প্রথমে প্রেমের ফাঁদ পেতে বিয়ে। এরপর টাকা আত্মসাৎ করতে স্ত্রী নিজেই তার স্বামীকে অপহরণ করে। এরপর দাবি করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। অপহরণের পর টাকার জন্য মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনসহ পুরুষাঙ্গে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে স্ত্রীর প্রেমিকা অভিত, শ্যালক পাপ্পুসহ অন্য অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে।
পরে দ্রুত টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে অপহৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেয় তারা। যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ দিকে ছেলের ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখে স্ট্রোক করেন মা।
অপহরণকারীদের হাত থেকে পালিয়ে এসে নির্যাতিত ওই প্রবাসী নারায়ণগঞ্জে র্যাব ১১’র কাছে অভিযোগ দেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী চক্রের চার সদস্যকে নরসিংদী থেকে আটক করে র্যাব।
আটকরা হলো প্রবাসীর স্ত্রী মারিয়া আক্তার মন্টি (২৩), অভিত মিয়া (২৮), পাপ্পু মিয়া (২৮) ও বাদল মিয়া (৫৮)।
ভুক্তভোগীর নাম রাসেল। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বাসিন্দা। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির চক্রের মূল হোতা রাসেলের স্ত্রী মন্টি প্রতারণার জন্য এ পর্যন্ত অন্তত ৮/১০টি বিয়ে করেছে বলে জানা গেছে।
শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১’র সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিনিয়র সহকারী পরিচালক আলেপ উদ্দিন, পিপিএম।
তিনি জানান, আটকরা সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা বিভিন্ন এলাকার বিত্তবান ব্যক্তিদের কৌশলে অপহরণের পর শারীরিক নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে থাকে।
রাসেলের স্ত্রী মন্টি এর আগে একাধিক বিয়ে করে ওই স্বামীদেরও একইভাবে নির্যাতন ও জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে র্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
রাসলের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তার স্ত্রী মন্টি, শ্বশুর ও স্ত্রীর বড় ভাইয়ের পরিকল্পনায় অর্থ আদায় করতে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।
মূলত সৌদিপ্রবাসী রাসেলের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে মন্টি তাকে বিয়ে করে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব আরো জানায়, একই উদ্দেশ্যে ২৮ ডিসেম্বর ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ে অপহরণকারী চক্রের সাত-আটজন ব্যক্তি রাসেলকে নরসিংদী আদালতের সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। পরে রাসেলকে তারা অচেতন করে একটি ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে শারীরিক নির্যাতন চালায়। টাকার জন্য ম্যাচ লাইট দিয়ে পুরুষাঙ্গে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে দ্রুত টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
একপর্যায়ে রাসেলের পরিবারের সঙ্গে দুই লাখ টাকা দফারফা হলে বিকাশের মাধ্যমে ষাট হাজার টাকা আদায় করে অপহরণকারীরা। অবশিষ্ট টাকা আদায় করতে পরদিন ২৯ ডিসেম্বর তারা রাসেলকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে বের হয়। মাঝপথে রাসেল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বললে তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়।
এ সময় রাসেল ডাকাত বলে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে অপহরণকারীরা রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে অপহরণকারীরা রাসেলকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে ভাইরাল করে এবং মামলা না করতে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। কিছুদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে রাসেল নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১ কার্যালয়ে এসে অপহরণের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব চারজনকে আটক করে।
আটকদের বিরুদ্ধে নরসিংদী থানায় মামলার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে র্যাব জানায়, এই অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত অন্যান্য সদস্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নির্যাতিত রাসেল গণমাধ্যমের কাছে তাকে নির্যাতনের ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেন।
তিনি জানান, ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পরিবারকে না জানিয়ে মন্টিকে বিয়ে করেন তিনি। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সৌদি আরবে চাকরি নিয়ে চলে যান। বিদেশ গিয়ে বাবা আবদুল হককে বিয়ের কথা জানান রাসেল। পরে পুত্রবধূ মন্টিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান রাসেলের মা-বাবা। গত বছরের এপ্রিল মাসে দেশে ফেরেন রাসেল। এক মাস থাকার পর গত বছরের মে মাসে আবার সৌদিতে চলে যান তিনি।
সৌদি যাওয়ার পর রাসেলকে তার স্ত্রী মন্টি জানান, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু রাসেলের মা-বাবা জানান, মন্টি তাদের না জানিয়ে নরসিংদীতে তার বাবার বাড়ি চলে গেছেন। যাওয়ার সময় গয়না, মোবাইল নিয়ে গেছেন।
এ খবর পেয়ে রাসেল ১৩ সেপ্টেম্বর আবার দেশে আসেন। মন্টির বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, তার গর্ভপাত হয়েছে। এর চার দিন পর নরসিংদী সদর থানায় রাসেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন মন্টি আক্তার।
এ মামলায় রাসেল কারাভোগও করেন। জামিনে আসার পর নানাভাবে রাসেলকে হয়রানি করতে থাকে মন্টির পরিবার। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর তাকে ডিবি পরিচয় দিয়ে অভিত, পাপ্পু মিয়াসহ কয়েক ব্যক্তি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ওঠানোর সঙ্গে সঙ্গে সিটের নিচে নিয়ে মারধর করে।
