তোমরা দুপুরে আসিও, তোমাদেরও ভাগ দেব। এই কথার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল শিশু বয়সেই আমাদের। এ হলো সেই বিখ্যাত টোনা-টুনির গল্প। গল্পটা এমন ছিল, টোনা একদিন টুনিকে বলল, টুনি পিঠা তৈরি করো। টুনি বলেছিল, পিঠা তৈরি করা কি এত সোজা! পিঠা তৈরি করতে গেলে চাল লাগে, গুড় লাগে, তেল লাগে, লাকড়ি লাগে, আগুন জ্বালাতে হয়। এসব আগে জোগাড় করো, তবেই না পিঠা তৈরি করতে পারব। টুনির ধমক বা পরামর্শ শুনে টোনা তাই চলল পিঠার উপকরণ জোগাড় করতে। বনে ঘুরে ঘুরে এসব জোগাড় করতে গিয়ে দেখা হলো বাঘ ও শিয়ালের সঙ্গে। এরা আকৃতিতে, শক্তিতে, বুদ্ধিতে টোনার চেয়ে অনেক বড়। টোনার ব্যস্ততা দেখে ওরা জিজ্ঞেস করল, টোনা কী করো? টোনা তাদের জানাল, টুনির নির্দেশে পিঠার সরঞ্জাম জোগাড় করতে সে এসেছে। পিঠা তৈরির কথা শুনে বাঘ ও শিয়াল টোনাকে বলল, আমাদের দাওয়াত দেবে না? ভদ্রতাবশত টোনা সবাইকে দাওয়াত দিয়ে বলল, তোমরা দুপুরে আসিও, তোমাদেরও ভাগ দেব। বাসায় এসে টোনা যখন টুনিকে বলল, সে বনের প্রায় সবাইকেই দাওয়াত দিয়ে এসেছে, তখন তো টুনির মাথায় হাত। টোনা উৎসাহের আতিশয্যে সবাইকে দাওয়াত দিয়েই ফেলেছে, এখন এত অতিথিকে কীভাবে সামাল দেবে টুনি? কথা তো দিয়েছি, তাহলে এখন কী করা! একটা কায়দা-কৌশল তো বের করতে হবে। অতঃপর দুজনেই বসে সিদ্ধান্ত নিল, তারা আগেই পিঠা তৈরি করে খেয়ে-দেয়ে গাছের আগায় বসে থাকবে। দুপুরে বনের সবাই এসে দেখে টোনা-টুনি নেই, পিঠাও নেই। পড়ে আছে চুলা আর পিঠা তৈরির কিছু চিহ্ন। সবাইকে এভাবে ধোঁকা দিতে পেরে টোনা-টুনি তো মহাখুশি। সবাইকে ঠকিয়ে নিজেরা পিঠা খেয়ে বিজয়ের আনন্দে টোনা-টুনি গাছের মগডালে বসে ডেকে উঠল টুন টুন টুন।
এই গল্প পড়ে আনন্দিত হয়ে ভেবেছি, দেখলে টোনা-টুনির কত বুদ্ধি। কত বড় বড় প্রাণীকে বুদ্ধির মারপ্যাঁচে হারিয়ে দিল এত ছোট এই পাখি। ছোটবেলার শিক্ষা নাকি স্থায়ী হয়। এই শিক্ষা যে কত স্থায়ী হয়ে গিয়েছে আমাদের জাতির জীবনে, তা এখন হাড়ে হাড়ে প্রত্যক্ষ করছি। মানুষকে ঠকানো সহজ কাজ নয়, এতে যোগ্যতা লাগে। যারা ঠকাতে পারে তারা শুধু যোগ্য নন, তারা সফলও বটে। এ ধরনের সফল মানুষ হওয়ার জন্য কি নিরন্তর সাধনাই না চলছে চারদিকে! এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নম্বর বাড়ানোর জন্য অনৈতিক পথে অগ্রসর হওয়া, অন্যজনের গবেষণাপত্র নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার নজির যেমন দেখছি, আমরা তেমনি খাদ্য-ওষুধে যা থাকার কথা তা না দিয়ে ভেজাল ওষুধ বানানো, খাদ্যে ভেজাল, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জাল করে চাকরি নেওয়া বা চাকরির সময়সীমা বাড়ানো, বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ করে এনে তাদের সম্মাননা মেডেলে সোনার পরিবর্তে খাদ মেশানোÑ এসব কত কিছুই না চলছে। নিজে কতটা জয়ী হলাম তার চেয়েও অন্যকে পরাজিত করা বা কৌশলে হারিয়ে দেওয়ার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, তার নির্লজ্জ প্রয়োগ ঘটতে দেখছি আমরা চারদিকে। কেউ কেউ আবার বলেন, চোখের সামনে কাউকে আছাড় পড়তে দেখলে আমাদের মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, তার চেয়ে প্রাণখোলা হাসি আর আনন্দ নাকি আর নেই। ন্যায়-অন্যায়ের বিবেচনার চেয়ে যেকোনোভাবেই নিজের স্বার্থ আদায় করতে হবে এটাই নাকি এখন বাস্তবমুখী শিক্ষা। এই শিক্ষার কার্যকর প্রয়োগ হলো, যেকোনো কৌশলে অন্যকে পরাজিত করতে হবে। লজ্জা পাওয়া নয় বরং ঘুষ খাওয়া এবং দুর্নীতি করতে পারাটাও এখন যোগ্যতার ব্যাপার। পাশাপাশি এর মধ্যে ভাগ্যকে টেনে এনে অনেকেই বলেন, দেখেছো এই অল্প দিনেই কত উন্নতি করে ফেলল। সবই কপাল! এই কপালওয়ালারা আবার বিভিন্ন সামাজিক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদেও সম্মানের সঙ্গে স্থান পেয়ে যান। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং অনুষ্ঠানেও তাদের বড় পদ নিশ্চিত। বড় গলায় কথা বলা যেন তাদের অধিকার আর মাথা নেড়ে ও হেসে হেসে তাদের সব কথায় সম্মতি জানানো কিংবা কেউ যদি তা করতে না চান তাহলে কষ্ট মাথা নিচু করে থাকা যেন তার দায়িত্ব। তা না হলে নিজের জান বা মান বাঁচানো কষ্টকর।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এটাই চরিত্র। সমাজব্যবস্থা তৈরি করে দেয় ব্যক্তির চরিত্রের কাঠামো। অর্থনীতিতে বড় পুঁজি গিলে খায় ছোট পুঁজিকে আর ক্রমাগত আরও বড় হতে থাকে। বিশ্বব্যাপী এটাই চলছে। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, ২০১৯ সালে মাত্র ২ হাজার ১৫৩ জন শীর্ষ ধনীর কাছে ৪৬০ কোটি মানুষের সম্পদের চেয়ে বেশি পরিমাণ সম্পদ ছিল। প্রশ্ন কি উঠে না, কোথা থেকে এলো তাদের এসব সম্পদ? সম্পদ তো এমনি এমনি তৈরি হয় না। সম্পদ তৈরি করতে মানুষের শ্রম লাগে। তাহলে কি এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে যে, অনেকে মিলে যে সম্পদ তৈরি করেছে, তা কোনো এক সামাজিক ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়ার কারণে অল্প কিছু মানুষের হাতে গিয়ে জমা হয়েছে। কিন্তু এই কথা বা হিসাবটা যে সহজে সাধারণ মানুষ ধরতে পারবে, তার কোনো উপায় রাখা হয়নি। বরং সহজবোধ্য উত্তর তৈরি করতে অনেক পরিশ্রম করছেন সমাজপতিরা। কিছু মানুষ খুবই উদ্যমী, পরিশ্রমী, সুযোগের ব্যবহার করতে জানেন, নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে পারেন, তাই তারা এত দ্রুত সম্পদের মালিক হতে পেরেছেন। উদ্যমহীন, অলস ও বোকারা তো গরিব থাকবেই। এর সঙ্গে সেসব প্রশ্নের একমাত্র কার্যকর উত্তর, কপাল ভাই কপাল। অযোগ্যতা অথবা অদৃষ্ট এই ভেবে নিজের অসহায়ত্ব বা অন্যের সাফল্যকে মেনে নেওয়ার সহজ পথেই মানুষকে পরিচালিত করার শিক্ষা দেওয়া হয় সর্বত্র। দেশেও তাই, যখন দেখে ২ বছরে ১০ হাজারের বেশি নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে, তখনো কারণ খুঁজে বের করার চেয়ে মেনে নেওয়ার মানসিকতা প্রবল হয়ে দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, এসব সফল মানুষের কাছে কাছে থেকে যদি কিছু ছিটেফোঁটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের আখের গোছানো যায়, সেই পথ এবং পরামর্শ পছন্দ করে এখন অনেকেই। এসব করতে না পারা নাকি বোকামি আর অযোগ্যতা।
এত গেল অর্থনীতির কথা, সম্পদ বানানোর কথা। রাজনীতিতে এর প্রভাব কী? অর্থনীতি এমন রূপ নিলে রাজনীতি কি ভিন্ন রূপ নিতে পারবে? অল্প মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার অর্থনীতির মতো রাজনীতির ক্ষমতাও কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে মুষ্টিমেয়র হাতে। অর্থনীতি, রাজনীতি এমন হলে সংস্কৃতিটা কেমন হবে? চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির তত্ত্বের মতো চেটে খাওয়ার সংস্কৃতিও কি তৈরি হয় না! গোগ্রাসে খাচ্ছে, দ্রুত গতিতে চিবোচ্ছে একজন বিশালদেহী মানুষ আর তার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসছে দু-একটা খাদ্যকণা। এই উচ্ছিষ্ট নিয়ে অনেকে হুড়োহুড়ি করছে এ দৃশ্য কল্পনা করতে গা ঘিনঘিন করলেও এ ধরনের প্রতিযোগিতা কি চলছে না? প্রতিরোধ করাত পরের কথা, প্রত্যাখ্যান করার শক্তি যেন কমে যাচ্ছে দিন দিন। কেউ আবার অতি-উৎসাহী হয়ে বিরোধিতাকারীদের একহাত নিয়ে থাকেন। অনেক শুনেছি, এসব নীতিবাগীশ কথাবার্তার কোনো ভাত নেই বা ছাড়ুন এসব বলে থামিয়ে দিতে চান দুর্বল বা মৃদু প্রতিবাদের কণ্ঠকে। নিজের সম্মান নিজে বাঁচাতে তাই সেই আপ্তবাক্য যে সহে সে রহে মনে করে চুপ করে থাকেন অনেকেই।
তা মনে দুঃখ নিয়ে বা ভয় পেয়ে নীরবেই মেনে নিলেন না হয় অনেকেই। কিন্তু শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি আর সংস্কৃতির মিলিত প্রভাব পড়বে না কি নির্বাচনেও? নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ বলে যত কথাই বলা হোক না কেন, গণতন্ত্রহীন নির্বাচনেই যেন উৎসাহ প্রবল। নির্বাচনে প্রধান পক্ষ হওয়ার কথা ছিল ভোটারদের কিন্তু তারা এখন দর্শকের ভূমিকায়। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে লক্ষ করা যাচ্ছে, দর্শকের সংখ্যাও দিন দিন যেন কমছে। নির্বাচনী মঞ্চে টেনেটুনে ৪০ শতাংশ দর্শক আনতে পারাটাই নির্বাচন কমিশনের যেন মহাসাফল্য। একটুও ভাবতে চাইছেন না কেন দর্শক কমে যাচ্ছে। একদা বাংলাদেশে যে নির্বাচনকে তুলনা করা হতো উৎসবের সঙ্গে, তা এখন উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থী, প্রতীক, প্রচার ও পয়সার মধ্যে টাকা-পয়সার ভূমিকাই এখন মুখ্য। প্রতিযোগিতা অনেক আগেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে, এখন তাতেও সংকট। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষিত নিয়ম মানছে না কেউ। এই নিয়ম বা আচরণবিধি না মানাটা আবার নির্ভর করে কে ক্ষমতায় আছে তার ওপর। যিনি ক্ষমতা থেকে যত দূরে নিয়ম তার জন্য তত কঠোর। নির্বাচন কমিশন জোর গলায় বলছে, তাদের চোখ-কান খোলা আছে কিন্তু তারা দেখছেন কিংবা শুনছেন কি না সে ব্যাপারে ঘোরতর সন্দেহ আছে। আবার দেখলে ও শুনলেও কিছু করবেন কি না নিশ্চিত নয়। অন্তত নিকট অতীত ইতিহাস সেটাই বলে। তাদের গলার জোর আর কাজের গতির মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাই নির্বাচন নিয়ে সংশয় তীব্র হতে হতে সেই শিশুকালের টোনা-টুনির গল্প মনে পড়ে যায়। মহা-আড়ম্বরে পিঠা তৈরির আয়োজন, সবাইকেই আমন্ত্রণ, সময়মতো সবাই এসে উপস্থিত হওয়ার আগেই পিঠা খেয়ে বিজয়ীর হাসি। নীতিতে নয় কৌশলে সবাইকে হারিয়ে দেওয়ার ছেলেবেলার সে শিক্ষার প্রভাব সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও কি পড়বে?
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
