বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে চলেছে। সেসব কাজই যে সংবিধান বা শিক্ষানীতিকে সামনে রেখে করছে, এমন দাবি করা যাবে না। কাজের সিংহভাগই মূলত আশু সমস্যার আশু সমাধান। তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, সরকারি কর্মকাণ্ডে শিক্ষার উন্নয়নে কোনো প্রভাব পড়ছে না। বরং দিনে দিনে প্রভাব বেশ স্পষ্ট। কিন্তু তা যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ¨ পূরণে এখনো ব্যর্থ হচ্ছে, সে কথা সরকারি মহলও স্বীকার করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগের কাছে পৌঁছে গিয়েছে এবং পাসের হারও তাই। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসছে এবং পাসও করছে। এখন সরকারের লক্ষ¨ শিক্ষাকে মানসম্মত করা। শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি কর্মসূচির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু শিক্ষাকে মানসম্মত করার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে¨ কোনোভাবেই পৌঁছানো যাচ্ছে না। বরং দিনে দিনে আমাদের শিক্ষার বেহাল দশা ফুটে উঠছে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কেউ নিজেদের লক্ষে¨র কথা মনে রাখছে না।
বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থির হয়ে রয়েছে। বিচিত্র সব বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে হাজির হচ্ছে, যা তাদের কল্পনার অতীত। দেশের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে নানা ধরনের অপরাধ-অপকর্ম চলে আসছে দলীয় ব্যানারে। বিভিন্ন সময়ে আন্তঃদলীয় কোন্দল, মারামারি, ভর্তি-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পদপদবি দখল, আধিপত্য বিস্তার, দুর্নীতি, সন্ত্রাসের বিস্তর অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিনিয়ত জাতীয় পত্রিকায় এসব খবরাখবর ছাপা হচ্ছে। ছাত্রনেতাদের চাহিদা পূরণ না করায় অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দেওয়া, অনুমতি না নিয়ে হলে আসন বণ্টন করায় প্রভোস্ট কার্যালয়ে তালা ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটছে। ‘গণঅভু¨ত্থান’ করে উপাচার্যকে মুক্ত করাও দেখছে দেশের সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশের কম হাজিরা থাকলেও পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পাওয়ার দাবি সামনে আসছে। অপরাধের বিচার না করে দলীয় বিবেচনায় অপরাধীদের আশকারা দেওয়ার ফলে অপরাধপ্রবণতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি এমন পরিবেশ বিরাজ করে, তবে মানসম্মত শিক্ষা সোনার পাথরবাটি চাওয়ার মতো হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী করে, সুজন করে, সংস্কৃতিমনা করে, সংযত ও পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়, বহুজনের কল্যাণ চেতনা দেয়, আত্মমর্যাদা ও বিবেকানুগত্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায়। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হানাহানি, কাড়াকাড়ি, মারামারি নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের রাজনীতির জন্য শিক্ষার্থীরা এসব কাজ করতে করতে আজ শিক্ষাঙ্গনে তা আমদানি করে নিয়েছে। নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে আজ আবরারদের জীবন কেড়ে নিতে হয়। শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম, মানবপ্রেম আর সেবার আগ্রহ হারিয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে অতীতের সব ঐতিহ্য ভুলে গিয়েছে। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার উন্নয়নে কোনো কার্যক্রম করে না। শিক্ষা-সহায়ক কোনো কার্যক্রমে জড়িত হয় না। বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে পদপদবি দখল করে ক্ষমতার দাপটে বিত্ত অর্জন করে নিজে বা পারিবারিকভাবে ধনী হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার সংগ্রামকে শ্রেয় বিবেচনায় নিয়ে নিজেকে সে পথে নিবেদিত করতে চায়।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও রাজনীতির মাঠে পিছিয়ে নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে নিবেদিত থেকে শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেয়ে রাজনৈতিক দলের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে অনেক বেশি আগ্রহী। একটা পদপদবি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সারা জীবনের অর্জনকে বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না তারা। একটা পদ মানেই নিজের খ্যাতি, পাশাপাশি কয়েক পুরুষের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়ে যায়। কে কী ভাবল, কে কী বলল, তা নিয়ে পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। দেশের সাধারণ আইনে অপরাধীদের নিজেদেরই তার অপরাধমুক্ততা প্রমাণ করতে হয়। এখানে তার বিপরীত। দলীয় অনুগ্রহের পদপদবিধারীদের দুর্নীতি উল্টো অভিযোগকারীদের প্রমাণ করতে হয়। তাই দলের আশীর্বাদ যত দিন মাথার ওপর থাকে, তত দিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকা যায়। এ অবস্থায় শিক্ষার পরিবেশ ও স্বার্থরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি কি কাম্য হতে পারে?
বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই মনে করেন, ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকরাজনীতি নিয়েও আলোচনা হওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের কোমলমতি হিসেবে বিবেচনায় নিলে বলাই যায়, তারা সাময়িক লাভের আশায় পথ হারিয়ে ফেলতে পারে। অতীত ঐতিহ্যের কথা ভুলে যেতে পারে। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। মগজের অনুশীলন না করতে পারে। যৌক্তিক জীবনযাপনে আগ্রহী না হতে পারে। নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা সৃষ্টির প্রয়াস তাদের নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞার প্রতীক শিক্ষককুল! প্রগতি চেতনার ভূমিকা পালনকারী গর্বিত সামাজিক শিক্ষক বলে যাদের মনে করা হতো, তারাও আজ দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে চূর্ণ-বিচূর্ণ। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার দুর্লভতায় বিরল। ব্যতিক্রম উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান। এ নিয়ে আলোচনা নয়। তাই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতির বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের সংকট উত্তর-উত্তর বেড়েই চলেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তা রকেটের গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর কর্তৃপক্ষ অন্ধ হয়ে প্রলয় বন্ধ করার প্রচেষ্টায়রত। একেবারে আবরার হত্যার মতো ঘটনা না হলে নজর দিতে চায় না। এখন আর শিক্ষার্থীরা সন্তান বিবেচিত হয় না, তা এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উপাচার্য পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সন্তান বিবেচিত না হলে শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হয় না। শিক্ষা-বাণিজ্যে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। শিক্ষকরা চাকরি করেন তাই দায়বদ্ধতা সীমিত।
সরকারের নীরবতা এই সংকটকে ঘনীভূত করছে। শুধু ‘মানসম্মত শিক্ষা চাই’ বা আরও নানাবিধ সুন্দর সুন্দর কথায় চিড়ে ভিজবে বলে মনে হয় না। আশু সমস্যার আশু সমাধান করেও সংকট উত্তরণ ঘটবে না। সমস্যার আন্তরিক সমাধান চাইলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে দল-মত-নির্বিশেষে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা, পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধের সংকট সর্বত্র ফুটে উঠছে। সবক্ষেত্রেই যেন সংযম আর সহমর্মিতার বড়ই অভাব। উত্তরণে মানবিকতার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী অনেক আগে একবার বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানির কথা বলেছিলেন। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানবিকতা শিক্ষার জন্য পরামর্শক দরকার। বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানি না করে প্রধানমন্ত্রী অনুগ্রহ করে মানবিক পরামর্শক বিষয়টির প্রতি নজর দিলে জাতি উপকৃত হবে। মানবিক পরামর্শ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানবিকতায় উদ্দীপ্ত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। সরকার চাইলে আমাদের জাতীয় অধ্যাপকদের কাছে এ ব্যাপারে সহায়তা চাইতে পারে। বিশ্বাস করি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট উত্তরণে এটা মুক্তির পথ। নিশ্চয়ই দেশের মঙ্গলকামী প্রবীণ শিক্ষাবিদদের সঙ্গে পর্যালোচনা এ ভাবনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। মানবিক শিক্ষা ছাড়া দেশপ্রেম, মানবপ্রেম সেবার আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে না। মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন দেশে মানবিক মানুষ তৈরিতে মানবিক পরামর্শক সংকট উত্তরণে সহায়ক হোক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
[email protected]
