পাবনার চাটমোহরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে উচ্চশব্দে মাইকে গান বাজনা ও নাচানাচি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
প্রশিক্ষণের নামে দিনের পর দিন শিক্ষা অফিসারের এমন কাণ্ডে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার শাস্তি দাবি করেছে এলাকাবাসী ও পার্শ্ববর্তী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে পাবনার চাটমোহর পৌর শহরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি) ভবনে গিয়ে দেখা যায় সাউন্ডবক্সে উচ্চশব্দে বাজছে হিন্দি গান। সঙ্গে চলছিল নাচানাচিও।
একই সময়ে ইউআরসি কার্যালয়ের পাশেই চাটমোহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান চলছিল। উচ্চশব্দের এমন গানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত হলেও কিছু বলার উপায় ছিল না।
কারণ, সেখানে নাচ-গান করছিলেন খোদ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল ইসলামসহ সহকারী শিক্ষা অফিসাররা। উদ্দাম নৃত্যে মেতেছিলেন কয়েকজন নারী শিক্ষকও।
তবে হঠাৎ গণমাধ্যম কর্মীদের ওই ভবনে প্রবেশ করতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় গান-বাজনা ও নাচানাচি।
নাচানাচির কারণ জানতে চাইলে তারা জানালেন, বিষয় ভিত্তিক বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ের ওপর ছয় দিনের প্রশিক্ষণ চলছে সেখানে। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই গত কয়েক মাস ধরে ইউআরসি ভবনে চলছে গান-বাজনা ও নাচানাচি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাস থেকে ইউআরসি ভবনে শুরু হয়েছে বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ। এতে অংশ নিচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা।
সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এই প্রশিক্ষণ। কিন্তু প্রশিক্ষণ চলাকালীন সেখানে দলবল নিয়ে হাজির থাকেন শিক্ষা অফিসার আশরাফুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষা অফিসার কামরুল ইসলাম, ফরিদুজ্জামান, আনোয়ার হোসেন এবং সহকারী ইনস্ট্রাক্টর কল্যাণ কুমার।
শুধু তারাই নয়, এতে আরও শামিল হন শিক্ষা অফিসারের পছন্দের বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। কোনো নিয়মনীতি না মেনে প্রতিদিনই শুরু হয় উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্সে গান। পাশাপাশি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে চলে নাচ।
যারা নাচ-গান করতে পারে না তাদের প্রশিক্ষণে নাম দেন না শিক্ষা অফিসার মো. আশরাফুল ইসলাম এমন অভিযোগ অনেকের। এছাড়া উচ্চশব্দে গান বাজানো নিয়ে আশপাশের বাসিন্দারাও ক্ষুব্ধ। স্থানীয়রা বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ হয়নি।
শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়দের অসুবিধার কথা স্বীকার করে সহকারী প্রশিক্ষক কল্যাণ কুমার সরকার বলেন, ‘গান করার নিয়ম আছে। তবে নাচানাচি করার সুযোগ নেই।’
তাহলে কেন নাচানাচি হয় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা করা ঠিক হয়নি। তবে শিক্ষা অফিসার স্যার থাকেন তো। সেখানে কিছু বলা যায় না।’
কর্মকর্তাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ইনস্ট্রাক্টর মো. মাহমুদুল হাসানও। তিনি প্রতিবাদ করলেও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে পেরে ওঠেন না। তিনি বলেন, ‘যারা এসব করে তাদেরকে বহুবার বারণ করা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ শোনেন না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, গত কয়েক দিন আগে আমার বাবা অসুস্থ ছিলেন। তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত। ইউআরসি ভবন থেকে উচ্চশব্দের গানের আওয়াজ আসায় অসুস্থ বাবার সমস্যা হচ্ছিল।
তিনি জানান, পাশের স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় ব্যাঘাত হয়। তাই বারণ করতে গিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছে যা সত্যিই দুঃখজনক। একজন প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হয়ে কীভাবে তিনি এমন করেন!
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ট্রেনিংয়ের কার্যক্রম হিসেবে গান করা হয়। আর গানের তালে তো একটু নাচানাচি হয়ই।
তিনি বলেন, ইউআরসি ভবন এবং স্কুলটি একসঙ্গে হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের কিছু সমস্যা হয়। তাই বলে তো আর ট্রেনিং বন্ধ করা যায় না। তবে এরপর থেকে বিষয়গুলো মেনে চলা হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার মুনসুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও দিনে রিসিভ করেননি।
চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরকার মোহাম্মদ রায়হান বলেন, ‘শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণের নামে বিশৃঙ্খলার বিষয়টি আমি গুরুত্বসহকারে দেখছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
