রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়ে করিমগঞ্জের নাম বদলের দাবি বিজেপির

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:১৮ পিএম

এবার আসামের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জের নাম পরিবর্তনের দাবি তুলেছে বিজেপি নেতারা। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা অনুযায়ী এলাকাটির নাম ‘শ্রীভূমি’ রাখার প্রস্তাব উঠেছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে।

বিবিসি বাংলা জানায়, আসামের মুসলিম অধ্যুষিত বিখ্যাত অঞ্চলটির নাম পরিবর্তন নিয়ে নতুন বিতর্ক দানা বাঁধছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একশ বছর আগে সিলেট সফরের সময়ে করিমগঞ্জেও গিয়েছিলেন। তিনি সিলেটকে ‘শ্রীভূমি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

সেই ঘটনার শতবার্ষিকী উদ্‌যাপন হতে যাচ্ছে চলতি বছরের নভেম্বরে। এমন মুহূর্তে বিজেপির দাবি, করিমগঞ্জের নতুন নাম হোক শ্রীভূমি।

গবেষকেরা মনে করেন, ১৯১৯ সালে শ্রীহট্ট বা সিলেট সফরকালে কাউকে সম্ভবত অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই অঞ্চলকে বর্ণনা করে লিখেছিলেন, ‘মমতাবিহীন কালস্রোতে, বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে, নির্বাসিতা তুমি, সুন্দরী শ্রীভূমি।’

অবিভক্ত সিলেট জেলার মধ্যে শুধু করিমগঞ্জই দেশভাগের পরে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় তাই করিমগঞ্জের নাম পাল্টিয়ে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রীভূমি করার দাবি উঠেছে।

মঙ্গলবার করিমগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদার্পণের শতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির এক সভায় ওই দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন হোজাইয়ের বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব।

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ইসলামি শব্দ বা সংস্কৃতি সংযুক্ত এলাকাগুলোর নাম বদলে ফেলা হচ্ছে। করিমগঞ্জ নিয়েও একই পাঁয়তারা চালাচ্ছে বিজেপি, এমনটা মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

শিলাদিত্য বলেন, ‘বরাক উপত্যকার বেশিরভাগ মানুষই সিলেটি। তাই সিলেটের সঙ্গে তাদের একটা আবেগ জড়িয়ে আছে। কিন্তু যখন পুরো সিলেট আর ভারতের সঙ্গে থাকল না, আর শুধু করিমগঞ্জ অঞ্চলটা এ দেশে এল, তখন থেকেই বরাকের মানুষের একটা সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে রয়েছে সিলেটকে নিয়ে। আমি ওই অনুষ্ঠানে যখন করিমগঞ্জে গিয়েছিলাম, অনেকেই আমাকে জানিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের করিমগঞ্জ পদার্পণের শতবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা জানানোর সব থেকে ভাল উপায় হবে যদি তার বর্ণনা অনুযায়ী করিমগঞ্জের নাম যদি ‘শ্রীভূমি’ রাখা যায়। সে জন্যই তাদের দাবিটিকে আমি পূর্ণ সমর্থন জানানোর কথা বলেছি।'

এই দাবি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করবেন বলেও শিলাদিত্য জানিয়েছেন।

সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন আরেক বিজেপি নেতা মিশনরঞ্জন দাস। তিনিও বিবিসিকে জানান, দাবিটির সঙ্গে তিনি সহমত এবং তারাও এই দাবি জানাবেন সরকারের কাছে।

তবে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দত্ত বলেন, ‘আসামের বাঙালিরা এখন একটা মহাসঙ্কটের মুখোমুখি। এনআরসির মাধ্যমে ১৯ লাখ মানুষ, যাদের মধ্যে সিংহভাগ বাঙালি, তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এই সময়ে একটা প্রান্তিক শহরের নাম বদলের প্রস্তাব দেওয়াটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতেই করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রস্তাব তোলা হয়েছে। আমরা সংগঠনগতভাবে এর বিরোধিতা করছি।’

বিশ্লেষক ও দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকার সম্পাদক অরিজিৎ আদিত্য মনে করছেন যে এর আগেও যেভাবে নানা শহরের ইসলামিক নাম বদল করেছে বিজেপি, এটাও সেরকমই একটা প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘শিলাদিত্য দেবদের মনে রাখা উচিত যে এই নাম পাল্টানোর যে রাজনীতি তার দল শুরু করেছেন, তার সঙ্গে স্থানীয় আবেগ জড়িয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের কারও কাছে কোনো ইঙ্গিত নেই যে করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রস্তাব স্থানীয় মানুষদের মধ্যে থেকে এসেছে। তাহলে কেন নাম বদল? একটাই কারণ - করিমগঞ্জ নামটার মধ্যে করিম শব্দটা আছে আর তার সঙ্গে ইসলামের যোগসূত্র। ২০২১ এর নির্বাচনের আগে তারা একটা হাওয়া তৈরি করতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে।’

করিমগঞ্জের নাম বদলের দাবিকে সমালোচনা করেছে কংগ্রেস দলও। কিন্তু নাম বদলের রাজনীতির সমালোচনা নিয়ে শিলাদিত্যের ভাষ্য, ‘এটা নিয়ে যে রাজনীতি দেখছেন, তারা দেখতে পারেন। কিন্তু আমি কোনো রাজনীতি করিনি। আমি একটা দলের বিধায়ক ঠিকই, কিন্তু আমার বাবারও সিলেটে জন্ম। তাই আবেগ আমারও আছে। আর রবীন্দ্রনাথের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী একটা সুন্দর জেলার সুন্দর নাম হবে - এটাই চেয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত