ করে। এই তিনজনের একটা কম্বিনেশন আছে। সেটাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। আর আমরা দ্রুত আক্রমণ পছন্দ করি। বল নিজেদের অর্ধে পেলে সেখান থেকে দ্রুত আক্রমণে যাই। আর বিল্ড-আপ খেলাটা আমরা নিজেদের অর্ধ থেকেই শুরু করি। এই ম্যাচে মধ্যমাঠকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
মাফুজি বিন জাইন, তেরেঙ্গানু এফসি
লক্ষ্য : স্বাগতিকদের বিপক্ষে ফাইনাল খেলা সহজ নয়। তবে আমি একটা ভালো পারফরম্যান্স আশা করব। আমরা পুরো আসরেই ভালো ফুটবল খেলেছি। তারা ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে। সেটা ধরে রেখেই ম্যাচটা জিততে চাই।
দু’দল প্রসঙ্গে : তাদের স্থানীয় ফুটবলাররা খুব ভালোমানের। আক্রমণে ওরা সংঘবদ্ধ। খুব ভালোমানের একজন স্ট্রাইকার আছে। আর মাঝমাঠে অধিনায়ক (জামাল ভুইয়া) এবং একজন বিদেশি নিয়ন্ত্রণ করে খেলে। এটা তাই মোটেই সহজ ম্যাচ নয়। প্রতিপক্ষ আমাদের চেয়ে শারীরিক সামর্থ্যে এগিয়ে, শক্তি ও গতিও ওদের ভালো। তবে আমরাও প্রমাণ করেছি আমাদের সামর্থ্য। তবে অল্প সময়ে অনেকগুলো ম্যাচ খেলায় ছেলেরা খানিকটা ক্লান্ত। তাছাড়া সেমিফাইনালের পর মাত্র একদিন সময় পেয়েছি রিকভারির। তাই যারা পুরোপুরি ফিট হয়তো তাদের নিয়েই দল গড়ব।
অধিনায়কদের কথা
জামাল ভুঁইয়া, চট্টগ্রাম আবাহনী
আসর শুরুর আগে আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল শিরোপা। সেই লক্ষ্যপূরণে একমাত্র বাধা মালয়েশিয়ার দলটি। আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যের খুব কাছে দাঁড়িয়ে। সারা দেশ আমাদের সমর্থন দেবে আশা করছি। অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জিততে পারলাম কি পারলাম না সেটা মুখ্য নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো চট্টগ্রাম আবাহনীর জয়। কোচ বলতে পারেন কাল কোন ১১ জন খেলবে। তবে আমি বলতে পারি, আমরা প্রত্যেকেই প্রস্তুত আছি খেলার জন্য।
লি টাক, তেরেঙ্গানু
কাল (আজ) একটা বিশেষ দিন। আমার চোখে এখন পর্যন্ত সার্থক একটা টুর্নামেন্ট এবং এর শেষটা করতে চাই শিরোপা জিতে। আসরের সেরা দুটি দল এখানে খেলবে। তাই একটা জমজমাট ফুটবল লড়াইয়ের প্রস্তুতি দিচ্ছি। তারা অনেক শক্তিশালী দল। একদিন বেশি বিশ্রামও পেয়েছে। তবে আমরা প্রস্তুত নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ রাখতে। তাদের খেলার ধরন সম্পর্কে আমরা জানি। এদেশে অতীতে খেলার অভিজ্ঞতা আছে বলেই আমি খুব আশাবাদী ম্যাচটি নিয়ে।
