পঞ্চগড়ে তিন ফসলি জমির উর্বর মাটি বা টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছেন ইটভাটা মালিকরা। এতে ধ্বংস হচ্ছে কৃষিজমি, হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। অন্যদিকে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হওয়ায় কমছে ফসল উৎপাদন। টপসয়েল কেটে নিয়ে যাওয়ায় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জেলার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে বেগ পেতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ, বোদা ও আটোয়ারী উপজেলার শতাধিক ইটভাটা মালিকরা ইট তৈরির নামে প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমির ওপরের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন ইটভাটায়। আর জৈবপদার্থ বা গুণসমৃদ্ধ মাটির ওপরের অংশেই সঞ্চিত থাকে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও উপকারী অণুজীব যা পুড়ে তৈরি করছে ইট।
স্থানীয়রা জানায়, কৃষকদের ফুঁসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে স্বল্পমূল্যে কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন ভাটামালিকরা। আর এতে সহায়তা করছে মাটি সরবরাহকারী একশ্রেণির দালালচক্র। ১০ থেকে ১৫ ফুট গর্ত করে ফসলি জমির মাটি কেটে শত শত ট্রাকে করে ইটভাটায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পঞ্চগড় জেলার শতাধিক ইটভাটায় প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমির ওপরের উর্বর মাটি নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে কৃষিজমি ও উঁচু জমি পরিণত হচ্ছে জলাশয়ে।
ইটভাটায় মাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে টপসয়েলের ব্যবস্থার বন্ধ করা, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা চালালে দুই বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও কোনো ইটভাটার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার দ-পাল ইউনিয়নের কালী নয়নপাড়া গ্রামের ধনঞ্জয় রায় কৃষিজমির মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় দেওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, প্রতি বিঘা জমির টপসয়েল ২৬ হাজার টাকা দরে কেনা হয়। জুয়েল চৌধুরীর কেএসবি ব্রিকস, দেলোয়ার হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের এডিএ ব্রিকস ছাড়াও ৮-১০টি ইটভাটায় প্রতিদিন ৩০০-৪০০ ট্রলি মাটি সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
জেলার বোদা উপজেলার ভাসাইনগর এলাকার এমএমএল ব্রিকসের মালিক মনসুর আলমকে পাওয়া যায়নি। তবে এ ইটভাটার ম্যানেজার জগদীশ চন্দ্র রায় জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে এক সিজনে একটি ইটভাটায় পাঁচবার ইট পোড়ানো যায়। একবারে ৫ থেকে ৮ লাখ পর্যন্ত ইট তৈরি হয়। এজন্য আড়াই থেকে পাঁচ লাখ সিএফটি মাটি প্রয়োজন হয়।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের পরিবেশ ও ভূগোল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তৌহিদুল বারী বাবু জানান, টপসয়েল কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে এবং ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু হানিফ জানান, টপসয়েল কেটে নেওয়া কৃষি ও কৃষকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক। ইটভাটা মালিকরা কৃষিজমি থেকে টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই।
কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রত্যয় হাসান বলেন, শুধু শাস্তি নয়, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করব। রংপুর বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মুঠোফোনে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে এসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’
