বসুন্ধরায় তৈরি হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ ক্রীড়া কমপ্লেক্স

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৪২ এএম

ক্রিকেট, ফুটবল থেকে শুরু করে অনেক খেলাকেই দীর্ঘদিন ধরে পৃষ্ঠপোষণা দিয়ে আসছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ। এবার তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গড়ে তুলছে আধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি গড়ে উঠছে রাজধানীর বালু নদীর পাড় ঘেঁষে।

গতকাল শেষ বিকেলে স্বপ্নের এই প্রকল্প ঘুরে দেখালেন বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল বসতি পেরিয়ে অনেকটা পথ গেলেই এই কমপ্লেক্স। ২০০ বিঘা জমি নিয়ে গত জুনে শুরু হয় বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সর্ববৃহৎ মাল্টি-স্পোর্টস কমপ্লেক্স-বসুন্ধরা স্পোর্টস এরেনা। লক্ষ্য ২০২০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা। গতকাল দেখা গেল সবুজ ঘাসের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলাররা। এই মাঠেরই দুপাশে হবে ১০ হাজার আসন বিশিষ্ট গ্যালারি। এটাই হবে কিংসের হোম ভেন্যু। উত্তর পাশে কাজ চলছে ক্রিকেট মাঠের। আর দক্ষিণ দিকে হবে ৫০০ ক্রীড়াবিদের জন্য আবাসন, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম, হকি ফিল্ড, আরচারি রেঞ্জ, শুটিং রেঞ্জসহ আরও অনেক খেলার অবকাঠামো।

অলিম্পিক ভিলেজ করার যে স্বপ্ন বুকে লালন করে অনেক দিন ধরেই জমি খুঁজে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্তারা, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চলেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। দেশের প্রচলিত ও সম্ভাবনাময় প্রায় কুড়িটি খেলা এই কমপ্লেক্সে আয়োজন করা যাবে একযোগে।

অবকাঠামো সংকটে এদেশের খেলাধুলা দক্ষিণ এশিয়া পর্যায়েও রয়েছে পেছনের সারিতে। এই তো কিছুদিন আগে শেষ হওয়া এসএ গেমসের প্রস্তুতির ভেন্যু ও আবাসন ঠিক করতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয়েছে বিওএ-কে। অবকাঠামো সংকটের কারণে অনেক খেলাই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। একটা পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস কমপ্লেক্স বা ভিলেজের জন্য সরকারও জমি বরাদ্দ দিতে পারছে না বিওএকে। এ অবস্থায় দেশের সর্ববৃহৎ আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা কিংস নিয়েছে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ। নিজের জমিতেই তারা গড়ে তুলছে আধুনিক এক ক্রীড়া স্থাপনা, যেখানে কেবল ক্রিকেট, ফুটবলের মতো প্রচলিত ও জনপ্রিয় খেলা নয়, স্থান দেওয়া হয়েছে অনেক অপ্রচলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় খেলাগুলোকেও। এই প্রকল্পের দেখভালের প্রধান দায়িত্বে থাকা বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান জানালেন, ‘যেহেতু বসুন্ধরা কিংস একটা পেশাদার ক্লাব, তাদের জন্য একটি ফুটবল মাঠের চিন্তা থেকেই আসরে এ বছর জুনে আমরা মাঠ প্রস্তুতির কাজ শুরু করি। এর সঙ্গে যেহেতু ক্রিকেটের সঙ্গেও আমাদের সম্পৃক্ততা আছে। ভবিষ্যতে হয়তো কিংসও ক্রিকেটে আসতে পারে। আর আমাদের চেয়ারম্যান (আহমেদ আকবর সোবহান) নিজে একসময় হকি খেলতেন এবং তার বড় ভাই (আব্দুস সাদেক) একজন হকি কিংবদন্তি, তাই ক্রিকেট ও হকি ফিল্ড করার একটা পরিকল্পনা ছিল ফুটবলের পাশাপাশি। সে চিন্তা থেকেই আমরা ৫৫ বিঘার ওপরে কাজ শুরু করি। তখন আসলে আমরা ফুটবলের বড় স্টেডিয়ামের কথা ভাবিনি। একটা প্র্যাকটিস ফিল্ড করার ইচ্ছা ছিল। পরবর্তী সময়ে মনে হলো এটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম করে ফেললে এটাই হবে কিংসের হোম ভেন্যু, সেক্ষেত্রে হোম ভেন্যুর জন্য আমাদের বাইরে যেতে হবে না। তাই আমরা গ্যালারি করার চিন্তা করি। গ্যালারি করার ব্যাপারটি নিয়ে বসার পর ধীরে ধীরে জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ বিঘায়। দেশের প্রচলিত প্রায় সব খেলাই এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এখানে।’

দু’টি জোনে বিভক্ত করে তারা গড়ে তুলছে এই স্বপ্নের প্রকল্প। উত্তর জোনের প্রায় সত্তরভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। দক্ষিণ জোনেও ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। পুরো কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিক দিয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি লেক। যা সংযুক্ত হবে বালু নদীর সঙ্গে। দক্ষিণ জোনে নির্মাণ করা হবে ১৫ হাজার আসন বিশিষ্ট আধুনিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ক্রিকেট প্র্যাকটিস ফিল্ড, ক্রিকেট নেট, ফুটবল প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড, হকি ফিল্ড, টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল, ভলিবল, কারাতে কোর্ট, ফুটসাল কোর্ট, অ্যাকাডেমি ও ক্লাব ভবন, ক্যাফেটারিয়া, শুটিং রেঞ্জ, কারাতে, তায়কোয়ান্দো, জুডো, ইয়োগার মতো খেলার জন্য একটি মাল্টি-পারপাস স্টুডিও, ইনডোর গেমস রুম, ট্রেনিং রুম, ডরমেটরি, গলফ ড্রাইভিং রেঞ্জ, আরচারি রেঞ্জ এবং একটি ল্যান্ডস্কেপ পার্ক। ইমরুল বলেন, ‘দক্ষিণ জোনে আমরা সবুজায়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। পার্ক থাকছে, যাতে করে গোটা দিন কেউ এখানে এসে কাটাতে পারেন।’

উত্তর জোনে ফুটবল স্টেডিয়াম, ২৫০০ আসন বিশিষ্ট ক্রিকেট গ্রাউন্ড, ইনডোর কমপ্লেক্স, ২৫ ও ৫০ মিটার সুইমিং পুল, স্কোয়াশ কোর্ট, ক্যাফেটেরিয়া, জিমন্যাসিয়াম এবং একটি স্পোর্টস মিউজিয়াম। কমপ্লেক্সের ধার ঘেঁষেই ২ বিঘা জমির ওপর স্থাপন করা হবে বিশাল মসজিদ এবং একটি আধুনিক শপিং সেন্টার। ইমরুল বলেন, ‘শপিং সেন্টারে ফুটকোর্ট, সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে সবকিছুই থাকবে।’

তো, বিশাল এই যজ্ঞ গড়ে তোলার উদ্দেশ্য কী? উত্তরে ইমরুল বললেন, ‘আমরা যেহেতু করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সবকিছুতেই আমরা ব্যবসাকে গুরুত্ব দিই। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান চাইলে আমাদের এসব ক্রীড়া স্থাপনা ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করতে পারবে। তাছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মানুষও চাইলে এটা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এটা নির্মাণে আমাদের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লগ্নি করতে হচ্ছে। বিনিয়োগের তুলনায় আয় হয়তো একেবারেই নগণ্য হবে। ধরে নিতে পারেন এটা আমরা করছি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই।’ ইমরুল আরও বিশ্বাস করেন এই কমপ্লেক্স জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বড় ভূমিকা রাখতে পারে যদি সরকার এবং ফেডারেশনগুলো চায়, ‘এরকম একটা উদ্যোগ কেবল বেসরকারি পর্যায়ে নয়, সরকারি পর্যায় থেকেও খুব বেশি নিতে দেখা যায়নি। কয়েকটি বিকেএসপি ছাড়া এরকম মাল্টি-পারপাস স্পোর্টস কমপ্লেক্স দেশের কোথাও নেই। সরকার, বিওএ এবং ফেডারেশনগুলো চাইলে এই কমপ্লেক্স ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারেÑ তাদের অবশ্যই আমরা সহযোগিতা করব। এই কমপ্লেক্স ভবিষ্যতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ভূমিকা রাখতে পারলে সেখানেই আমাদের সার্থকতা।’

এর মধ্যেই ক্রীড়াঙ্গনে পৃষ্ঠপোষণার জন্য সমাদৃত হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ফুটবলে কেবল নিজেদের নয়, তারা আর্থিক পৃষ্ঠপোষণা দিচ্ছে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবকে। ক্রিকেটে তারা বিপিএলের দল রংপুর রাইডার্সের মালিক। এর বাইরে গলফ, কাবাডি, হকিসহ বিভিন্ন খেলায় নিয়মিতই পৃষ্ঠপোষণা দিচ্ছে তারা। এবার স্বনামধন্য আর্কিটেক্ট প্রতিষ্ঠান ভলিউম জিরো আর্কিটেক্সসকে দিয়ে তারা নির্মাণ করছে বিশাল ক্রীড়া স্থাপনা। ভবিষ্যতে এই কমপ্লেক্স দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত