অনেকেই মন্তব্য করছেন যে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীনের তৎপরতা সরকার পরিচালনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দেশটির কর্তৃত্ববাদী শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে জুতসই সমন্বয় ঘটিয়েছে। তবে প্রকারান্তরে দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর- তারা দেখাতে পেরেছে কীভাবে সহজাত শক্তিকে কাজে লাগান যায়। একটি দেশ এ কাজ করে দেখিয়েছে, সেটি হলো দক্ষিণ কোরিয়া।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে সম্প্রতি বলা হয়, 'চীনের শাসন ব্যবস্থার যে সার্থকতা তা আরেকবার প্রমাণিত হলো'। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, 'মহামারির বিরুদ্ধে চীনের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, মানুষের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী শাসনক্ষমতা'।
তবে এ বক্তব্যের অবশ্যম্ভাবী দুটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এখানে চীন যে এই মহামারি মোকাবিলায় সফল হয়েছে তা তাদের মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীন সফল হয়েছে তাদের এ কথায় বিশ্বাস করা মানে দিনের পর দিন এ বিষয়ে (করোনাভাইরাস) তাদের ব্যবস্থা না নেয়া, গোপন করা এবং ভুল পদক্ষেপ নেয়ার ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করা- যার কারণে পৃথিবীব্যাপী এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে অনেক গণতান্ত্রিক সরকারও বিষয়টিকে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। ইতালি যেমন এখন তার জনগণের চলাফেরায় সর্বোচ্চ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যা জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমালোচিত হচ্ছেন নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গিয়ে এই রোগের ভয়াবহতা নিয়ে মশকরা এবং আক্রান্তের সংখ্যা গোপন করে।
যদিও এই সরকারগুলোর এসব সমস্যাকে গোটা উদার সমাজ ব্যবস্থার সমস্যা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ায় যেমন একের পর এক বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিহ্নিত করে গত এক সপ্তাহে সাফল্য পেয়েছে। তাদের পক্ষে এ কাজ সহজ হয়েছে শিক্ষা, স্বচ্ছতা এবং সুশীল সমাজকে কাজে লাগিয়ে, যেখানে চীন লাখ লাখ মানুষকে বাধ্য করেছে ঘরে নির্বাসন নিতে, একই সময়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে বাধ্য করেছে কারখানায় কাজ করতে অথবা গুম করে দিয়েছে কাউকে যারা চীন সরকারের কাজের সমালোচনা করেছে।
করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার ছিল প্রচুর সংখ্যক মানুষের পরীক্ষা করানো। এ পর্যন্ত তারা দিনে অন্তত ১৫ হাজার মানুষের করোনা পরীক্ষা করাতে পারছে, তাদের সরকারের হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারির ৩ তারিখ থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত তারা দুই লাখ ১০ হাজার মানুষের করোনা পরীক্ষা করিয়েছে। যেখানে এ সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষা করানো হয়েছে ছয় হাজার পাঁচ শ জনকে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত পাওয়া গেছে সাত হাজার ৫১৩ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৫৪ জনের, মৃত্যুহার দশমিক ৭১।
প্রতিদিন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কমে আসছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী মার্চ মাসের ২ তারিখে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৬৮৬, সেখানে বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে ১৩১ জন। দেশটির সরকার ৫৩টি চলমান করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ স্টেশন স্থাপন করেছে যেখানে চালকরা কারো সংস্পর্শ ছাড়াই করোনা পরীক্ষা করাতে পারছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সুশীল সমাজও তৎপর ছিলেন সংকট মোকাবিলায়। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছিল, চার্চের কাজ করা হয়েছে অনলাইনে এবং সরকার জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে সবার হাসপাতালে ভিড় করার প্রয়োজন নাই, খুব জটিল কিছু না ঘটলে- তারা এর সবই করেছে পুরো শহরকে একটা কারাগারে পরিণত না করে।
যদিও তাদের কিছু পদক্ষেপ ছিল বিতর্কিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যেসব ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের জিপিএস দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং ম্যাপে তাদের অবস্থান দেখানো হয় (তাদের নাম গোপন রেখে) যাতে যার মনে হবে সে যেন তাকে এড়িয়ে চলতে পারে। এটা হয়ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন বা অপমান স্বরূপ, কিন্তু এটা অবশ্যই ভালো শোনাবে যখন জানা যাবে চীন ড্রোনের মাধ্যমে সব মানুষের শরীরের তাপমাত্রা গ্রহণ করছে এবং যারা আক্রান্ত নয় তাদের গায়ের ওপর সর্বত্র স্প্রে ছিটাচ্ছে, যা চীনের বিভিন্ন এলাকায় সরকারের লোকেরা ঘটিয়েছে।
বাইরের দেশ থেকে যেন এ ভাইরাস ভেতরে না আসতে পারে সে জন্য দক্ষিণ কোরিয়া তাদের ইনচেয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন ধাপের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রগামী যাত্রীদের জন্য ছিল আলাদা স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা। সিউল যা করতে চেয়েছে তা হলো, অন্য দেশের সঙ্গে যেন তাদের যোগাযোগের কোনো ক্ষতি না হয় এবং তাদের নাগরিকদের যেন অন্য দেশগুলো গ্রহণ করে। আবার বলতে হয়, তারা গুরুত্ব দিয়েছে স্বচ্ছতা এবং খোলামেলা পরিবেশের ওপর, বেইজিংয়ের মতো বিরক্তি বা ক্ষোভ তৈরির পথে তারা যায়নি।
চীন যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে সে জন্য তাদের কৃতিত্ব দিতে হয়। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারা চীনের সঙ্গে যৌথভাবে দেশটির সরকারি সংস্থা এবং বিজ্ঞানীদের এ সংকট মোকাবিলায় কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। এটা ঠিক এ কাজে চীনকে সহযোগিতায় আমাদের নারাজি হওয়ার সুযোগ নাই, তারাও এ পর্যন্ত যথেষ্ট আন্তরিক এ বিষয়ে।
যদিও হু বলছে, চীনা জনগণই এ কৃতিত্বের দাবিদার, তাদের সরকার নয়।
একবার ভেবে দেখুন, বেইজিংয়ে স্বচ্ছতা, খোলামেলা পরিবেশ, জনশিক্ষা যদি চালু থাকত সাত থেকে আট সপ্তাহ আগে তাহলে করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।
দক্ষিণ কোরিয়ার পদক্ষেপ অনেক শক্তিশালী কারণ সেখানে সমালোচনা এবং পরীক্ষা করানোর অবাধ সুযোগ ছিল। যে কারণে তাদের অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্য খুব দ্রুতই উন্নতি করবে বলে প্রতীয়মান। রাজনৈতিকভাবেও যার প্রভাব পাওয়া যাবে। ট্রাম্পেরও ভাবা উচিত এসব বিষয়ে আলটপকা করোনাভাইরাস ‘চলে যাবে’ এমন মন্তব্য না করে।
গণতন্ত্র ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সরকারের দায়বদ্ধতাকে সংহত করে। জনগণ তখনই ভালো জীবনযাপন করতে পারে যখন তারা মর্যাদা পায় এবং সঠিক তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারে। জনতার এমন মূল্যবোধর প্রয়োজন হয় না যা তাদের সংশয়ে রাখে, তারা চায় সেটাই যা তাদের শক্তি জোগায়। গণতন্ত্র সব সময় ভাবে তাদের (জনগণকে) জীবন্ত রাখাই তার কাজ।
জস রগিন: ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট এবং সিএনএন এর রাজনীতি বিশ্লেষক। ব্লুমবার্গ, নিউজউইক, ডেইলি বিস্ট এর কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন শুভ্র।
