বিটলসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য–জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার’র সঙ্গে মিললেন বব ডিলান। আছেন পণ্ডিত রবি শঙ্কর। সেই দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এখনো চমকে দেয়, শিশুদের পাশে দাঁড়ায় দেশে দেশে। লিখেছেন ওমর শাহেদ
n ১৯৭০ সালের নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের ৫ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে সাইক্লোন–ফিচার ছাপা হলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির ম্যাগাজিন রোলিং স্টোনে।
n পাকিস্তানিরা এরপর মানব বিপর্যয় ঘটালেন। ১৯৭১ সালে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এ আড়াই লাখ সাধারণ মানুষকে হত্যার গণনা সম্ভব হয়েছে।
n আক্রমণ শুরুর পর পাশের দেশ ভারতের পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতার দিকে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের একত্রে যাত্রা শুরু হলো।
n ৭০ লাখ মানুষ তখন বাড়িছাড়া হয়েছেন। তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে–খাবারের অভাবে মৃত্যু, কলেরার মতো মহামারী রোগের প্রাদুর্ভাব।
n পরিস্থিতি নিজের জন্মভূমি, গ্রাম ও আত্মীয়দের আক্রমণ করেছে–রবি শঙ্কর অনুভব করলেন। তিনি ভারতীয় সেতারবাদক ও সুরস্রষ্টা, নৃত্যগুরু উদয় শঙ্করের ভাই। বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। বাবা ব্যারিস্টার শিয়াম শঙ্কর চৌধুরীর জন্ম বাংলাদেশে, তার ভারতের বেনারসে। ভায়োলিন বাদক ইয়ুদি মেনুইন ও জর্জ হ্যারিসন তার ছাত্র, অনুসারী, বন্ধু।
n বিশ্বখ্যাত বাঙালি প্রখ্যাত বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ১৯৭১ সালের শুরুতে ফ্রায়ার পার্কে রাতের খাবারের সময় কথা বললেন। বলেছেন, ‘‘খবরগুলো পড়ে খুব দুঃখের মধ্যে ছিলাম। বলেছি, ‘‘জর্জ, এই হলো পরিস্থিতি। জানি, খবরগুলো তোমার উৎসাহের বিষয় নয়। ভালোভাবে সমস্যাগুলো ধরতেও পারবে না’; কিন্তু যখন আলাপ করলাম, সে খুব গভীরভাবে আন্দোলিত হলো। বলল, ‘হ্যাঁ, আমি মনে করি আমি কিছু করতে পারব।’ (রবি শঙ্কর : ১৯৭১)”
n ২০১১ সালের ২৮ জুলাই ৯১ বছরের হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের প্রখ্যাত সুরস্রষ্ট্রা রবি শঙ্কর, পণ্ডিত উপাধিতে সম্মানিত, কেবিই (নাইট কমান্ডার অর ড্যাম কমান্ডার অব দি মোস্ট এক্সিলেন্ট অর্ডার অব দি ব্রিটিশ আম্পায়ার) মনে করতে পেরেছিলেন, ‘আমি ছিলাম লস অ্যাঞ্জেলেসে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত একটি শহর), সেই শোচনীয় খারাপ খবরটি শুনলাম–১ লাখ শরণার্থী কলকাতার দিকে আসছে। তাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জানেন না। এর আগে এমন বিরাট সংখ্যার কথা জেনেছিলাম ভোলার সাইক্লোনের সময়। ১৯৭০ সালে তখন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম বাংলায় মোট ৫ লাখ লোক মারা গিয়েছিলেন। তার চেয়ে হাজার ভাগ বেশি মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছিলেন। এই দুর্যোগ এবং তার পরে পাকিস্তানি সরকারের কার্যক্রম পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ও পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে এবং ১৯৭১ সালে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। শরণার্থীদের দুঃসহ জীবনে আমি কিছু করার তাগিদ অনুভব করলাম। মনের এই ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে জর্জ (হ্যারিসন কয়েকদিনের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে এলেন) দেখলেন, আমি খুবই বিমর্ষ অবস্থায় আছি। তিনি সত্যিকারভাবে পূর্ব পাকিস্তানের সেই অবস্থা সম্পর্কে জানতেন। ফলে তাকে আমাকে সাহায্যের অনুরোধ করলাম। খুব দ্রুত তিনি তার বন্ধুদের ডাকলেন।’
n এপ্রিলে তিনি ও হ্যারিসন ‘রাগা’ নামের ছবির আবহ সংগীত তৈরিতে লস অ্যাঞ্জেলেসে কাজ করছেন। হ্যারিসন গান লিখলেন– ‘মিস ও ডেল’। তাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন; পশ্চিম থেকে সাহায্য হিসেবে চালের জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, ‘বম্বের বিপথে যেতে’।
n বেডফিঙ্গারের (ওয়ালশ ও ইংল্যান্ডের রক ব্যান্ড) ‘স্ট্রেটট আপ’ অ্যালবাম প্রযোজনা ও বিখ্যাত গায়ক জন লেননের ‘ইমাজিন’ অ্যালবামের আলোচনা সভার জন্য পণ্ডিত ইংল্যান্ডে ফিরলেন। খবরের কাগজ, ম্যাগাজিনের কাটিং রেখে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে আছেন।
n ১৯৭১ সালের জুনের শেষ দিকে ‘রাগা’ অ্যালবাম শেষ করতে হ্যারিসন লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরলেন। তাদের দেখা হলো।
n পাকিস্তানের সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (ভারতের গোয়া রাজ্যের ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারের, জন্মেছেন কর্নাটকের বেলাগামে, পড়েছেন পাকিস্তানের করাচিতে)’র প্রভাব বিস্তার করা লেখা ছাপাল লন্ডনের সানডে টাইমস। বাংলাদেশের ভয়ংকর নৃশংসতার ভয়াল চিত্রটি পুরো তুলে ধরল। পড়ে বিহ্বল শঙ্কর তার দেশের মানুষের কষ্ট দূর করতে হ্যারিসনকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন।
n পরের তিন মাস বিটলসের বিশ্বখ্যাত গায়কের কাটল টেলিফোনে আলাপে। আয়োজন করলেন ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। তথ্যটি বেশি প্রচলিত, প্রকল্পটি জুনের শেষ দিকে শুরু, পাঁচ কী ছয় সপ্তাহ আগে ঠিক হলো–১ আগস্ট হবে।
এমন পরিস্থিতিতে রবি শঙ্কর তার অলাভজনক এক কনসার্টের পুরো আয়োজন ও আয় থেকে গান, সুরের এই কনসার্টের মাধ্যমে ২৫ হাজার ডলার অনুদানের আশা করেছেন। অনুমানটি বিবিসির ‘দি গুন শো’র অভিনেতা পিটার শেলাসের।
n দি বিটলস অ্যাপেল করপোরেশনের কাজ, অঙ্গীকার, রেকর্ড ও সিনেমার আউলেটগুলোতে মাধ্যমে তাদের ভাবনাটি তাড়াতাড়িই তারকাখচিত মিউজিক্যাল ইভেন্ট হয়ে গেল। পশ্চিমের রক গানের (বিশ্বজুড়ে প্রচলিত এই গানের অর্থ ‘নাচের জন্য চড়া তালের গান’) সঙ্গে ভারতের ক্লাসিক্যাল সংগীত মিলল।
n আয়োজন হলো আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভেন্যু (অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট স্থান)–ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন, নিউ ইয়র্ক শহর, যুক্তরাষ্ট্র।
n গান ব্যবসার একজন প্রশাসক ও অ্যাপলের সাবেক কর্মকর্তা ক্রিস ও’ ডেল বলেন, ‘ধারণা চূড়ান্ত হওয়ার পর হ্যারিসন ও পণ্ডিত ফোন বন্ধ করে দিলেন। হ্যারিসন স্ত্রী প্যাটি বয়েডকে নিয়ে প্রবল উৎসাহে পারফরমেন্সের প্রস্তুতি নিলেন।’
n ভাবনাটির শুরু থেকে রিঙ্গো স্টার, জন লেনন, এরিক ক্ল্যাপটন, লিওন রাসেল, জিম কেটনার, কার্লস ভোম্যান, বিলি পিটারসন ও বেডফিঙ্গার ব্যান্ড যুক্ত ছিলেন।
n ১৯৯২ সালে হ্যারিসন বলেছেন, ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়েছিল রবির সঙ্গে আমার সম্পর্কের ফলে...বলেছিলাম, আমাকে যদি যুক্ত করতে চান, মনে করি, সত্যিকারভাবে হওয়াই ভালো। ফলে এমন মানুষদের যুক্ত করতে শুরু করেছি।’
n ও’ ডিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড হিলসের নিকোলাস ক্যানিয়নে হ্যারিসনের ভাড়া বাড়িতে বসে মার্কিন শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন।
n অনেক দূরে ফোন করে যেকোনো কিছুর চেয়ে, যে কারো চেয়ে বব ডিলানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চেষ্টা করলেন হ্যারিসন।
n তার প্রথম পছন্দের প্রায় সবার সঙ্গে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর হলো।
n যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের রক অ্যান্ড রোল, আরএনবি, ব্লুজ গানের অন্যতম সূত্রধর, উপস্থাপক, ধারক ডন নিক্সের সঙ্গে পুরো দিন হ্যারিসনের নৌকা ভ্রমণের ফল–পেছনের গায়ক, বাদকদের জোগাড় করতে পারলেন তারা।
n অভিবাসী ভারতীয় এক হস্তরেখাবিদ পরামর্শ দিলেন, আগস্টের শুরুই কনসার্ট মঞ্চে আনার ভালো সময়। এত কম সময়ের মধ্যে ম্যাডিসন স্কয়ার ১ আগস্ট খালি পাওয়া গেল।
n জুলাইয়ের প্রথমে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক স্টুডিওতে কনসার্টের জন্য লেখা ‘বাংলা দেশ’ সহ-প্রযোজক ফিল স্পেক্টরের হ্যারিসন সঙ্গে রেকর্ড করলেন। প্রথম কলিতেই তাকে রবি শঙ্করের সহযোগিতার অনুরোধ–‘আমার বন্ধু আমার কাছে তার চোখগুলোতে বেদনা নিয়ে এলেন/ তিনি আমাকে বললেন, তার দেশ মরে যাওয়ার আগে তিনি তার জন্য সাহায্য চান।’ এই কলিটি জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানকে এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনের কারণ অনুভব করাল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন জাতিসংঘ কী করবে।
n ১৩ জুলাই নিউ ইয়র্কে জন লেননকে দেখতে বিমানে চড়ার আগে ব্রিটেনের লন্ডনে বেডফিঙ্গারের সঙ্গে হ্যারিসন দেখা করলেন। বললেন, কনসার্ট ফর বাংলাদেশের জন্য তাদের ‘স্ট্রেটট আপ’ অ্যালবামের কাজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তার কনসার্টে তাদের আমন্ত্রণ জানালেন।
n জুলাইয়ের এই মাঝামাঝিতেই লস অ্যাঞ্জেলেসে আবার উড়ে এলেন। রবি শঙ্করের বাংলাদেশের সাহায্য তোলার জন্য ‘জয় বাংলা’ রেকর্ডের প্রসারিত অংশ প্রযোজনা করলেন।
n তারা সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ পেলেন–বিশ্বখ্যাত আলী আকবর খানের সরোদ (বিখ্যাত বাঙালি সরোদ বাদক আলাউদ্দিন খানের ছেলে। তাদের জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে), বিশ্বখ্যাত তবলা শিল্পী উস্তাদ আল্লা রাখা (পুরো নাম আল্লা রাখা কোরাইশি, জন্ম ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার জন্মু, কাশ্মীরে; পণ্ডিতের সংগীত সহচর)। তাদের রেকর্ডটি ও হ্যারিসনের ‘বাংলা দেশ’ গানের সব আয় তারপর থেকে প্রতিষ্ঠিত ‘জর্জ হ্যারিসন-রবি শঙ্কর স্পেশাল ইমার্জেন্সি রিলিফ ফান্ড (বিশেষ প্রয়োজনে মানুষের জন্য ত্রাণ তহবিল)’–এ যাচ্ছে। খরচ করছে ইউনিসেফ।
n তখন থেকে কনসার্টের আগ পর্যন্ত ‘জর্জ হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস (জর্জ হ্যারিসন ও বন্ধুরা)’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের পেছনের পাতাগুলোতে ছোট্ট বিজ্ঞাপন আকারে বেরুল।
সব টিকিট বিক্রি হতে মুহূর্ত দেরি হলো না। ফলে সেদিনই দ্বিতীয় শো আয়োজনের ঘোষণা এলো।
n জুলাইয়ে শেষদিকে সব পক্ষ নিউ ইয়র্কে রিহার্সালের জন্য চলে এলেন। হ্যারিসন পেছনের মেরুদন্ড খাড়া করলেন–কিবোর্ডে বিলি প্রিসটন, রিদমিক গিটার ও খঞ্জনিতে বেডফিঙ্গারের চার সদস্য; কার্লোস ভোম্যান ও জিম কেটনার নিজেদের বেজ ও ড্রামসে; স্যাক্সোফোনে জিম হর্ন হলিউডের হর্ন বা শৃঙ্গ); যুক্ত হলেন চাক ফিন্ডলি, জ্যাকি কেলোস, লো ম্যাকক্রিয়েনি।
n প্রতিষ্ঠিত তারকাদের মধ্যে লিওন রাসেলও আসার অঙ্গীকার করেছিলেন, কিন্তু নিজের ব্যান্ডের সঙ্গে আগের চুক্তিতে সাহায্য করতে হচ্ছিল।
n জোর দিয়ে এরিক ক্ল্যাপটন বলেছিলেন–থাকবেন। তবে তখন হেরোইনে আসক্ত (পরে চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছেন। তিনবার ‘দি রক অ্যান রোল হল অব ফেম’র একমাত্র গায়ক, জীবিত)। সবাইকে অবাক করে তাকেও যুক্ত করলেন হ্যারিসন।
n তার আগের দল বিটলসের জন লেননও বন্ধুর জোরালো অনুরোধে স্ত্রী ও সংগীত সাথী ইয়োকো ওনোকে না পেয়েও শুরুতেই আসতে রাজি হলেন। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে চুক্তি করলেন।
n রিঙ্গো স্টারের অঙ্গীকার জীবনে কোনোদিন প্রশ্নের মুখে পড়েনি। স্পেনের আলমেরিয়াতে তার ‘ব্লাইন্ডম্যান’ সিনেমার কাজ ফেলে চলে এলেন।
n পরস্পরকে ছেড়ে দেওয়ার পর বিটলসের আইনি সমস্যায় খারাপ অনুভূতির শিকার হয়ে পল ম্যাকার্টনি অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করলেন।
n একত্র হওয়ার পর হ্যারিসনরা পালিয়ে নিউ ইয়র্কের পার্ক লেন হোটেলে উঠলেন। থাকতে লাগলেন ও ২৬ জুলাই রিহার্সাল শুরু হলো নিউ ইয়র্কের অন্যতম প্রধান রাস্তা ওয়েস্ট ৫৭থ স্ট্রিটে শহরের ‘নোলা স্টুডিওস’তে।
n কনসার্টের গায়ক, বাদক, যন্ত্রশিল্পীদের সম্ভাব্য তালিকা হ্যারিসন লিখলেন। রবি শঙ্করের ‘জয় বাংলা’র কভার ডিজাইনগুলো করলেন। ১ আগস্ট যে গানগুলো গাইবেন, সেগুলোর মধ্যে বিটলসে তার বিখ্যাত ‘অল থিংস মাস্ট পাস (লিওন রাসেলের সঙ্গে)’, ‘আর্ট অব ডাইং’, মাত্রই রেকর্ড করা ‘ডিপ ব্লু’ রাখলেন। ক্ল্যাপটনের জন্য পছন্দ করলেন ‘লেট ইট রেইন’, ডিলানের জন্য ‘ইফ নট ফর ইউ’, ‘ওয়াচিং দি রিভার ফ্লো (সাম্প্রতিক একক, রাসেল প্রযোজিত), ‘ব্লো ইন দি উইন্ড’।
n প্রথম দিন নোলা স্টুডিওসতে এলেন হ্যারিসন, কার্লোস ভোম্যান, ছয় জনের হর্ন সেকশন ও বেডফিঙ্গারের– পিট হাম, জোয়ি মোল্যান্ড, টম ইভান্স ও মাইক গিবিন্স। পরের রিহার্সালগুলো হ্যারিসনের দেওয়া সময়ে হলো। কনসার্টের আগের দিন রিহার্সালে পুরো দল প্রথমবারের মতো এক হলো।
n ২৭ জুলাই মার্কিন ব্যবসায়ী, সংগীত প্রযোজক, লেখক প্রতিনিধি অ্যালেন ক্লাইনকে নিয়ে হ্যারিসন ও রবি শঙ্কর প্রথম দুই শোর সংবাদ সম্মেলন করলেন। সবার সামনে কথা বলতে না পারার জন্য বিখ্যাত হ্যারিসন পরে বলেছেন, ‘সে সময় নিয়ে ভাবলেই কাঁপুনি আসে।’
n রবি শঙ্করের দাতব্য একক রেকর্ড ‘জয় বাংলা’ যুক্তরাষ্ট্রে ২৮ জুলাই প্রকাশিত হলো। দুদিন পরে ব্রিটেনে।
n ২৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার রিঙ্গো স্টার এলেন। পরদিন যুক্তরাষ্ট্র ট্যুর বাদ দিয়ে চলে এলেন রাসেল। তার ব্যান্ডের ক্লডিয়া লিনিয়ার ও ডন প্রিসটন ডন নিক্সনের পেছনের বাদক দলে যুক্ত হলেন।
n ক্ল্যাপটনকে না পেলে জেসি অ্যাড ডেভিস (আদিবাসী আমেরিকান হল অব ফেমের ১৮তম বার্ষিকীতে পদক পেয়েছেন। বাজিয়েছেন ক্ল্যাপটন, লেনন ও হ্যারিসনের গানে। প্রিসটন ও রিঙ্গোর সঙ্গেও অনবদ্য। তাজমহল ব্যান্ডের গিটারিস্ট)’র নাম হ্যারিসনকে লিখতে হলো। ডেভিস ভোম্যানের কাছে শেষ মুহূর্তে শিখলেন।
n ৩১ জুলাই রাতে ডিলান ও এরিক ক্ল্যাপটন এলেন। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সাউন্ড চেক করে চূড়ান্ত রিহার্সাল হলো। ডিলানকে পাওয়া না পাওয়ার প্রচণ্ড টেনশন নিয়ে হ্যারিসন পরে বলেছেন, ‘সে আসবে কী আসবে না, যদিও আমার বিষয় নয়, তারপরও এর আগে এত বড় আয়োজন, বিপুল মানুষের সামনে বব ডিলান গায়নি; এত বড় কাজ সে করেনি।’
n এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের বন্ধুদের ডাকলেন জর্জ হ্যারিসন– ‘দি ব্যান্ড (কানাডিয়ান-আমেরিকান রক ব্যান্ড)’, ‘জোনাথন টাপলিন (বব ডিলান, দি ব্যান্ডের শুরুর কনসার্টের প্রযোজক; আরও অনেক কীর্তি আছে)’ কনসার্টের প্রডাকশন ম্যানেজার, ‘চিপ মাঙ্ক (১৯৬৯ সালের উডস্টক ফেস্টিভ্যালের মাস্টার লাইটম্যান)’ লাইট বিভাগের কর্ণধার হলেন।
n কনসার্টগুলো রেকর্ডের জন্য কাছের রেকর্ড প্লান্টের (নিউ ইয়র্কের প্রথম রেকর্ডিং স্টুডিও) অন্যতম মালিক গ্যারি ক্যালগ্রেনকে আমন্ত্রণ জানালেন। কনসার্ট ঘিরে সিনেমা বানানোতে প্রধান পরিচালক হলেন সল সুইমার (এই কনসার্টের জন্য বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। বিটলসের ১৯৭০ সালের ‘ লেট ইট বি’ প্রামাণ্যচিত্রের সহ-প্রযোজক), আলোকচিত্রী হলেন–টম উইলকস, ব্যারি ফেইনস্টেইন। জুটিটি হ্যারিসনের ১৯৭০ সালের তিন অ্যালবামের এক রেকর্ড ‘অল থিংকস মাস্ট পাস’-এর জন্য বিখ্যাত।
n স্টিফেন স্টিলের (২০১৩ সালে রোলিং স্টোনের তালিকায় সর্বকালের সেরা ১শ গিটারিস্টের একজন) মাধ্যমে কনসার্টের দুদিন আগে ৩০ জুলাই টিকিট বিক্রি শুরু হলো। শোর দিন হ্যারিসনের সঙ্গে তার অসুবিধা হলো।
n ১৯৬৬ সালে বিটলস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর টিকিটের দর্শকদের সামনে এটিই জর্জ হ্যারিসনের প্রথম কনসার্ট। ১৯৬৯ সালের পর বব ডিলানের প্রথম; রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা জ্যান উইনার পরে বলেছেন, ‘১৯৬৬ সালে বিটলসের কনসার্টের পর এটি নিউ ইয়র্কের সেরা কনসার্ট।’
n কনসার্টের উদ্দেশ্য হলো, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়া, পাকিস্তানের এই অংশের শরণার্থীদের জন্য অর্থ সাহায্য জোগাড় ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট গণহত্যা তুলে ধরা।
n আয়োজক হলেন, বিটলসের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক প্রধান গিটার বাদক ও কণ্ঠশিল্পী জর্জ হ্যারিসন; ভারতীয় সেতারবাদক, সংগীতজ্ঞ রবি শঙ্কর, পন্ডিত।
n শুরুতে হ্যারিসন দর্শকদের ভেতরে আসতে অনুরোধ করলেন। কনসার্ট শুরু করেছিলেন তিনি ভারতীয় ক্লাসিক্যাল মিউজিকে। রবি শঙ্কর, আলী আকবর খান, উস্তাদ আল্লা রাখা, তানপুরাতে কমলা চক্রবর্তী (১৯৬৭ থেকে ’৮১ পর্যন্ত রবি শঙ্করের স্ত্রী, ১৯৬৭ থেকে সত্তরের শেষ পর্যন্ত তানপুরা সহচর)কে একে একে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
n রবি শঙ্কর কনসার্টগুলোর উদ্দেশ্য জানালেন। চার সংগীতবিদ মিলে খেয়ালের মতো করে ঐতিহ্যবাহী ধুন পরিবেশন করলেন। সেটিই বিখ্যাত ‘বাংলা ধুন’। পরে তারা আরও এক পরিবেশনা করেছেন। হ্যারিসন বলেছেন, এক ঘণ্টার তিন ভাগের এক ভাগ তারা দুই শোতে ছিলেন, তবে তথ্যটিতে মাত্র ১৭ মিনিট আছেন।
n কনসার্টে দর্শকদের ভালোর সঙ্গে থাকার পুরো পরিষ্কার দেখেছেন সবাই। একবারই স্টেজ খালি করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের একটি টিভির তৈরি সিনেমা দেখানো হয়েছে–পূর্ব পাকিস্তানের শাসকদের অপরাধ ও সেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
n ফিল স্পেক্টর (কনসার্টের মাধ্যমে ‘ওয়াল অব সাউন্ড’ নামে গান বিক্রির পদ্ধতিই তৈরি করেছেন) ২০১১ সালে বলেছেন–‘এ তো জাদুর মতো ছিল, আগে কেউ এমন দেখেননি; এত তারকাকে টানা দুটি ঘণ্টা স্টেজে পাননি।’
দর্শকদের দিক থেকে তারা বজ্রপাতের মতো আওয়াজ পাচ্ছিলেন। সাময়িকভাবে তৈরি ব্যান্ড নিয়ে সামনে এলেন হ্যারিসন। তাতে বমি করে আসা রিঙ্গো, ক্ল্যাপটন, রাসেল, প্রিসটন, ভোম্যান, কেটনারসহ আরও ১৮ জন আছেন। পেছনে ফিল স্পেক্টর। তিনি বলেছেন, ‘অল থিংস মাস্ট পাস’ দিয়ে রক অর্কেস্ট্রা শুরু হলো। হ্যারিসন ওয়েস্টার্ন রক ধ্বনি ‘ওয়াহ-ওয়াহ’য় শুরু করলেন। বিটলসে তার ‘সামথিং’ গাইলেন। প্রভু যিশুর আদর্শের অনুসারী রক গায়ক তার ‘অ্যাওয়েটিং অন ইউ অল’ গাইলেন। স্পটলাইট প্রিসটনকে দিলেন। তিনি তার একমাত্র ‘দ্যাটস দ্য ওয়ে গড প্ল্যানড ইট’ গানটি গাইলেন। রিঙ্গোয় গলায় হলো ‘ইট ডোন’ট কাম ইজি’। ড্রামারকে তখনো তার এই একটি গান গায়কের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এরপর বিরতি। পুরো কনসার্ট সিডি, ডিভিডিতে আছে।
n কনসার্টের গানের ধরন হলো রক। জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবি শঙ্করের অলাভজনক এই জোড়া কনসার্টের নাম– ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। প্রথম শো শুরু হয়েছে দুপুর আড়াইটায়, পরেরটি রাত ৮টায়।
n ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ছিল এই পৃথিবীতে রক গানের প্রথম দাতব্য বা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ। বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত রক গানের মানে ‘নাচের জন্য চড়া তালের গান।’
n কনসার্টে গেয়েছেন, বাজিয়েছেন- দি বিটলসের তারকা– জর্জ হ্যারিসন, বিটলসের ড্রামবাদক স্যার রিঙ্গো স্টার, কেবিই (১৯৬০ সালে শুরু থেকে ১৯৭০ সালে ব্যান্ডটি ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত সদস্য), বিখ্যাত মার্কিন গায়ক বব ডিলান (সর্বকালের অন্যতম বেশি বিক্রীত গানের শিল্পী), ইংরেজ গায়ক, গীতিকার এরিক ক্ল্যাপটন, কেবিই, মার্কিন গায়ক, গীতিকার লেওন রাসেল (ষাটের অন্যতম বেশি বিক্রীত গানের শিল্পী, ১শর বেশি বিখ্যাত গায়কের সঙ্গী গায়ক)। ব্যান্ড ছিল–বেডফিঙ্গার।
n তাদের সবার, পৃথিবীতে প্রথম, দলবেঁধে, এক প্রাণে দাতব্যের বা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনন্য সেই উদ্যোগের নাম হলো ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।
n পণ্ডিত রবি শঙ্কর জর্জ হ্যারিসনকে ‘ছাত্র, ভাই ও সন্তান’ হিসেবে দেখতেন। তখন তিনি একজন একক সুপারস্টার হিসেবে ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে ছিলেন বলে জানিয়েছেন পণ্ডিত। হ্যারিসনের একার উপস্থিতিই একটি বিরাট সংগীতপ্রেমীদের মিলনমেলার জন্য যথেষ্টের বেশি ছিল আর তাদের মতো এমন মানুষের উপস্থিতি ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়েছে কনসার্টকে।
n হ্যারিসনের প্রথম স্ত্রী প্যাটি বয়েডের মতে, তখন হ্যারিসন ছিলেন পুরোপুরি নার্ভাস। নিজেকে এই তারকা গায়ক কনসার্ট আয়োজনের জন্য স্টিলের মতো শক্ত করে ফেলেছিলেন।
n বিশ্বখ্যাত তারকাদের সেই মিলনমেলাতে প্রতিটি দর্শকই আকাশে বিদ্যুতের মতো গান, সুরকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন, অনুভব করেছেন। ফলে হয়েছে প্রবল স্মৃতিময় ঘটনা। প্রচণ্ড অনুপ্রেরণাও কাজ করেছে সবার মধ্যে। সেখানে ছিল অনেক কথা, পেছনে, সেই সময়ে ও পরে অনেক অনেক ঘটনা, কাজ হয়েছে। আয়োজনের পর শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়েও অনেক বড় ছিল কনসার্ট। ফলে কোনোদিনও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেনি।
n ১ আগস্ট একরাতের মধ্যে সেই সময়েই কনসার্টটি তুলেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি।
তারপর একটি সিঙ্গেল (জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’), তিনটি অ্যালবামের একটি বড় অ্যালবাম এবং একটি সিনেমা হয়েছে কনসার্টের। পরে কনসার্টের মোট টাকা কেবল বাংলাদেশ নয়, ইউনিসেফের মাধ্যমে যেখানেই শিশুদের অসুবিধা– অ্যাঙ্গোলা থেকে রুয়ান্ডাতেও খরচ করা হয়েছে। ২০১১ সালে সেই টাকা খরচ হচ্ছিল চরমভাবে খাদ্যের অভাবে ভোগা হর্ন অব আফ্রিকাতে (একটি জলবেষ্টিত উপদ্বীপ)।
n তাছাড়াও ‘নিজে আরও ভালো থাকা’র যে খুব জনপ্রিয় বিশ্বাসটি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকেরা করেন, সে কারণে অন্যদের জন্য তারা ভালো কাজ করেন; তারও জন্মদাতা হ্যারিসনের বিরল এই উদ্যোগ।
n এখনো রক গানের যেকোনো ভালো ও খারাপভাবে আর্থিক সাহায্য তোলার ক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ হিসেবে শিল্পী, অন্যরাও এ কনসার্টকে বিবেচনা করেন। যেকোনো পরিষ্কার ও ভালো কাজের কারণ, একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং সেটির উত্তরাধিকার ছড়ানো; সেই সঙ্গে বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থাপনা, সীমা ছাড়ানো আচরণ ও অন্যদের প্রতি ইগোর সমস্যার ক্ষেত্রেও দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ থেকে সবাই শেখেন।
n কনসার্টকে উপস্থাপনা করা ও সেখানে গান পরিবেশন জীবনের অন্যতম সম্মান হিসেবে শুরু থেকেই মনে করেছেন হ্যারিসন। তবে পরে সেটির কী হবে জানতেন না। স্ত্রী প্যাটি বলেন–“যখন কনসার্ট চলছে, তখন মোট কত টাকা উঠতে পারে ধারণাতেও ছিল না তার। মনে করেছিলেন, ‘কিছু হয়তো ফুর্তিতে ব্যয় হবে।’ কোনোভাবেই ধারণার অতীত–এতটাই মর্যাদাপূর্ণ ছিল।” গায়ক, বাদকদের নিজের যোগ্যতা ও যোগাযোগে জোগাড় করতে পেরেছেন হ্যারিসন। বিটলসের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপল’র জনাথন ক্লাইড হ্যারিসনের বিধবা স্ত্রী অলিভিয়ার সঙ্গে এই কনসার্টের উত্তরাধিকারগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন– বলেছেন, কনসার্ট আয়োজনের পর সেই টাকা বাংলাদেশে পৌঁছেছে, যদিও যখন এই শরণার্থী, গরিব মানুষগুলোকে যখন সাহায্য করার প্রয়োজন ছিল সে সময় পৌঁছাতে পারেনি; এই বিরাট ভুলের কারণ–কনসার্টের আগে থেকে ইউনিসেফকে সঙ্গে রাখা হয়নি। ফলে আইআরএস (ইন্টার্নাল রেভিনিউ সার্ভিস–অন্ত রাজস্ব সেবা, যুক্তরাষ্ট্র) এই দাতব্য প্রতিষ্ঠান কনসার্টের সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে তাদের আয়কর কেটে নিলেন। যন্ত্রণাটি প্রচণ্ড ভুগিয়েছে হ্যারিসনকে। তিনি সত্যিই রেগে গিয়েছিলেন। আইআরএস ও জর্জ হ্যারিসনের মধ্যে বিবাদ অনেক বছর চলেছে। এখনো এ টাকার ওপর আইআরএস চওড়া ফলা বসাচ্ছে।
n জর্জ হ্যারিসনের অভিযাত্রীর মতো প্রথম শুরু করা এই কাজটির বিষয়ে যারা নানাকিছু করতে চান, করেন; তাদের জন্য অনেকগুলো শিক্ষা আছে ওপরের কর্মগুলোতে, জানিয়েছেন ‘দি ডিজাস্টার ইমারজেন্সি কমিটি (ডিইই)’র যোগাযোগ পরিচালক ব্রেন্ডান পাডি।
n নিজের অনেক সমস্যা নিয়েও অনুরণন তুলেছে কনসার্ট ষাটের দশকের আদর্শ–বব ডিলান, বিটলসের হ্যারিসন ও স্টারকে নিয়ে; যখন সংগীত বিশ্বকে বদলে দেওয়ার পাল্টা যথেষ্ট শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
n এই কনসার্টের ফলে বাংলাদেশ মানচিত্রে অবস্থান নিল– বলেছেন অ্যাপলের ক্লাইড। যে প্রজন্মটি নিজ দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন; তাদের কাছে অবিশ্বাস্য, অসাধারণ অর্থ নিয়ে এলো। তার মতে, তাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ভূমিকা রেখেছে।
n কনসার্ট ফর বাংলাদেশই হলো টিভি কভারেজ পাওয়া প্রথম গানের কনসার্ট। কনসার্টটির মাধ্যমেই সামাজিক কাজের সঙ্গে গায়ক ও সংগীতবিদদদের অংশগ্রহণ শুরু হলো, তারা দায়িত্ব বোধ করতে লাগলেন। দর্শকদেরও তখন থেকে তাদের গ্রহণের মানসিকতা শুরু হলো।
n কনসার্ট ভক্ত, সমালোচক, বাণিজ্য–সব বিচারে সফল। কনসার্টের পর প্রকাশিত হ্যারিসনের একক অসাধারণ গান ‘বাংলা দেশ’ তুমুল জনপ্রিয়। সারা বিশ্বে সবচেয়ে বিক্রি হওয়া ‘লাইভ অ্যালবাম’ এই কনসার্ট। তিন রেকর্ডের বাক্স সেটে অ্যাপল ফিল্ম’সের প্রামাণ্যচিত্র আছে। সবগুলোই ১৯৭২ সালের বড়দিনে বাজারে এসেছে। সল সুইমার সে বছর প্রকাশিত ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন।
n সেদিন কনসার্টে মোট ৪০ হাজার দর্শক ছিলেন। পুরো টাকাই ইউনিসেফে অনুদান হিসেবে গিয়েছে।
n ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত কনসার্টের অ্যালবাম, গান, লাইভ অ্যালবাম ও সিনেমাটি থেকে আনুমানিক মোট প্রায় ১.২ মিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করেছে। সেই টাকা বাংলাদেশ, নানা দেশে পাঠানো হয়েছে। পরে রিলিজ করা ডিভিডির টাকাও এই দি জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফে গিয়েছে।
n লাইভ অ্যালবামে তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময়ের ভারতীয় ক্লাসিক্যাল মিউজিক আছে। ২০০৫ সালে হ্যারিসনের মৃত্যুর চার বছর পর তিন অ্যালবামের সিডি সংশোধন করে একত্রে আবার প্রকাশ করা হলো। নতুন প্রামাণ্যচিত্রসহ সিনেমার ডিভিডিও সে বছর প্রকাশিত হলো। নাম ‘দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ রিভিজিটেড উইথ জর্জ হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’। তাতেও প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা অনেকের যুক্ততা ছিল। জাতিসংঘের তখন মহাসচিব কফি আনান, ‘ইউএস ফান্ড ফর ইউনিসেফ’র প্রেসিডেন্ট চার্লস লিওনস এবং লাইভ এইড’র প্রতিষ্ঠাতা বব গেডলফ কথা বলেছেন। ডিভিডি বিক্রির টাকাও ইউনিসেফের সেই ফান্ডে যায়।
n জর্জ হ্যারিসন, এমবিই ইংরেজ গায়ক, সংগীত রচয়িতা; বিটলসে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রবেশের জন্য বিশ্বসেরা ব্যান্ডদলটি ছাড়েন বলে কেউ কেউ মনে করেন। ২০০১ সালে ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুর পর তাকে হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে গোপনে দাহ করা হয় এবং দেহভষ্ম গঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
n ‘দি জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ’ ‘ইউনিসেফ ইউএসএ’ ও ‘দি জর্জ হ্যারিসন’র পরিবারের যৌথ পরিচালনায় চলে। বিশ্বখ্যাত গায়কের দানের টাকা আজও শিশুদের জীবন বাঁচায়– স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও জরুরি সাহায্যে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশের সঙ্গে ফান্ডের সারা জীবনের বন্ধন। ইউনিসেফের বিশ্বজুড়ে কাজেও ছড়িয়েছে। প্রায় ৫০ বছরে তারা সাহায্য করেছেন অ্যাঙ্গোলা, রুয়ান্ডা, ভারত, হাইতি ও ব্রাজিলের শিশুদের।
n এই কনসার্ট হলো মানুষের পাশে গানের শিল্পীদের প্রথম দাতব্য আয়োজন। কনসার্টের টাকা বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়, বন্যায় খরচ করেছে ইউনিসেফ।
n টিভিতে প্রচার করা বিশ্বের প্রথম কনসার্টের নাম এই দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।
n হ্যারিসন ও রবি শঙ্করের এই যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের পর বিটলসের চার সদস্য– জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রিসটন, লিওন রাসেলের দেখা ও গাওয়া হলো।
n হ্যারিসনের ‘বাংলা দেশ’ সিঙ্গেল (একক), লাইভ অ্যালবাম, সিনেমাতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের সারা বিশ্বের সাহায্যের জন্য আবেদন আছে।
n অবিশ্বাস্য আয়োজনের সফলতা সম্পর্কে কয়েক দশক পর পণ্ডিত রবি শঙ্কর বলেছেন, ‘এক দিনে, পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের নাম জেনে গেল। ছিল চমৎকার এক আয়োজন।’
n হ্যারিসনের বিখ্যাত ই কনসার্টের মাধ্যমেই ইউনিসেফ বাংলাদেশে কাজ করাতে বেশি দান ও সচেতনতার উপলব্ধি লাভ করে। কাজ শুরু করে। বিটলসের সদস্য, হ্যারিসনের সাথী স্যার রিঙ্গো স্টার ফান্ড প্রদানের সময় তার সঙ্গে ছিলেন। এখনো আছেন। ইউনিসেফের সমর্থক, কর্মী, দাতা ও অনুসারীদের বলেছেন, ‘দি জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফে আমাকে সাহায্য করুন। মাত্র ১০ ইউএস ডলার (আমাদের টাকায় এখন ৮৪৭) দান যেসব শিশুর প্রয়োজন, তাদের জীবনে বিরাট পার্থক্য এনে দিতে পারে। আপনার সমর্থন প্রদর্শন ও রিঙ্গো স্টারের ভালো কাজ এবং জর্জের স্মৃতির প্রতি তার ভালোবাসাকে সম্মান জানাতে জর্জ ও আমার ছবি ফেইসবুক প্রোফাইলে যুক্ত করুন, বন্ধুদের ট্যাগ করুন। শান্তি চিহ্নের পাশে সেলফি তুলুন। প্রোফাইলে দিন। ইউনিসেফের হ্যারিসন ফান্ডে ১০ ডলার দান করুন।’
পণ্ডিত রবি শঙ্করের মনে পড়ে, ‘আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না, এই কারণে তারা আমাদের কত সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছিলেন।
প্রচ্ছদ : কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলনে জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবি শঙ্কর ছবি : গেটি ইমেজেস
(উইকিপিডিয়া, গার্ডিয়ান, টাইম, ইউনিসেফ থেকে)
