ভেজাল থামছে না অভিযানেও

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ০২:০৫ এএম

চট্টগ্রাম নগরীতে ফুটপাত ও সাগরপাড়ের বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি নামিদামি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারিগুলোতে চলছে ভেজাল, বাসি আর অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও নামিদামি রেস্টুরেন্টগুলোও একই কাজ করছে। সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ফুটপাতসহ পাড়া-মহল্লার বেশকিছু হোটেল-রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে জরিমানার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ খাবার ধ্বংস করে। আর এর মাধ্যমে আবারও উঠে এসেছে নগরজুড়ে বাসিপচা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের ভয়াবহ চিত্র।

এদিকে নগরীর নামিদামি হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রায়ই অভিযান চালালেও যেন কোনো বিকার নেই প্রতিষ্ঠান মালিকদের। বারবার জরিমানা গুনেও ফের ঘুরেফিরে তারা সেই বাসিপচা ও অস্বাস্থ্যকর খাবারই বিক্রি করছেন। এ পরিস্থিতিতে অভিযান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জরিমানা কিংবা হোটেল মালিকদের নিরুৎসাহিত করতে পারবেন, কিন্তু জনগণ সচেতন না হলে এসব অসাধু কার্যক্রম ঠেকানো কঠিন।

সর্বশেষ গত ২৯ অক্টোবর নগরীর মোমিন রোডে ব্লু ওশান রেস্টুরেন্ট এবং মোগল বিরিয়ানি অ্যান্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্টকে অস্বাস্থ্যকর ও বাসি খাবার বিক্রির দায়ে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগে গত ২৩ অক্টোবর জুবলী রোডের বৈশাখী রেস্তোরাঁ অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউজকে বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স নবায়ন না করে ব্যবসা পরিচালনা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বাসি খাবার বিক্রির দায়ে ১০ হাজার টাকা, দামপাড়া এলাকার ইস্পা রেস্তোরাঁ অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউজকে খাদ্যে ক্ষতিকারক রং, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার বিক্রির দায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া একই দিন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অভিযানে গিয়ে অননুমোদিত ফ্লেভার ব্যবহার করায় বন্দর থানার মিতালী বেকারিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। পাশাপাশি প্রায় ৮০ কেজি কেক ধ্বংস করে তারা। এছাড়া একই এলাকার নয়ন বেকারি সিলগালার মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরও আগে গত ২০ অক্টোবর কলেজপাড়াখ্যাত চকবাজারের পাতিসেরি রেস্টুরেন্টকে অননুমোদিত সস ও দই ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করায় ১০ হাজার টাকা এবং আড্ডা রেস্টুরেন্টকে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সেখানে পুরনো প্লাস্টিক বোতল ভরা ‘লোকাল’ সস দিয়ে ডিম-পরোটা, চিকেন রোল ও শিঙাড়াসহ নানা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল।

ওই দুটি অভিযানে দেখতে পাওয়া চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মেট্রো) বিকাশ চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সসের নামে কী খাওয়াচ্ছে তারাই জানে না, মেয়াদ কতদিনের তারও কিছু উল্লেখ নেই। আমরা ওইদিন ৪০ লিটার সস ধ্বংস করেছি। আর অভিযানে আমরা জরিমানা কিংবা হোটেল মালিকদের নিরুৎসাহিত করতে পারব কিন্তু জনগণ সচেতন না হলে এসব অসাধু কার্যক্রম ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

গত ২৯ আগস্ট নগরীর দাওয়াত রেস্টুরেন্টে তৃতীয় দফায় অভিযানে গিয়ে পোড়া তেল, রান্নাঘরে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বাবুর্চি ও সহকারীদের নির্ধারিত ড্রেস কোড না মানাসহ বিভিন্ন অপরাধে নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার আইনে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই ভবনের নিচতলার গ্র্যান্ড সিকদার হোটেলকেও ভোক্তা অধিকার আইনে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী সেদিনের অভিযানটি পরিচালনা করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বারবার তাদের সতর্ক করা হলেও তারা পোড়া তেল ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার বিক্রি করে আইন ভঙ্গ করেছে। তাই জরিমানা করে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।’

এর আগে ১০ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ‘দাওয়াত’ রেস্টুরেন্টকে ৬০ হাজার টাকা এবং গ্র্যান্ড সিকদার হোটেলকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেখানে এক সপ্তাহ আগে রান্না করা খাবার ফ্রিজে সংরক্ষণ করে ক্রেতাদের পরিবেশনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। আর গ্র্যান্ড সিকদার হোটেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরও আগে ২০১৮ সালেও এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অপরাধে জরিমানা করা হয়েছিল।

নগরীর বাসিন্দা প্রবীণ চিকিৎসক ডা. মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর, বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার গ্রহণে নগরবাসী লিভারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব খাবারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস পায়। যার ফলে ওষুধও শরীরে কাজ করে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘খাদ্য ভেজালকারীদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ভেজাল খাবার বিক্রির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত