দেশের উৎপাদনশীল একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ায় যে এক লাখ ৪৬ হাজার টন কয়লা লোপাটের ঘটনা ঘটেছিল তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে বাংলাদেশ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব)। সংগঠনটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, দেড় লাখ নয় বরং সেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন কয়লা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এ কয়লা খনির উৎপাদন শুরুর বছর ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তারা জানায়, আর এই আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) সাবেক সাতজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ২৩ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করেছে ক্যাব। এ ছাড়া পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে ক্যাব। এতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বহুল আলোচিত বড়পুকুরিয়ার কয়লা আত্মসাতের ঘটনা প্রথম প্রকাশ পায় ২০১৮ সালের জুন মাসে। সে সময় বিষয়টি স্বীকার করে খনি কর্তৃপক্ষ বলেছিল কয়লার সঙ্গে আর্দ্রতার (পানি) হিসেবে গরমিল হওয়ায় এটি ঘটেছে। কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় খনির পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। বিষয়টি নিয়ে তখন মামলা হলে গাফিলতির তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন। জুলাই মাসে প্রকাশিত দুদকের প্রতিবেদনে খনিটির সে সময়কার এমডিসহ সাতজন এমডিকে অভিযুক্ত করে দুদকের অনুসন্ধান দল। দুদকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, খোয়া যাওয়া কয়লা খনি কর্মকর্তারাই আত্মসাৎ করেছেন। এসব কয়লা খনির গেট দিয়ে ট্রাক করে বেরিয়ে গেছে। ওই বছরের আগস্টে বিষয়টি অনুসন্ধানে একটি কমিশন গঠন ক্যাব। এর ১৮ মাস পরে প্রতিবেদন প্রকাশ করল সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি যৌথভাবে পাঠ করেন ছয় সদস্যর কমিটির সভাপতি লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক এম. শামসুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক বদরুল ইমাম, সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেনসহ এ সময় উপস্থিতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ খোলাবাজারে কয়লা বিক্রির সময় আর্দ্রতা বা পানি ১০ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশের বেশি পানি যুক্ত কয়লা দেওয়া হয়। খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের পর সরাসরি তা বেল্টের মাধ্যমে পাশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে চলে যায়। ফলে প্রথাগত লোকসান বা সিস্টেম লস হওয়ার সুযোগ নেই।
তারা জানায়, বড়পুকুরিয়ার কয়লাতে সর্বোচ্চ আর্দ্রতা (ইনহেরেন্ট ময়েশ্চার) রয়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে কয়লা নেওয়া হচ্ছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ আর্দ্রতায়। কিন্তু গড়ে বড়পুকুরিয়ার কয়লায় সাড়ে ১০ শতাংশ পানিসহ কয়লা গ্রহণ করেছে বিসিএমসিএল। ২০০৫ সাল থেকে খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরুর পর ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ টনের কয়লা দাম দিয়ে (১০ শতাংশ পানিসহ) মূলত কয়লা পেয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার টন। কিন্তু এই কয়লার হিসেবে বিসিএমসিএল রাখেনি। প্রতিবেদনে প্রথাগত সিস্টেম লস ১ লাখ ৬১ হাজার টন। এ হিসেবে ৫ লাখ ৪৮ হাজার টন কয়লা চুরি হয়েছে। আর বিসিএমসিএল ও পেট্রোবাংলার দাবি খোয়া যাওয়া ১ লাখ ৪৪ হাজার কয়লা প্রথাগত লোকসান। বেশি করে প্রথাগত লোকসান ধরার পরও চুরি যাওয়া কয়লার পরিমাণ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন যার হিসেব নেই খনি কোম্পানির কাছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে পিডিবি ছাড়া অন্য কারও কাছে কয়লা বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়
। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ার কয়লায় পানি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সংশোধন করা, কয়লার বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কাছে দেওয়া, বিসিএমসিএলের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের (সিএসআর) ও কল্যাণ তহবিল বিলুপ্ত সহ ১৩টি সুপারিশ করা হয়।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে কয়লা তোলার কাজটি করে চীনের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম। এই কনসোর্টিয়ামকে গত ১৩ বছরে (২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত) ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার টন কয়লা তোলার বিল দিয়েছে বিসিএমসিএল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে খনি কর্তৃপক্ষ আরও পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার টন বেশি কয়লা পেয়েছে। এ কয়লার বর্তমান দাম প্রায় ৯২৭ কোটি টাকা (খোলাবাজারে প্রতি টন কয়লার দাম ১৬ হাজার ৯২৭ টাকা)। এই টাকা খনি কোম্পানির তহবিলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটার কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বড় পুকুরিয়ায় যে ঘটনা ঘটেছে, তাকে দুর্নীতি বললে কম বলা হবে। এটি আসলে পুকুরচুরি ছাড়া আর কিছু নয়। যে কাজটি করা উচিত ছিল জ্বালানি বিভাগের, সেটি নাগরিকদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। এখন সরকারের উচিত এই দুর্বৃত্তদের ছাড় না দেওয়া।
