উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে কুমিরের মুখ থেকে ফিরল স্কুলছাত্র

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ০৩:২৬ পিএম

নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে কুমিরের সঙ্গে প্রায় পাঁচ মিনিট লড়াই করে জীবন নিয়ে ফিরেছে শেখ রাকিবুল ইসলাম রাকিব (১৪) নামে এক স্কুলছাত্র।

সোমবার বিকেলে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান (রহ.) মাজারের খাঞ্জেলি দীঘিতে এই ঘটনা ঘটে।

কুমিরের আক্রমণে আহত রাকিবকে উদ্ধার করে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে সে এখন শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।

ফাল্গুন ও চৈত্র মাস সাধারণত কুমিরের ডিম ছাড়ার সময়। এ সময় কুমির থাকে হিংস্র। মা কুমিরের প্রয়োজন হয় নির্জনতা।

অন্যদিকে, এই ঘটনার পর খানজাহানের মাজারে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাই স্থানীয় মাজারের খাদেমরা দর্শনার্থীদের দীঘিতে নেমে গোসল না করার পরামর্শ দিয়ে মাইকিং করছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী এই মাজারে আসেন। যাদের মানত থাকে তারা এই দীঘিতে নেমে গোসল করে থাকেন।

শেখ রাকিবুল ইসলাম বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের রণবিজয়পুর গ্রামের শেখ জাকির হোসেনের ছেলে এবং দরগা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের নবম শ্রেণির ছাত্র।

আহত রাকিব হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, মাজার দীঘির অদূরেই আমার বাড়ি। অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল আমি দীঘিতে নেমে গোসল করব। তাই গতকাল আমি আমার আরেক বন্ধু দুজনে এক সঙ্গে দীঘির ঘাটে গোসল করতে নামি।

দীঘিতে কয়েকটি ডুব দিয়ে সিঁড়িতে উঠে বসি। এর কিছুক্ষণ পর পানির নিচে আমার ডান পায়ে কিসে যেন কামড়ে ধরে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কিসে কামড়ে ধরেছে। যখন আমি আমার পা ছাড়ানোর চেষ্টা করি তখন কুমিরটি আরও জোরে কামড় দেয়। তখন আমি আমার পা ছাড়ানোর চেষ্টা না করে পানির ভেতরে ওর অবস্থান বোঝার চেষ্টা করি।

এরপর আমি ওর মাথার অংশে এলোপাতাড়ি কিলঘুষি মারতে থাকি। এভাবে চলে অন্তত পাঁচ মিনিট। একপর‌্যায়ে কুমির আমার পা ছেড়ে দূরে চলে যায়। পানি থেকে উঠে দেখি ডান পায়ের হাঁটুর নিচে একাধিক স্থানে ক্ষতবিক্ষত। রক্ত ঝরছে। পরে স্থানীয় লোকজন আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। পায়ে বেশ কয়েকটি সেলাই লেগেছে। আমি হিংস্র ওই প্রাণীটির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবন নিয়ে আসতে পারব তা কল্পনাও করতে পারিনি।

মাজারের খাদেম এবং স্থানীয় ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু এই প্রতিবেদককে বলেন, কুমিরের এখন প্রজনন মৌসুম। তার ডিম ছাড়ার সময়। এ সময় কুমির হিংস্র হয়ে ওঠে। এ কারণে দীঘিতে গোসল করতে নামা ওই কিশোরের উপর মা কুমিরটি আক্রমণ করেছে। তাই এখানে আসা দর্শনার্থীরা আমাদের না জানিয়ে যেন দীঘিতে গোসল না করে। কারও মানত থাকলে দীঘির ঘাটে থাকা বালতির পানি দিয়ে গোসল করবেন। আমরা দর্শনার্থীদের দীঘিতে নেমে গোসল না করার পরামর্শ দিয়ে প্রতিনিয়ত মাইকিং করে সতর্ক করছি।

বাগেরহাট সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ডালিয়া আক্তার সাথী এই প্রতিবেদককে বলেন, মাজারের দীঘিতে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণে আহত হয়ে রাকিব নামে এক কিশোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে একাধিক স্থানে মাংসপেশী ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তাকে আমরা ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছি। সে এখন সুস্থ।

প্রসঙ্গত, প্রায় সাড়ে ছয়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী হযরত খানজাহান (রহ.) মাজারের খাঞ্জেলি দীঘি মিঠা পানির কুমিরের জন্য বিখ্যাত। যা এখানে আসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে থাকে। খানজাহানের শাসনামলে দীঘিতে তার ছাড়া কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় মারা যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজের ক্রকোডাইল ব্যাংঙ্ক থেকে মিঠা পানির কুমির এনে এই দীঘিতে ছাড়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত