এতদিন সহকর্মীদের সঙ্গে হাসি-তামাশা আর বন্ধুর মতো সময় পার করেছেন। এবার পদোন্নতি পেয়ে হয়ে গেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বস হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হতে হবে সেই বন্ধু-সমতুল্য সহকর্মীদের দলনেতা। তারা কি আপনাকে মানবেন দলনেতা হিসেবে? নিজের এই অবস্থানকে মজবুত করার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার জন্য রইল দশ পরামর্শ। পরামর্শ দিলেন ব্রিজ ইনস্টিটিউট অব ট্রেনিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আখতারুজ্জামান
এক. নিজেকে বন্ধু-সমতুল্য জায়গাটি থেকে চট করে সরাবেন না। যেমন তাদের খুব কাছে ছিলেন, তেমন কাছাকাছিই থাকুন। আপনার পদোন্নতি যেমন আপনার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন আনছে, তেমনি আপনার সহকর্মীদের মধ্যেও এনেছে পরিবর্তন। ফলে কয়েকটা দিন এই পরিবর্তনটাকে সামলে নেওয়ার জন্য সময় দিন। ধীরে লক্ষ করুন আপনার সাবেক সহকর্মীদের কার মধ্যে কেমন পরিবর্তন এসেছে। কে আপনাকে মেনে নিচ্ছে আর কার মধ্যে অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে_ ভালো করে লক্ষ করুন।
দুই. অল্প সময়ের মধ্যেই আপনাকে আপনার ভূমিকায় কাজ শুরু করতে হবে। আর এ জন্য চাই আপনার ভেতর নেতৃত্বের গুণাগুণ। বয়সের পার্থক্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। সহকর্মীরা প্রায়ই সমবয়সী হয় বলে বস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নিজের বাহ্যিক চেহারা ও পোশাকে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে আসুন। আপনি ভালোভাবে খেয়াল করলে আপনার বসের এবং তার বসের মধ্যে এই পোশাকি পার্থক্যটা খেয়াল করতে পারবেন।
তিন. ক্ষমতা কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠাতা। কেউ ক্ষমতার ব্যবহার করেন, কেউ করেন অপব্যবহার। কেউ কেউ আছেন যাদের দুটোর কোনোটাই করতে হয় না। বস তার নিজের ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগান। তার দক্ষতা আর নেতৃত্বের বলে দলকে পরিচালিত করেন। সবাই তার নির্দেশ মেনে চলেন। এবার আপনি কোনটা করবেন, সেটা আপনার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তবে একটা সূত্র আছে। প্রথমত, ক্ষমতার ব্যবহার না করেই দল পরিচালনা করার চেষ্টা করুন। দ্বিতীয়ত, আপনি ক্ষমতা ব্যবহার করতে জানেন সেটা বুঝিয়ে দিন। তৃতীয় স্তরে গিয়ে ক্ষমতার ব্যবহার করুন। বস হওয়া মানেই ক্ষমতা দেখানো নয়, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। এতে দলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
চার. নিজেকে ধীরে ধীরে বসের চেহারায় নিয়ে যান। একজন ভালো বসের গুণে গুণান্বিত হওয়ার চেষ্টা করুন। যাতে আপনার সাবেক সহকর্মীরা আপনার বিপক্ষে যেতে না পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
পাঁচ. ঈর্ষা আমাদের সবারই আছে। আপনার পদোন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হতে পারেন অনেকেই। এটা মারাত্মক কোনো অপরাধ নয়। এ জন্য আপনি মন খারাপ করবেন না। এটা স্বাভাবিক। তাদের বিষয়টি মেনে নেওয়ার জন্য সময় দিন। এই সহানুভূতিশীল মনোভাব জরুরি। আবার লক্ষ রাখবেন, কেউ যেন এটাকে আপনার দুর্বলতা ভেবে না বসেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে আসল চেহারায় কিছুটা হলেও ফিরতে হবে।
ছয়. বস হিসেবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আপনার বসেরও ভূমিকা অনেক। দল সামলাতে সমস্যা হলে আপনার বসেরও সাহায্য নিতে পারেন। তবে সেটা শুরুতেই নয়। সমস্যা সীমা অতিক্রম করতে পারে মনে হলে আপনার বসকে জানাবেন।
সাত. সহকর্মীদের সবাই আপনাকে মেনে নেবেন, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। দু-একজনকে সব সময় পাবেন, যারা কখনোই আপনাকে মেনে নিতে পারবেন না। তাদের ভেতর কেউ কেউ আপনার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, এমনকি শত্রুও হয়ে উঠতে পারেন। মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে এবং বসকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখতে হবে বিষয়টি। প্রয়োজনে এ ধরনের এক বা একাধিক অধস্তন কর্মীকে বরখাস্তও করতে হতে পারে।
আট. মিটিং ও কাউন্সেলিং ক্ষেত্রবিশেষে সাহায্য করে। যারা আপনাকে মেনে নিতে পারছেন না তাদের ব্যাপারে শুরুতে নমনীয় আচরণ করুন। তারপর বুঝিয়ে বলুন। একান্তে মিটিং করুন। তারপর কাউন্সেলিং করুন। এরপও যদি কাজ না হয় তাহলে বসকে জানান। বসকে দিয়ে কাউন্সেলিং করান। অফিসের মানবসম্পদ বিভাগও কাউন্সেলিং করতে পারে। তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে পলিসি অনুয়ায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
নয়. একজন বস হিসেবে আপনারও আছে দায়বদ্ধতা। আপনাকেও আপনার দল নিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যারা আপনার অবাধ্য হচ্ছেন, তাদেরও বুঝতে হবে এই ধারাবাহিক চেইন অব কমান্ড যদি কেউ না বুঝতে পারে তাহলে সেটা তার ব্যর্থতা, আপনার নয় এবং তার পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে। আপনার কাজ হচ্ছে ধৈর্য ধরে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
দশ. একজন ভালো বস একজন ভালো কোচের মতো। একজন দক্ষ বস একজন মেন্টর। দলের প্রত্যেকটি সদস্যের সমস্যা তাকে বুঝতে হয়। যখন একই অবস্থানে ছিলেন, তখন নিশ্চয়ই দেখেছেন কার চরিত্র কেমন। কে কীসে খুশি হয় বা দুঃখ পায়। ফলে দলের সঙ্গে মিশে গিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা শ্রেষ্ঠ উপায়।
