২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে। ভয়াল ওই তাণ্ডবের এক যুগ পার হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি উপকূলবাসীর জীবনযাত্রা। ২২০ কিলোমিটার গতির সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো মেরামত না হওয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কে রাত কাটান হাজারো জেলে পরিবার। ভাঙা ওইসব বাঁধ দিয়ে জোয়ারে প্রতিনিয়ত তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনÑ
ঝালকাঠী : একযুগ অতিবাহিত হলেও সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত সুগন্ধা ও বিষখালী নদী তীরবর্তী এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় এখনো দুর্যোগ ঝুঁকিতে দিন পার করছে জেলার হাজার হাজার পরিবার। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় সিডর অন্যান্য জেলার মতো জেলার উপকূলীয় চার উপজেলাকে ল-ভ- করে দেয়। সিডরে জেলায় ঘর ও গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যায় অর্ধশতাধিক মানুষ। আহত হয় কয়েক হাজার। হতদরিদ্র পরিবারগুলো সিডরের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি বারো বছরেও। জেলার ৩২টি ইউনিয়নের ঘরবাড়ি, গাছপালা, ক্ষেতের ফসল, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, বাঁধ সবকিছুই ল-ভ- হয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিষখালী নদী তীরবর্তী এলাকার রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন পরিবারগুলো। বিধ্বস্ত হয় কয়েক শতাধিক সেতু, কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সদর উপজেলার পাড়েরহাট এলাকার বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, বেড়িবাঁধ থাকলে হয়তো বুলবুলের তা-ব থেকে আমরা রক্ষা পেতাম। বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে আমারসহ এই এলাকার কয়েকশ বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
বাগেরহাট : ‘এক যুগ আগের হওয়া প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠি আমরা। জলোচ্ছ্বাসে সাউথখালী ইউনিয়নের বগী, গাবতলা ও সাউথখালী গ্রামেই আট শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। তারপর থেকে আমাদের দাবি ছিল এই এলাকায় একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের। সরকার আমাদেরকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা দারুণ খুশি। কিন্তু বাঁধ নির্মাণকাজের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, তবে কাজ এখনো চলছে। আমরা আর ত্রাণ চাই না, আমরা চাই এই বাঁধটি যেন নদী শাসন করে টেকসই করা হয়।’ উপকূলীয় শরণখোলা উপজেলার প্রবল প্রমত্তা বলেশ্বর নদের বগী বন্দর এলাকায় গেলে স্থানীয় দোকানি ষাটোর্ধ্ব মুজিবুর রহমান হাওলাদার এসব কথা বলেন।
পটুয়াখালী : আজকের এই কালরাতে বঙ্গোপসাগর থেকে ২২০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে আঘাত হেনেছিল। এত বছর পরও যার ক্ষতচিহ্ন এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর অনেক মানুষ, অনেক জনপদ। প্রকৃতি যে মানুষের ওপর এতটা নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ৪ হাজার ৪৪০টি পরিবারকে পাকা ও আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। বর্তমানে ওইসব বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। অপরদিকে দীর্ঘ এক যুগেও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের টেকসই সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় উপকূলের এসব বাসিন্দার বান-আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না।
বরগুনা : সিডর উপকূলবাসীর জীবনযাত্রায় রেখে গেছে ভয়াবহ আঁচড়। দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। লবণপানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। খাদ্যের উৎস কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে এগোচ্ছে উপকূলীয় জীবন-জীবিকা। ভাঙন-আতঙ্ক আর জলোচ্ছ্বাস তো নিত্যদিনের সঙ্গী। আঁতকে ওঠা রাতের স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আজো। সুস্থ সুন্দর জীবনযাপনও রয়ে গেছে অনিশ্চয়তায়। সহায়তার পর সহায়তা মিললেও মিলেনি সক্ষমতা। ১২ বছরেও স্বাভাবিক হয়নি জীবনযাত্রা।
সুপার সাইক্লোন সিডরের আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল কয়েক হাজার মানুষের। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী। স্বাভাবিক হয়নি বরগুনাসহ সিডর-বিধ্বস্ত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা। দিন দিন কমে যাচ্ছে কাজের সুযোগ। খাবারের উৎসও হারিয়ে যাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকটে সিডর-বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনজীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বেড়িবাঁধ ভাঙা থাকায় লবণপানি ঢুকে বাড়ছে লবণাক্ততা। বরগুনাসহ উপকূলীয় চরাঞ্চলের জমিতে ধান চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রোগ-শোক, অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক প্রবণতা ও মারাত্মকভাবে বাড়ছে শিশুশ্রম, যা উপকূলের মেরুদ-কে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিচ্ছে না।
