তীব্র ব্যথা, চোখে কান্না নিয়ে ইমন লড়েছেন দেশের জন্য

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৭:০০ পিএম

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালের কোন মুহূর্তটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দিচ্ছে? ভারতকে হারিয়ে যুবাদের বিশ্বজয়ের পর ম্যাচের প্রতিটি ক্ষণই তো এখন মনের ফটোফ্রেমে বন্দী হয়ে থাকতে চাইছে। বাংলার ডাকাবুকো যুবাদের বোলিং-ফিল্ডিংয়ে কী দুর্দান্ত শরীরী ভাষা! অধিনায়ক আকবর আলীর বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও ব্যাটিংয়ে ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং। কোনো মুহূর্তকেই ছেড়ে দিতে চায় না মন।

তবে যদি ভাবেন ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়ার পরও আবার ফিরে এসে পারভেজ হোসেন ইমনের সাহসী ব্যাটিংয়ের কথা, তখন?

শুধু ‘সাহসী ব্যাটিং’! ইমন যা করেছেন এই এক শব্দে তা বোঝানোর সাধ্য কার! দলের প্রয়োজনে ব্যাটিংয়ে নামলেও তীব্র ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। মাত্র ১৭ বছরের একটা ছেলে, তবু কী দৃঢ় তার মনোবল। দৌড়াতে পারছিলেন না, তবু মাথা নোয়াবার নন।

প্রচণ্ড স্নায়ু চাপের সেই মুহূর্তে পারভেজ ইমনের লড়াইটা দেখেছেন সবাই। কিন্তু তার কষ্টটা কি টের পেয়েছেন?

দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুম থেকে ইমন তার লড়াকু ইনিংসের গল্প শুনিয়েছেন দেশ রূপান্তরকে।

জানালেন, ব্যথায় কান্না আসছিল তার, দৌড়াতে পারছিলেন না। তবু হাল ছাড়েননি ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের মুখের দিকে তাকিয়ে। সঙ্গে মনে জেগেছিল দেশপ্রেম।

ভারতের দেওয়া ১৭৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দুই বাঁহাতি ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন ও তানজিদ হাসানের ব্যাটে দারুণ শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তারা দুজনে যোগ করেন ৫০ রান। কিন্তু ১৩তম ওভারে (দলীয় ৬২ রানে) যখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় উইকেট পড়ে, তখন ইমনকেও মাঠ ছড়তে হয় চোটের কারণে।

এক সঙ্গে দুই নতুন ব্যাটসম্যান আসেন উইকেটে। ওদিকে ভারতের লেগ স্পিনার রবি বিষনোই তখন ভয়ংকর হয়ে উঠলেন। তৌহিদ হৃদয়, শাহাদাত হোসেন উইকেটে থিতু হওয়ার আগেই ফিরলেন ড্রেসিংরুমে। এরপর শামীম হোসেন ও অভিষেক দাসও ফিরে আসেন দ্রুত।

১০২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে তখন ব্যাকফুটে বাংলাদেশ। দলের এ বিপদে শরীরের ব্যথাকে তুচ্ছ করে ফের ব্যাটিংয়ে নামেন ইমন।

দ্বিতীয় দফায় উইকেটে এসে আকবরের সঙ্গে গড়লেন ৪১ রানের জুটি। চোট নিয়ে যখন মাঠ ছেড়েছিলেন তখন তার নামের পাশে ছিল ২৫। পরে ফিরে আরো ২২ রান। বাংলাদেশের ইনিংসের সর্বোচ্চ রানটি ইমনেরই। ৭৯ বলে ৭ চারে ৪৭। দ্বিতীয় দফায় ফিরে এসে ৩৪ বল খেলে মেরেছেন ৩টি চার।

ইমন তার মাঠ ছেড়ে যাওয়া ও আবার ফিরে আসার গল্প বললেন এভাবে, ‘হাঁটতে পারছিলাম না। কষ্ট করে মাঠ থেকে বের হয়ে ড্রেসিংরুম পর্যন্ত যাই। তাও বের হতে মন চাইছিল না। কারণ ভারতের খেলোয়াড়দের অশ্লীল গালাগালির জন্য...। তাও নিজের মাথা ঠান্ডা রেখে চিন্তা করলাম ৩০ মিনিট ব্রেক নিলে হয়তো পারব।’

কিন্তু ইমন ড্রেসিং রুমে যেতে না যেতেই তো পাল্টে গেল ম্যাচের রং। যা ইমনকে ভীত করে ‍তোলে, ‘ভয় লাগছিল। ওদের লেগ স্পিনার যে বল করছিল (রবি বিষ্ণনোই) ওকে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ভালো খেলতে পারত। ডানহাতিদের জন্য ও ভয়ের ছিল। হৃদয় ভাই আর দীপুর (শাহাদাত হোসেন) আউট আমাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। কারণ তখন আমি রেডি ছিলাম না। আইস বাথ করার পরে কাঁপছিল আমার শরীর।’

ইমন বলে যান, ‘এদিকে একের পর এক আউট। নিজেকে নিজে বললাম পারব আমি...। আমরা বিশ্বকাপ খেলতে আসি আমাদের জাতীয় পতাকাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে। দেশের জন্য আমরা যে কোনো সময় যে কোনো কিছু করতে রাজি। এই জিনিসটা মাথায় কাজ করল। তারপর নেমে পড়লাম ব্যাটিংয়ে।’

উইকেটে সেট হয়ে যাওয়া আকবরকে সাপোর্ট দেওয়াই লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন ইমন। যেমনটা ২০১৮ এশিয়া কাপে তামিম ইকবাল ভাঙা হাত নিয়ে করেছিলেন।

ইমন জানালেন ব্যথায় একপর্যায়ে কান্না আসছিল তার। বললেন ‘চেষ্টা ছিল আকবর ভাইকে সাপোর্ট দেওয়া। দিয়ে ছিলামও। কিন্তু জোরে দৌড়াতে পারছিলাম না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। কিছু কিছু সময় কষ্টে কান্না আসছিল।’

সেই সময় ইমন প্রেরণা নিয়েছেন ড্রেসিং রুমের দিকে তাকিয়ে, ‘ড্রেসিং রুমের দিকে তাকালে মনে হয় এই মানুষগুলো এত দিন কষ্ট করে আসছে। আজকে আমাকে শেষ করে আসতে হবে।’

এমন লড়াকু ইনিংস খেললেও শেষটা করতে পারেননি বলে এখনো আক্ষেপ ইমনের মনে, ‘পারিনি পুরোটা শেষ করতে। পুরো শেষ করতে পারলে হয়তো ভালো লাগত।’

নিজের ব্যথাকে মনের জোরে দমিয়ে দেশ আর সতীর্থদের জন্য জয়ের যে পথ তৈরি করেছেন ইমন, তার এই ইনিংস কীভাবে ভুলবে বাংলাদেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত