করোনাভাইরাসে যখন সারা দেশ আতঙ্কিত ঠিক তখনই কিশোরগঞ্জে হাওরাঞ্চলে বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। হাওরজুড়ে অর্ধেকেরও বেশি বোরো জমির ধান পেকে গেছে। দেশে এমন পরিস্থিতিতে জেলার বাইরে থেকেও এ বছর কোনো ধান কাটার শ্রমিক আসছে না এখানে। ফলে জমির পাকা ধান নিয়ে শ্রমিক সংকটে পড়েছে এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক। এদিকে আবার শিলাবৃষ্টি আর আগাম বন্যায় জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সব মিলিয়ে হাওরের কৃষক এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বোরো ধানের জেলা বলা হয় কিশোরগঞ্জকে। সারা দেশের বোরো উৎপাদনের সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয় এখানে। এসব এলাকার প্রধান ফসল হলো বোরো ধান। জেলার চাহিদা মিটিয়েও সারা দেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করে থাকে এ জেলা। জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ইটনা, মিঠামইন ,অষ্টগ্রাম, নিকলী, তাড়াইল, করিমগঞ্জ, বাজিতপুর ও কুলিয়ারচর এ আট উপজেলা নিয়ে বেষ্টিত বিশাল হাওরাঞ্চল। যার মধ্যে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ১০০টি হাওর। যেখানে হাজার হাজার হেক্টর বোরো জমি চাষাবাদ হয়। এছাড়াও বাকি উপজেলাগুলোর নিমড়বাঞ্চলে কমবেশি বোরো চাষ করা হয়ে থাকে। এ জেলার বিশেষ আটটি উপজেলাসহ সবকটি উপজেলার কৃষকের বোরো জমির ধান এখন অর্ধেকের বেশি পেকে গেছে। আর মাত্র ৮-১০ দিনের মধ্যে কৃষকের সব জমির ধানই কাটতে হবে। ঠিক এ সময় দেশের করোনার প্রভাবে জেলার বাইরে থেকে কোনো ধান কাটার শ্রমিক এখানে আসছে না। ফলে গোটা হাওরে দেখা দিয়েছে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট। তা নিয়ে হাওরের কৃষকের এখন রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। বেশি দামেও পাচ্ছে না শ্রমিক। এখন করোনার পাশাপাশি নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন কৃষকের জমির পাকা ধান নিয়ে। কখন শিলাবৃষ্টি আর অকাল বন্যায় আবারও সারা বছরের একমাত্র সোনালি ফসল তলিয়ে যায় সে চিতায় এখন এখানকার কৃ ষকদের চোখে ঘুম নেই।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে কিশোরগঞ্জ জেলায় সর্বমোট ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭১০ হেক্টর বোরো জমি আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৩ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯৫ মেট্রিক টন চাল। আর হাওরের বাইরে অন্যান্য উপজেলায় ৬৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। যার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন চাল।
করিমগঞ্জ উপজেলার কান্দাইল গ্রামের বড় হাওরের কৃষক রিয়াজুল হক আনু, হাজি মো. ছামছুদ্দিন বলেন, আমরা দুজনের হাওরে ২৫ একর বোরো জমি করেছি। পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই আমাদের জমি পেকে যাবে। যে শ্রমিকগুলো প্রতি বছর আমাদের বাড়িতে থেকে ধান কেটে দিত, করোনার ভয়ে এবার আসবে না বলে জানিয়েছে। এখন আমি জমির ধান কাটা নিয়ে বড়ই বিপদ দেখছি।
ইটনা উপজেলার পশ্চিমপাড়া গ্রামের ইটনা হাওরের কৃষক মতি মিয়া জানান, আমি এ বছর ২০ একর জমিতে বোরো ধান করেছি। এখন ধান পাকতে শুরু করেছে। কিছু পাকা ধান বেশি দামে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে কাটিয়েছি। কিন্তু প্রতি বছর জেলার বাইরে থেকে আমার ৪৫ জন শ্রমিক এসে ধান কেটে দিত। এবার ফোন দিলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কেউ আসতে রাজি নয়। এখন আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
এদিকে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের সাংসদ ও রাষ্ট্রপতির ছেলে প্রকৌশলী রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেন, করোনার প্রভাবে কৃষকরা এ বছর ধান কাটার কোনো শ্রমিক পাচ্ছে না। তারা বড়ই বিপাকে রয়েছে শুনে গত দুদিন ধরে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ধান কাটতে সহযোগিতা করে আসছি। আর টিআর খাবিকা বাস্তবায়নের স্থানীয় শ্রমিকদেরও বিপদে পড়া কৃষকদের ধান কেটে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল আলম এ বিষয়ে স্বীকার করে বলেন, সারা দেশে করোনার প্রভাবে সত্যিকার অর্থে হাওরে ধান কাটার শ্রমিক নিয়ে চরম বিপাকেই পড়েছেন কৃষক।
