সিলেটের টিলাগড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র চালুর পর থেকে কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫টি প্রাণী মারা গেছে বলে জানা গেছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে এ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ আর অব্যবস্থাপনার কারণে এখানকার প্রাণী মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া অবাধ যান চলাচল ও প্রাণীদের উপযুক্ত খাবার না থাকায়ও প্রাণীদের মৃত্যু।
সংরক্ষণ কেন্দ্রের অস্থায়ী চিকিৎসক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, সব চিড়িয়াখানায় হরিণের জন্য সমতল ভূমিতে শেড নির্মাণ করা হয়। অথচ এখানে টিলাভূমিতে হরিণ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই পাখিগুলোর জন্য সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু যেখানে পাখির শেড তৈরি করা হয়েছে সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছে না। ফলে পাখিরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকটি মারাও গেছে।
এ রকম নানা পরিকল্পনাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সংরক্ষণকেন্দ্রের স্থাপনাগুলো কোনো প্রাণীবিদ বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নানা ত্রুটি রয়েছে। ফলে নিয়মিত মারা যাচ্ছে এখানকার প্রাণী।
সিলেট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে এ পর্যন্ত একটি হরিণ, একটি অজগর, তিনটি ময়ূর, ৭টি লাভবার্ড, ২টি বাজিগর পাখি, চুকার পেকটিস পাখি ১টি, ২টি কালিম পাখি, থাইল্যান্ডের কৈকাপ মাছ ২টি, খরগোশ ১টিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ অন্তত ২৫ প্রাণী মারা গেছে।
২০১৮ সালের ২ নভেম্বর সিলেট নগরীর টিলাগড় ইকোপার্কে এই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়। এর আগে এখানে নিয়ে আসা হয় ৯ প্রজাতির ৫৮টি প্রাণী। পরে আরও ১৩ টি প্রাণী আনা হয়। বর্তমানে আছে ৪৬টি প্রাণী।
সংরক্ষণ কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে অবাধে চলাচল করে যানবাহন। রাতেও যানবাহন চলাচল করায় শব্দের কারণে প্রাণীরা ঘুমাতে পারে না। কেন্দ্রের ভেতর দিয়েই আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষজনের যাতায়াতের পথ। হর্ন বাজানোতেও কোনো বিধিনিষেধ নেই। এমনকি, কেন্দ্রের ভেতরেই করা হয়েছে দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এতে চরম শব্দ ও বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে এখানকার প্রাণীগুলো।
কেন্দ্রের দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যানবাহনের অবাধ যাতায়াতে শব্দ ও বায়ু দূষণের কারণেও মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী। এছাড়া প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য স্থায়ীভাবে প্রশিক্ষিত কোনো জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সিলেট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের অস্থায়ী প্রাণিশালা রক্ষক মাসুদ হাওলাদার বলেন, এখানকার প্রাণীদের রক্ষা করতে হলে সবার আগে বনের ভেতরের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। সব সময় গাড়ি চলাচল করে এখানে। যার ফলে প্রাণীরা ঘুমাতে পারে না।
ছোট ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত খাঁচায় আবদ্ধ থাকা এবং এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এসে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে মারা যাচ্ছে এখানকার প্রাণী। এসব সমস্যার কারণে এই কেন্দ্রে প্রাণীদের প্রজননও হচ্ছে না।
বর্তমানে এই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য তানহা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
তানহা এন্টারপ্রাইজের পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয়দের বনের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারসহ সকলের সহযোগিতা দরকার। রাত ১১টার পর গাড়ি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয়দের প্রভাবের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে এই সংরক্ষণ কেন্দ্রটি করা হয়েছে। তাই প্রাণীদের ক্ষতি হচ্ছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল বাসেত বলেন, এটি তৈরিই করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। শেডগুলো প্রাণীবান্ধব নয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সংরক্ষণ কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে অবাধে যান চলাচল। এটি বন্ধ করতে না পারলে প্রাণী বাঁচানো যাবে না।
এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, গাড়ি চলাচল বন্ধ করা সম্ভব না হলেও সীমিত করার ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করছি। এছাড়া এখানে চিকিৎসক, প্রাণিশালা রক্ষকসহ কিছু পদে স্থায়ী লোকবল নিয়োগের চেষ্টা করছি।
সূত্র: দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
