পাক সেনাশাসক জিয়াউল হকের ওপর লেখা উপন্যাস নিয়ে তুলকালাম

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২০, ০৮:১৪ পিএম

পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের ওপর লেখা উপন্যাসের উর্দু অনুবাদ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। বইগুলোর সব কপি জব্দ করেছে দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী।

২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় পাক বংশোদ্ভূত বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক মোহাম্মদ হানিফের  প্রথম উপন্যাস ‘অ্যা কেস অব এক্সপ্লোডিং ম্যাংগোস’।

জিয়াউল হককে নিয়ে লেখা উপন্যাসটির উর্দু অনুবাদ ‘ফাটতে আমৌ কা কেইস’ প্রকাশ হওয়ার পরপরই সেটি জব্দ করে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।

পাকিস্তানের বিখ্যাত দানিয়াল প্রকাশনীর অফিসে জোরপূর্বক প্রবেশ করে অনূদিত এ বইয়ের সব কপি নিয়ে গেছে আইএসআইয়ের সদস্যরা পরিচয়ে আসা লোকজন।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটার এবং ফেসবুকে পাঠক ও এক্টিভিস্টদের নানা হাস্যরস ছড়িয়ে পড়েছে। 

মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘গত সপ্তায় পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের ছেলে ইজাজুল হকের পক্ষ থেকে মানহানির একটি নোটিশ আসে। এতে দাবি করা হয় এ উপন্যাসের মাধ্যমে আমি জেনারেল জিয়ার দুর্নাম করেছি।’

বিবিসি উর্দু বিভাগের সাবেক প্রধান এই সাংবাদিক বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে জানান, কোনো প্রমাণ দেখানো ছাড়াই একদল লোক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র পরিচয় দিয়ে তার বই ‘ফাটতে আমৌ কা কেইস’ এর সব কপি নিয়ে গেছে। প্রকাশনী সংস্থা ‘দানিয়াল’ এর ম্যানেজারকে হুমকি দিয়ে বলেছে  এই বইয়ের বিরুদ্ধে নতুন রাষ্ট্রীয় অর্ডিয়েন্স নিয়ে আবারও আসবে।

প্রসঙ্গত, ‘মাকতাবায়ে দানিয়াল’ পাকিস্তানের নামকরা প্রকাশনী সংস্থা, যারা ইতিপূর্বে বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যক্তিত্ব হাবিব জালিব, ইফতেখার আরিফ, মুশতাক আহমদ ইউসুফিসহ গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের বই প্রকাশ করেছে। দেশে বিদেশে তারা এসব বইয়ের পরিবেশকও।

মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘১১ বছর আগে বইটি প্রকাশ হয়েছিল। প্রকাশের পর থেকে এতদিন পর্যন্ত এ বই নিয়ে আমাকে কেউ কিছু বলেনি। তো এখন কেন? আমি এখানে বসে বসে অপেক্ষা করছি কবে ওরা এখানে আসবে।’

মোহাম্মদ হানিফ বিবিসিকে জানান, তিনি ইজাজুল হকের নোটিশের জবাব প্রস্তুত করছিলেন। তিনি বলেন,‘এটা জানা দরকার ওই লোকগুলোর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক রয়েছে।’

হানিফ প্রশ্ন করেন,‘আইএসআই কি একজন ব্যক্তির জন্য এই সব করছে?’

আইএসআই কী কারণে এই কাজ করল বিবিসি তার কাছে জানতে চাইলে হানিফ বলেন,‘মনে হচ্ছে ওরা কিছু আগ্রহী পাঠকদের ভয় দেখাতে চাইছে।’

বইটির উর্দু অনুবাদক সাইয়েদ কাশিফ রেজা তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য তিনি নিজেও একজন উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কিন্তু জবাব দেওয়ার আগেই গোয়েন্দা সংস্থা  প্রকাশকের কাছ থেকে অনূদিত বইয়ের সব কপি নিয়ে গেছে।’

পাকিস্তানে ব্রিটিশ প্রকাশনা সংস্থা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমিনা সাইয়েদ বলেন, ‘মোহাম্মদ হানিফের বইটা ১১ বছর আগে প্রকাশ হয়েছিল, কিন্তু এত দিন পর্যন্ত সাহিত্যমহল বা অন্য কোথাও এমন কোনো প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়নি বইটির।’

আমিনা সাইয়েদ বেশ কয়েক বছর অক্সফোর্ড প্রেসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাকে করাচি লিটারেচর ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘এই সব পরিস্থিতিতে প্রকাশক বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। এমনটা হওয়া উচিত না। প্রকাশকের স্বাধীনতা থাকা উচিত।’

এই সাহিত্যবোদ্ধা আরও বলেন, ‘উর্দু পাঠকের সংখ্যাটা বেশ বড়। তাদের কেউ কেউ ভয় পান। দ্বিতীয় কথা হলো, ইদানীং খুব বেশিই বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। দুঃখজনক ব্যাপার। এটি তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এটা চলতে পারে না।’

আমিনা সাইয়েদের মতে, এই ঘটনায় মানুষের এ বইয়ের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। যার বইটার প্রতি সামান্য আগ্রহও ছিল না সে-ও এখন নিশ্চিত বইটা পড়বে। যে কোনো উপায়েই তারা বই সংগ্রহ করে নেবেন।

মোহাম্মদ হানিফের টুইটের পর তার রিপ্লেতে মাজিদ খান গত বছরের লিট ফেস্টের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘আমার মনে আছে, আপনি বলেছিলেন এই বইটা প্রকাশের দশ বছর হয়ে গেল অথচ এখনো কোনো বাধা আসেনি। আমি তখন বলেছিলাম, আপনার জানা নেই, আকছার কথা দশ বছর পর ওদের বুঝে আসে। সেই কালো কৌতুক আজ সত্য হয়ে গেল।’

সাংবাদিক হাসান জাইদি সাবেক জেনারেল জিয়াউল হকের পুত্রের মানহানির নোটিশ পাঠ করে বলেন,‘একটা কথা তো প্রমাণ হলো, ইজাজুল হক ইংরেজি পড়েন না!’

বামপন্থী রাজনীতিক আমজাদ রাশিদ বলেন,‘বইটি ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত তা ইংরেজি বলাদের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, উর্দু অনুবাদটা এখন এমন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যে, একে ঠেকানো জরুরি হয়ে পড়েছে।’

রস ও খোঁচার জন্য পরিচিত টুইটার অ্যাকাউন্ট ‘রেন্টিং পাকিস্তানি’ লিখেছে,‘মোহাম্মদ হানিফের বইটা টিভি সিরিজ হওয়ার খুব নিকটেই ছিল, কিন্তু প্রতি পাতায় পাতায় লেখক 'পাকিস্তানি আর্মি সর্বোত্তম আর্মি' কথাটা লেখতে ভুলে গেছেন।’

সংসদ সদস্য মুহসিন দাউড় বলছেন, ‘বিশ্বের একজন বিখ্যাত লেখকের বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা প্রমাণ করে তরবারির চেয়েও কলম শক্তিশালী।’

বিমান বাহিনীর পাইলট থেকে সাংবাদিক হয়ে ওঠা মোহাম্মদ হানিফ ছিলেন বিবিসি উর্দু বিভাগের সাবেক প্রধান।

রস ও তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গে ভরপুর ‘অ্যা কেস অব এক্সপ্লোডিং ম্যাংগোস’ ২০০৯ সালে বইটি কমনওয়েলথ পুরস্কার লাভ করে।

এটির পর মোহাম্মদ হানিফের আরও অন্য তিনটি উপন্যাস বের হয়- আওয়ার ল্যাডি অব অ্যালিস ভাট্টি (২০১১), দ্য বেলুচ হু ইজ নট মিসিং অ্যান্ড আদার্স হু আর (২০১৩) এবং রেড বার্ডস (২০১৮)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত