করোনা যুদ্ধে নেতৃত্বের অভাবে বিশ্ব মানবতা: নোয়াহ্ হারারি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ০৯:৩৯ পিএম

অনেক মানুষ করোনাভাইরাস মহামারির জন্য বৈশ্বিক যোগযোগ থাকাকে দায়ী করছেন, তারা বলছেন এর প্রাদুর্ভাব আরো কমিয়ে আনার একমাত্র উপায় হচ্ছে বৈশ্বিক যোগাযোগে ছেদ টানা। দেয়াল তৈরি করা, ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করা, বাণিজ্য হ্রাস করা। যাই হোক, স্বল্প সময়ের আলাদা বাস (কোয়ারেন্টাইন) এই মহামারি ঠেকানোর জন্য জরুরি, তবে দীর্ঘ মেয়াদে একঘরে থাকার পন্থা ছোঁয়াচে এ রোগ প্রতিরোধে কার্যকর কোনো সমাধানের দিকে না নিয়ে গেলেও অর্থনীতিতে ধস নামাবে। বিপরীত পন্থাই সঠিক। এ মহামারির আসল মহৌষধ একের সঙ্গে অপরের বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং পরস্পর কাছাকাছি থাকা।      

বিশ্বায়নে লাখো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা চলমান বিশ্বায়নের আগেও ঘটেছে। ১৪ শতকে কোনো উড়োজাহাজ বা যাত্রীবাহী প্রমোদ তরী ছিল না, তারপরও প্লেগে মৃত্যু পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং স্থায়ী ছিল এক দশকেরও বেশি সময়। এই মহামারিতে ইউরো এশিয়ার বসবাসকারীদের মধ্যে ৭৫ থেকে ২০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। ইংল্যান্ডে প্রতি দশজনের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়। ফ্লোরেন্সে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৫০ হাজারেরই মৃত্যু ঘটে।     

১৫২০ সালের মার্চে, ফ্রান্সেসকো ডি এগুয়া নামে এক ব্যক্তি গুটিবসন্ত নিয়ে মেক্সিকোতে আসেন। ওই সময়ে আমেরিকার ওই অঞ্চলে ট্রেন, বাস এমনকি গাধার গাড়িও ছিল না যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। তারপরও ডিসেম্বরে গুটিবসন্ত গোটা কেন্দ্রীয় আমেরিকায় মহামারি আকারে দেখা দেয় এবং ওই এলাকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এতে মারা যায়।  

১৯১৮ সালে মারাত্মক এক ফ্লু কয়েক মাসের মধ্যেই পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। যা গোটা মানবজাতির এক চতুর্থাংশেরও বেশি, অর্ধ বিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করে। হিসাব মতে ওই ফ্লু ভারতের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশের সমান মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তাহিতি দ্বীপের ১৪ শতাংশ মানুষ মারা যায়। দ্বীপ রাষ্ট্র সামোয়ায় ২০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে এ মহামারিতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে- সম্ভবত এক বছরেরও কম সময়ে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এ মহামারি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার এত বেশি মানুষ হত্যা করতে পারেনি।

গত শতকের ১৯১৮ সালের তুলনায়, মহামারির ঝুঁকি আরো বেড়েছে বিশ্বজুড়ে, জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এর কারণ। একটি আধুনিক নগরব্যবস্থা যেমন টোকিও বা মেক্সিকো সিটিতে এখন কোনো প্রাণঘাতী ভাইরাস তার বিকাশের জায়গা সহজেই খুঁজে পাবে যে সুযোগ তার জন্য মধ্যযুগের ফ্লোরেন্সে ছিল না, কারণ এখন বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা এখন অনেক দ্রুত হয়েছে যা ১৯১৮ সালে ছিল না।  একটি ভাইরাস এখন প্যারিস বা টোকিও বা মেক্সিকো সিটিতে যাতায়াত করতে পারে ২৪ ঘণ্টায়। যে কারণে একটি ছোঁয়াচে রোগের নরকে বাস করে আমাদের উচিত প্রত্যাশা করা যে একটার পর একটা প্রাণঘাতী প্লেগ আসতেই থাকবে।   

যদিও, মহামারির ঘটনা এবং এ প্রভাব নাটকীয়ভাবে অনেকটাই কমে এসেছে। যদিও একবিংশ শতাব্দীতে এইডস বা ইবোলার মতো মহামারিতে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটলেও তা প্রস্তরযুগ পরবর্তী সময়ের তুলনায় অনেক কম। আর এটা ঘটেছে কারণ মানুষ একে অপর থেকে আলাদা হয়েছিল সে জন্য নয়, এটা ঘটেছে- কারণ মানুষ তথ্য জানতে পেরেছে। মহামারির বিরুদ্ধে মানবতার জয় হয়েছে কারণ রোগের জীবাণু এবং চিকিৎসকদের মধ্যকার হাতিয়ারের পার্থক্য, জীবাণু অন্ধ প্রক্রিয়ায় জীবনের বিকাশ ঘটায় যেখানে চিকিৎসকরা নির্ভর করে তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর।

যখন ১৪ শতকের দিকে প্লেগে মৃত্যু আঘাত হানল, মানুষের কোনো ধারণা ছিল না কেন তারা এভাবে মরছে। আধুনিক যুগ আসা পর্যন্ত, মানুষ সাধারণত এসব কিছুর জন্য দায়ী করত সৃষ্টিকর্তার ক্রোধ, ক্রুদ্ধ দৈত্য অথবা খারাপ বাতাসকে, তারা ধারণাও করতে পারত না কোনো ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কথা। মানুষ বিশ্বাস করত দেবতা এবং কল্পকাহিনিতে, তারা ভাবতে পারত না এক ফোঁটা পানিতে লুকিয়ে আছে আস্ত একটি দানো অথবা ভয়ানক কোনো শিকারি। এ অবস্থায় যখন প্লেগ বা গুটিবসন্ত দেখা দিল, কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে কার্যকর মনে করত অনেক মানুষের সমাগমের মধ্য দিয়ে কোনো ঈশ্বর বা দেবতার জন্য প্রার্থনা সভার আয়োজন করা। এতে কোনো কাজ তো না। উল্টো যখন মানুষ গণজমায়েতে একত্রিত হতো প্রার্থনার জন্য, এর ফলে গণ সংক্রমণ শুরু হয়ে যেত।  

গত শতক থেকে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, নার্সরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করেছে এবং তারা চেষ্টা করেছে মহামারির পেছনের কারণ এবং একে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা আবিষ্কারের। বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছে যেমন নতুন রোগ অকস্মাৎ হাজির হয় এবং পুরোনো রোগে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। জিনতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের জীবাণুর নিজস্ব কর্মপদ্ধতির ওপর নজরদারি চালানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যেখানে মধ্যযুগের মানুষ কখনোই আবিষ্কার করতে পারেনি কেন প্লেগে তাদের মৃত্যু হলো, অথচ এখনকার বিজ্ঞানীদের মাত্র দু সপ্তাহ সময় লাগল করোনাভাইরাসের জেনম আবিষ্কারে এবং আক্রান্ত রোগীকে শনাক্তে একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি আবিষ্কারে।

এক সময় বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছে কেন মহামারি হয়, এখন অনেক সহজ এসব মোকাবিলা করা। ভ্যাকসিনেশন, অ্যান্টিবায়োটিক, উন্নত স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনেক উপযোগী চিকিৎসা সামগ্রী অদৃশ্য হন্তারকদের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষমতাশালী করেছে। ১৯৬৭ সালে, গুটিবসন্ত তখনো ১৫ মিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করেছে, দুই মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু পরের দশকেই বিশ্বজুড়ে এই রোগের ভ্যাকসিন এতই সফল ছিল যে, ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করল যে মানবতার জয় হয়েছে এবং গুটিবসন্তকে বিশ্ব থেকে নির্মূল করা হয়েছে। আর ২০১৯ সালে গুটি বসন্তে কেউ আক্রান্ত বা মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।      

করোনাভাইসের এ মহামারির সময়ে এসব ইতিহাস আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে?

প্রথমত, এটা বোঝা যায় যে স্থায়ীভাবে সীমান্ত বন্ধ রেখে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নেরও বহু আগে মধ্যযুগেও হু হু করে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। সুতরাং আপনি যদি ১৩৪৮ সারের ইংল্যান্ডের মতো নিজেদের যোগযোগ সীমিত করে আনেন- সেটাও নিজেকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট হবে না। যদি এভাবে নিজেকে রক্ষা করতেই হয় তাহলে মধ্যযুগে ফিরে গিয়ে কোনো ফায়দা হবে না। আপনাকে তাহলে প্রস্তরযুগে ফিরে যেতে হবে। এটা কি আসলেই সম্ভব?

দ্বিতীয়ত, ইতিহাস জানাচ্ছে যে আসল সুরক্ষা তৈরি হয় পারস্পরিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য আনাদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে এবং বৈশ্বিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে। যখন কোনো দেশ মহামারি দ্বারা আক্রান্ত হবে, তাদের স্বেচ্ছায়, সৎভাবে এর ছড়িয়ে পড়া বিষয়ে যাবতীয় তথ্য জানিয়ে দিতে হবে কোনো প্রকার ভীতি বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় মাথায় না রেখে- যাতে অন্যান্য দেশ তাদের এসব তথ্যে আস্থা রাখতে পারে এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে তাদের বিষয়ে একঘরে করে না রেখে। আজ হয়তো চীন করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বের অন্য দেশের জন্য অনুকরণীয় অনেক উদাহরণ দেখিয়েছে তবে এ ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

ইউভাল নোয়াহ্‌ হারারি: ইতিহাসবিদ এবং অধ্যাপক, হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়।

টাইম ডটকম থেকে প্রথমাংশ অনুবাদ সালাহ উদ্দিন শুভ্র

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত