ঢাকার কেরানীগঞ্জে ফের একটি রাসায়নিক কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোন প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
রবিবার বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে জিঞ্জিরা ইউনিয়নের পূর্ব বন্দ ডাকপাড়া এলাকায় ঘটা বিস্ফোরণের শব্দে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বিস্ফোরণে প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে ভবনগুলোর জানালাসহ কাচের সকল জিনিস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আশপাশের বাড়ি ঘরের লোকজন প্রথমে ভূমিকম্প মনে করে ছুটোছুটি করতে থাকে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, র্যাব, উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ সময় উৎসুক কয়েক হাজার মানুষ কদমতলী-নবাবগঞ্জ মহাসড়কে ভিড় জমায়। এতে সড়কের দুপাশে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় কোন নিহতের ঘটনা না ঘটলেও ছুটোছুটি করতে গিয়ে প্রায় ১০ জনের মতো আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিক ভাবে বিস্ফোরণের কারণ জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। ঘটনার পর থেকে ভবন মালিক ও কেমিক্যাল গুদামের মালিক হাজি মো. মারুফ হোসেনের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে ।
বিস্ফোরিত গুদামের পাশের বাইজীদ স্টিল আলমিরা কারখানার শ্রমিক মো. টুটুল জানান, গুদামঘরটি প্রায় ৮/৯ বছর ধরে এখানে রয়েছে। দিনের বেলা সব সময় তালাবদ্ধই থাকে। শুনেছি রাতের বেলা মাঝে মধ্যে খোলা হয়, তবে তখন আমরা থাকি না। তারা কি কাজ করে বলতেও পারি না।
তিনি বলেন, আজকে সকালে আমরা আমাদের কারখানায় কাজ করছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। প্রথমে মনে করেছি ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়েছে। এরপর আরও দুটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। চারপাশে প্রচুর ধোয়া ও বাজে গন্ধ তৈরি হয়। আমরা কেউ কিছু না দেখেই ছোটাছুটি করে যে যার মতো নিরাপদ দূরত্বে চলে যাই। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে নারী ও শিশুদের ডাক চিৎকার শুনতে পাই।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, সেখানে মারুফ হোসেনের তিনটি রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ঘর পাশাপাশি অবস্থিতে। গুদামের জায়গাটিও তার নামেই। গুদামঘর গুলোর পাশেই রয়েছে বসতবাড়ি, স্টিলের আলমারি তৈরির কারখানা, টিনের সিটের দোকান, একটি স্কুল। তিনটি ঘরের আয়তন প্রায় ১০ হাজার স্কয়ার ফিট। গুদামগুলোতে সোডিয়াম থায়ো, ম্যাংগানিজ সালফেট মনোহাইড্রেট ও ম্যাগনেশিয়াম ক্লোরাইড এর বস্তা পরে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে দুটি গুদাম বিস্ফোরিত হয়েছে একটি গুদাম অক্ষত অবস্থায় আছে।
বিস্ফোরিত গুদামটিতে প্রায় ১৫ ফিট গর্ত হয়ে গেছে। আশপাশের অনেক বাড়িঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ১ কিলোমিটার জুড়ে দুই শতাধিক বাড়ি, অফিস আদালত, মসজিদ এর থাই জানালার কাচ ভেঙে যায়। ফাটল দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকটি ভবনে। গুদাম ঘরের পাশেই ইডেন গার্ডেন একাডেমি নামে একটি স্কুল। বিকট শব্দে স্কুলের বাচ্চারা ভয় পেয়ে লোকজনের সহায়তায় বের হয়ে যায়।
জিঞ্জিরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাকুর হোসেন সাকু জানান, গত সপ্তাহে আমি এ কেমিক্যাল গুদাম সম্পর্কে জানতে পেরে মালিককে নোটিশ দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে গুদামটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলি। গুদামঘরটি সরিয়ে নেওয়ার আগেই এ দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মোস্তফা মোহসীন বলেন, ধারণা করা হচ্ছে সোডিয়াম থায়ো থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এগুলো মূলত ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার (কেরানীগঞ্জ) সাইফুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন ও ধোয়া নিয়ন্ত্রণে আনে। আল্লাহর রহমতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।
তিনি পারো বলেন, মালিক পক্ষের কোন লোকজন না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরি মান জানা যায়নি।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার অমিত দেবনাথ জানান, গুদামঘরটি সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স পর্যন্ত ছিল না। বিস্ফোরিত গুদাম ঘরের পাশে থাকা হাজী নাসিরের বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় বাড়ির ভাড়াটিয়াদের আপাতত অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে যাচাই বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুর্ঘটনায় কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় হিজলতলা এলাকায় প্রাইম পেট নামে একটি প্লাস্টিকের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩২ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে ২২ জন মারা যায়। মাস না পার হতেই আবারও ঘটল বড় দুর্ঘটনা।
