মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মধু আহরণে সুন্দরবনের মৌয়ালরা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ১০:০৪ এএম

সুন্দরবন উপকূলবাসীর এ সময়ের বড় প্রশ্ন বাঘ সাপ বড় না করোনা ভাইরাস বড়? সবই কিন্তু মৃত্যুর কারণ। এই মৃত্যুশঙ্কাকে সাথী করে এবারও মধু সংগ্রহে গহীন বনে গেলেন মৌয়ালরা।

বুড়িগোয়ালিনীর মৌয়াল নজরুল ইসলাম গাজী জানান, প্রতি বছরই ১৮ চৈত্র থেকে ১৮ বৈশাখ চলে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুম।

বন বিভাগকে কর দিয়ে অনেক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী পর্ব। আর হবেই না কেন পৃথিবীজুড়ে যে রয়েছে সুন্দরবনের মধুর বিশেষ চাহিদা। এই মধু সংগ্রহের পথে পথে মৌয়ালদের রয়েছে দীর্ঘ বাধা। যার মধ্যে অন্যতম বাঘের আক্রমণ। মধু সংগ্রহে গিয়ে এই বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে সাতক্ষীরার শতাধিক মৌয়াল। আর এবার তার সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মহামারী নভেল করোনাভাইরাস। যে কারণে এবার বন্ধ করা হয়েছে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা বা উদ্বোধনী সমাবেশ। তবে বন্ধ হয়নি মধু আহরণ কার্যক্রম।

image

দাতিনাখালীর আরেক মৌয়াল খালেক জানান, আহরণ করতে না দিলে নষ্ট হবে বনের মধু, আর মৌয়ালদের সারা বছরের একমাত্র কাজ হাতছাড়া হয়ে বেকার বেকার হবেন তারা। ফলে বন বিভাগের এ সিদ্ধান্ত। কিন্তু আগের নিয়ম পাল্টে এবার ১ মাসের বদলে দে্ওয়া হয়েছে ২ মাসের সুযোগ (১৮ চৈত্র থেকে ১৮ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত)।

তবে বর্তমানে ১৫ দিন পরপর বন বিভাগের অনুমতিপত্র জমা দেয়ার নিয়মে বড় ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েছেন মৌয়ালরা।

এর কারণ হিসেবে খালেক মৌয়াল বলেন, মধুর চাকতো নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে না। খুঁজে বেড়াতে হয়। খুঁজতে খুঁজতে যেতে হয় গহীন অরণ্যে। একটি গহীন অরণ্য থেকে উপকূলে ফিরতে ২দিনও লেগে যায়। আর ১৫ দিন পরপর পাসপারমিট সারেন্ডার করার প্রথার কারণে একজন মৌয়ালকে ১৩ দিনের মাথায় ফিরে আসতে হচ্ছে আবার ২৮ দিনের মাথায় ফিরে আসতে হচ্ছে এভাবে একেকবার অনেকগুলো দিন কর্মসময় যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমন গহীন অরণ্য থেকে হাতে বাওয়া নৌকায় ফিরতে অনেক পরিশ্রমও করতে হচ্ছে।

image

মৌয়াল পরিবারের ছেলে আশিক সবুজ বলেন, আমরা যারা সুন্দরবনের মধু খেতে ভালোবাসি বা মধু খাই আমরা কি জানি যারা এই মধু সংগ্রহ করে তাদের কী পরিমাণ ঝুঁকি নিতে হয়? এই মৌয়ালদের দুই মাসের মধু সংগ্রহ মৌসুমে খেতে হবে জঙ্গলের মধ্যে। ভাত পাবে না। সাথে থাকা চিড়ে ভিজিয়ে খাবে গুড় দিয়ে। দল ছাড়া হয়ে প্রসাব-পায়খানা করার সময় বহু মৌয়ালকে বাঘ কুমিরের পেটে যেতে হয়েছে। এই করোনার সময়ে ছোট ছোট নৌকায় ঠাসাঠাসি করে ৫-৬জন থাকতে হবে। যা মানবেতর এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যথেষ্ঠ ঝুঁকিপূর্ণ।

শেফালী খাতুন জানান, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে সাতক্ষীরা কতশত মৌয়ালের প্রাণ গেছে তাদের খোঁজ নেয় না কেউ। দেয় না প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা। এই সুন্দরবন উপকূলে রয়েছে এমন শতশত বাঘবিধবা যাদের স্বামীরা গেছে বাঘের পেটে। তারা এখনও অন্য মৌয়ালদের কথা চিন্তা করে। যারা বাঘ বিধবা হয়নি সেসব নারীরা এতিম না হওয়া সন্তানরা চোখের পানিতে বিদায় দেয় মৌয়ালদের মধু সংগ্রহে যাওয়ার সময়।

বুড়িগোয়ালিনীর এনামুল ইসলাম বলেন, মধু সংগ্রহ করে মৌয়ালরা কিন্তু লাভ পায় মধ্যস্বত্বভোগীরা তাই মৌয়াল পরিবারদের দাবি তাদের এলাকায় যদি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কুরিয়ার বা ডাক ব্যবস্থা থাকতো তাহলে তারা উপকৃত হতো।

image

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক এম এ হাসান জানান, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১০৫০ কুইন্টাল মধু ও ২৬৫ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ দিয়ে ১৭২জন বনজীবী মৌয়াল সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছে।

এদিকে সুন্দরবনের বনজীবীদের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মন্ডল মৌয়ালদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা ও তাদের বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

ভবতোষ বলেন, বনজীবী মৌয়ালদের প্রত্যাশা সবথেকে আকর্ষণীয় মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালদের জীবনমান পরিবর্তনে সরকার ও প্রশাসন সচেষ্ট হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত